সব যন্ত্রপাতি ঠিকঠাক করে নিল ক্রো। ঠিক আছে। সব সেট করা হয়ে গেছে। এখন আমরা অপেক্ষা করব কখন হারামজাদাটা ফোন করে।
মাথা নাড়ল গানথার।
অবশ্য যদি আমাদের টোপ সে গিলে থাকে তবেই সেটা হবে, শেষ মুহূর্তে যোগ করল ক্রো।
আধঘন্টা আগের কথা।
গুজব ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে–সীসা দিয়ে বন্ধ করা গোপন ভল্টে রাখা জেরাম-৫২৫ বিস্ফোরণের কবল থেকে রক্ষা পেয়েছে। গুজবটা পুরো ক্যাসলে আশার আলো জ্বালিয়ে দিলো। যদি স্থানান্তরযোগ্য জ্বালানি পাওয়া যায় তাহলে হয়তো নতুন করে বেল তৈরি করা সম্ভব হবে। এমনকি বিভিন্ন টুকরো অংশ জোড়া লাগিয়ে রিসার্চারদেরকে জড়ো করতে শুরু করেছেন অ্যানা। অসুখের প্রতিষেধক তৈরি করা সম্ভব না হোক, নতুন করে বেল হলে অন্তত বাড়তি কিছু সময় হাতে পাওয়া যাবে। বাড়তি সময় পাবে সবাই।
কিন্তু আশা জাগানোর জন্য এই গুজব ছড়ানো হয়নি। কালপ্রিটের কানে কথাগুলো পৌঁছে দেয়াই হলো আসল উদ্দেশ্য। তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে, তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। বেল-কে পুনরায় তৈরি করা সম্ভব। তাহলে সে তার ঊর্ধ্বতন ব্যক্তির কাছে পরামর্শ চাইবে।
আর চাইতে গেলেই পেইন্টারের খপ্পরে পড়বে সে।
গানখারের দিকে ফিরল ক্রো। সুপারম্যান হতে কেমন লাগে? প্রশ্ন করল ও। রাজা সূর্যের একজন বীর।
শ্রাগ করল গানথার। তার যোগাযোগ করার মাধ্যম হলো : ঘোঁতঘোত করা, দ্রুকুটি আর অল্পকিছু শব্দ।
আমি বলতে চাচ্ছি, আপনার নিজেকে সেরা কিংবা বড় মনে হয় কি-না? বেশি শক্তিশালী, দ্রুতগামী, এক লাফ দিয়ে বিল্ডিং পার হওয়া… এসব?
গানথার কিছু বলল না, স্রেফ ওর দিকে তাকিয়ে রইল।
শ্বাস ফেলল পেইন্টার। নতুন প্রসঙ্গ তুলে লোকটার মুখ খোলাতে চাইল। সহানুভূতির সাথে দুর্বল জায়গায় আঘাত করতে হবে। আচ্ছা, Leprakonige মানে কী? আপনি যখন না থাকেন যখন অনেককেই আমি শব্দটা বলতে শুনেছি।
পেইন্টার শব্দটার মানে খুব ভাল করেই জানে। কিন্তু ওর গানথারের সাড়া দরকার। এবং পেয়েও গেল। অন্যদিকে মুখ ঘোরাল গানথার। তবে পেইন্টার ওর চোখে জ্বলে ওঠা আগুন ঠিকই দেখতে পেয়েছে। নীরবতা। ও বুঝতে পারছে না লোকটা এখন কী বলবে।
কুষ্ঠ রাজা, অবশেষে গর্জন করল গানথার।
এবার পেইন্টারের চুপ করে থাকার পালা। ছোট রুমটার পরিবেশ একটু ভারী হতে দিলো ও। গানথার আবার মুখ খুলল।
নিখুঁত কাজ করতে গিয়ে কেউ ব্যর্থতা মেনে নিতে চায় না। যেহেতু আমাদেরকে তারা আশা করেনি তাই আমাদের রোগও তারা দেখতে ইচ্ছুক নয়। আমাদেরকে আড়ালে রাখতে পারলেই তারা খুশি।
নির্বাসন দেয়া। কুষ্ঠ রোগীকে যেরকম করা হয় আরকি।
Sonnekonlge জাতের মানুষ হয়ে বড় হয়ে ওঠার কঠিন বাস্তবতা কল্পনা করার চেষ্টা করল ক্রো। ছোটবেলা থেকেই সে জানে তার কপাল পোড়া। যেখানে রাজপুত্রের মতো আদর-যত্ন পেতে পারতো সেখানে হয় অবহেলিত।
তারপরও তো আপনি এখানে আছেন, বলল পেইন্টার। সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
আমার জন্মই হয়েছে এটার জন্য। এটা আমার কর্তব্য।
পেইন্টার অবাক হলো। কর্তব্যের বিষয়টা হয়তো এদের জিনের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। গানথারকে পর্যবেক্ষণ করল ক্রো। ওর মনে হলো লোকটা সম্পর্কে ও আরও বেশি কিছু জানে। কিন্তু কী জানে সেটাই জানে না।
আপনি কেন আমাদের সবাইকে সাহায্য করছেন?
আমি এখানকার কাজে বিশ্বাস করি। আমি এখন যেটায় ভুগছি, একদিন হয়তো মানুষদেরকে আর এটায় ভুগতে হবে না।
আর এখন? এখন তো আর চিকিৎসার কোনো আশা নেই। শুধু সময়ক্ষেপণ চলছে। আপনার তো তেমন কোনো লাভ হবে না।
গানখারের চোখ জ্বলে উঠল। Ich bin nicht krank
মানে কী? আপনি অসুস্থ নন?
Sonnekonige-রা বেল-এর অধীনে জন্ম করেছিল। জোর গলায় বলল গানপার।
প্রতিবাদের ভাষা বুঝল ক্রো। অ্যানার কথাগুলো মনে পড়ল ওর। ক্যাসল জুড়ে সুপারম্যানদের তাণ্ডব… তারা বেল-এর দ্বারা আর কোনো কিছু হতে দেবে না। হোক সেটা ভাল কিংবা মন্দ।
আপনারা তো বিরুদ্ধে ছিলেন। বলল ক্রো।
গানথার অন্যদিকে মুখ ঘোরাল।
পেইন্টার একটু ভাবল। যদি নিজে আরও কিছুদিন বেঁচে থাকাটাই মূল উদ্দেশ্য না হয় তাহলে গানথার কীসের জন্য সাহায্য করছে?
কী সেটা?
হঠাৎ করে ক্রোর মনে পড়ে গেল অ্যানা কোন দৃষ্টিতে গানথারের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। স্নেহ, মায়া, মমতা ছিল সেই দৃষ্টিতে। আর গানথার তাতে সায়ও দিয়েছিল। এছাড়া অ্যানাকে বাকিরা সবাই যতটা সম্মান করে থাকে গানথার অতটা করে না। তাহলে?
আপনি অ্যানাকে ভালবাসেন, মিনমিন করে বলল পেইন্টার।
অবশ্যই বাসি, গানথার চট করে জবাব দিল। ও আমার বোন।
.
অ্যানার স্টাডি রুমে ঝুলে থাকা লাইট বক্সটার কাছে লিসা দাঁড়িয়ে আছে। সাধারণত এধরনের লাইট বক্সের আলোতে রোগীদের এক্স-রে ফিল্মগুলো দেখা হয় তবে সেই আলোতে এখন অ্যাসেটেইট কাগজ দেখছে লিসা। কালো রেখা আছে কাগজগুলোতে। ওখানে বেল-এর প্রভাবের আগে ও পরে ডিএনএ-এর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বেল এর প্রভাবে ডিএনএ-এর কোথায় কোথায় পরিবর্তন ঘটেছে সেই জায়গাগুলো দাগানো আছে গোল গোল বৃত্ত দিয়ে। জার্মান ভাষায় সেগুলোর পাশে নোটও লেখা আছে।
ওগুলো অনুবাদ করে দিয়ে আরও কিছু বই আনতে গেলেন অ্যানা।
লাইট বক্সের আলোতে লিসা পরিবর্তনগুলো দেখতে লাগল, কোনো প্যাটার্ন কিংবা ধারা পাওয়া যায় কি-না খুঁজছে। কয়েকটি কেস স্টাডি শেষ করে বুঝল বেল-এর প্রভাবে যে মিউটেশনগুলো হয়েছিল ওগুলোর কোনো নির্দিষ্ট ছন্দ বা কারণ কোনোটাই নেই। কোনো উত্তর না পেয়ে ডাইনিং টেবিলের কাছে ফিরল ও। টেবিলের ওপরে এখন একগাদা বই, বৈজ্ঞানিক তথ্য আর কয়েক দশক আগে মানবদেহের ওপর চালানো পরীক্ষাগুলোর নথি রাখা আছে।
