লিসার পেছনে থাকা ফায়ারপ্লেসের আগুন মটমট করে উঠল। ওর একবার ইচ্ছে হলো, এইসব কাগজপত্র আগুনে ফেলে দেবে। কিন্তু নিজের ইচ্ছের মুখে লাগাম দিল ও। যদিও এখানে অ্যানা নেই, তবুও…। পাহাড়ের অত্যধিক উচ্চতায় মানুষের মধ্যে কেমন মানসিক প্রভাব পড়ে, সে-বিষয় নিয়ে নেপালে গবেষণা করতে এসেছিল লিসা। পেশায় মেডিক্যাল ডাক্তার হলেও অন্তর থেকে ও একজন গবেষক।
অ্যানার মতো।
না… ঠিক অ্যানার মতো নয়।
টেবিলের ওপরে থাকা একটি রিসার্চ মনোগ্রাফকে আলতো করে পাশে টেনে নিল ও। নাম : Teratogenesis in the Embryonic Blastoderm, এই নথির সাথে বেল থেকে বিকরিত ক্ষতিকর রেডিয়েশনের সম্পর্ক আছে। কালো রেখা দিয়ে চিত্র উপস্থাপন করার পাশাপাশি এখানে নিরপেক্ষভাবে কিছু ভয়ঙ্কর বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। যেমন : বিভিন্ন অঙ্গবিহীন অবিকশিত শিশু, এক চোখঅলা দৈত্যাকার দ্রুণ, বড় মস্তিষ্কঅলা মৃত শিশু ইত্যাদি।
না, ও অবশ্যই অ্যানার মতো নয়। লিসার বুকের ভেতরে আবার সেই আগের রাগ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
নিজের রিসার্চ লাইব্রেরির দোতলায় উঠে যাওয়া মই বেয়ে নিচে নামলেন অ্যানা। হাতে একগাদা বই। জার্মানরা হাল ছেড়ে দেয়নি। কেন হাল ছাড়বে। ওরা এখন আপ্রাণ চেষ্টা করছে কী করে এই কোয়ান্টাম অসুখের নিরাময় করা যায়। অ্যানা মনে করেন, এখন এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে কাজের কাজ কিছুই হবে না। সম্ভবনা যা ছিল সেটা কয়েক দশক আগে চলে গিয়েছে। এখন আর সেরকম আশা নেই। তবে লিসাকে এই ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য খুব একটা অনুরোধ করতে হয়নি তাকে।
লিসা খেয়াল করে দেখল অ্যানার হাত কীভাবে কাঁপছে… যদিও ভালভাবে খেয়াল না করলে সেটা চোখেই পড়বে। তিনি নিজের হাতের তালু ঘষে কাঁপন আড়াল করার চেষ্টা করছেন। এটা দেখে আবারও মনে পড়ে গেল, ক্যাসলের সবাই রোগে আক্রান্ত। পুরো সকাল জুড়ে সবাই কতটা উদ্বিগ্ন ছিল সেটা পরিষ্কার টের পাওয়া গেছে। কিছু চিৎকার চেঁচামেচি আর একটি হাতাহাতি হওয়ার ঘটনা লিসা নিজ চোখে দেখেছে। এছাড়াও গত কয়েক ঘন্টায় আত্মহত্যাও করেছে কয়েকজন। চিকিৎসা পাবার শেষ আশা ভরসা বেল ধ্বংস হবার পর থেকে এই ক্যাসলে যেন হতাশা নেমে এসেছে। পেইন্টার আর ও যদি কোনো সমাধান বের করার আগেই এখানে যদি পাগলামো শুরু হয়ে যায় তখন কী হবে?
এই চিন্তাকে একপাশে সরিয়ে রাখল লিসা। হাল ছাড়বে না ও। বর্তমানে পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে সাহায্য করলেও লিসা এখান থেকে সর্বোচ্চ সুযোগটুকু নিতে চায়।
অ্যানাকে এগোতে দেখে মাথা নাড়ল লিসা। বেশ, এখান থেকে মোটামুটি একটা ধারণা পেয়েছি। কিন্তু আপনার বলা কিছু জিনিস আমাকে এখনও ভাবাচ্ছে।
টেবিলে বইগুলো রেখে অ্যানা একটা চেয়ারে বসলেন। কী সেটা?
আপনি বলেছিলেন, বেল নাকি বিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। টেবিলের ওপরে থাকা বই আর কাগজপত্রের দিকে ইশারা করে বলল, কিন্তু এখানে যা দেখলাম সেটা হলো, পরিবর্তনশীল রেডিয়েশন প্রয়োগ করে একটা সুপ্রজনন প্রোগ্রাম করার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। জেনেটিক পরিবর্তন এনে উন্নত মানুষ তৈরির চেষ্টা আরকি। কিন্তু এই ব্যাপারে আপনি বিবর্তন-এর মতো ভারী শব্দকে কেন টেনে আনলেন, ঠিক বুঝলাম না।
আপত্তিসূচক মাথা নাড়লেন অ্যানা। ড. কামিংস, বিবর্তন বলতে আপনি কী বোঝেন?
ডারউইন যেভাবে বলে গেছেন, সেটাই।
কী সেটা?
লিসা ভ্রু কুঁচকাল। ধীরে ধীরে জৈবিক পরিবর্তন… একটা এককোষী প্রাণী বিভিন্ন রকমভাবে বিস্তার লাভ করতে করতে বর্তমান প্রাণীকূলের অবস্থায় এসেছে।
এবং এসবের ওপর ঈশ্বরের কোনো হাত নেই?
প্রশ্ন শুনে লিসা একটু পিছু হটল। সৃষ্টির ক্ষেত্রে?
শ্রাগ করলেন অ্যানা, লিসার ওপর স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। কিংবা ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনে?
আপনি নিশ্চয়ই সিরিয়াস নন? এরপর নিশ্চয় বলবেন যে, বিবর্তনবাদ স্রেফ একটা থিওরি ছাড়া কিছুই নয়।
বোকার মতো কথা বলবেন না। যদি আর আন্দাজ দিয়ে যারা চলে আমি তাদের মতো নই। বিজ্ঞানের কোনো কিছুই বিস্তর তথ্য ও পরীক্ষিত হাইপোথিসিস ছাড়া থিওরির পর্যায়ে পৌঁছুতে পারে না।
তাহলে আপনি ডারউইনের বিবর্তনবাদ মানেন?
অবশ্যই। কোনো সন্দেহ নেই ওতে। বিজ্ঞানের সকল নিয়ম-কানুন মেনেই ওটা তৈরি করা হয়েছে। না মানার কোনো প্রশ্নই আসে না।
তাহলে কেন ওভাবে…।
একটাকে গ্রহণ করতে গিয়ে তো অন্যটাকে বাদ দেয়া যাবে না।
এক ভ্রু উঁচু করল লিসা। ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন আর বিবর্তনবাদ?
অ্যানা মাথা নাড়লেন। হ্যাঁ। একটু পেছন থেকে শুরু করি… আশা করি, আমার বোঝা ভুল নয়। প্রথমেই সমতল পৃথিবীর ধারণা বাতিল করে দিচ্ছি। অনেকে ভাবে তাদের সৃষ্টিকর্তার বানানো এই পৃথিবী নাকি সমতল! পৃথিবী গোল এটা মানতে তাদের কষ্ট হয়। সেইসাথে বাইবেল শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের জ্ঞানের বহরকেও বাতিল করে দিতে হচ্ছে। কারণ তাদের ধারণা এই পৃথিবীর বয়স সর্বসাকুল্যে ১০ হাজার বছর। এবার আমাদের মূল প্রসঙ্গে আসি। ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইনের পক্ষে যারা ওকালতি করে, তাদের ব্যাপারে কিছু বলি।
মাথা নাড়ল লিসা। একজন সাবেক-নাৎসি এখন বিজ্ঞান নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে। কাহিনি কী?
