গুড-বাই, দাদু। বোন কথা শেষ করল।
ফোন রেখে ভাইয়ের মাথার চুলে আঙুল চালিয়ে ঠিক করে দিল ও।
এবার ঠিক আছে।
একদম ঠিকঠাক।
বোনের আঙুলের ডগায় ভাই চুমো খেল।
ভালবাসা আর প্রতিজ্ঞা মিশে আছে ওতে।
প্রতিশোধ নেবে ওরা।
শোক পরে করা যাবে।
পার্কিং গ্যারেজ থেকে বরফ সাদা মার্সেডিজ বের করে শিকারের পেছনে ছুটল ওরা।
.
সকাল ১১ টা ৩৮ মিনিট।
হিমালয়।
সোল্ডারিং গান থেকে গাঢ় টকটকে শিখা বেরিয়ে এলো। যন্ত্রটাকে সোজা করল ক্রো। ওর হাত কাঁপছে। তবে সেটা ভয়ে নয়, চোখের পেছনে এখনও দপদপ করে ব্যথা করছে, তাই। বেশকিছু ওষুধ খেয়েছে ও। যদিও ওগুলোর কোনোটাতেই শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাওয়া যাবে না। তবে অ্যানার মতে, ওষুধগুলো খাওয়ার ফলে ক্রো আরও অতিরিক্ত কয়েক ঘণ্টা ভাল থাকতে পারবে।
কত সময় আছে ওর হাতে?
তিন দিনেরও কম। তারচেয়েও কম সময়ে হয়তো অক্ষম হয়ে পড়বে।
এসব চিন্তা-ভাবনা মন থেকে সরানোর চেষ্টা করল ও। দুশ্চিন্তা করলে ও আরও বেশি দুর্বল হয়ে পড়বে। ওর দাদার একটা কথা মনে পড়ল… বনের বাঘে খায় না, মনের বাঘে খায়।
কথাটা মাথায় রেখে সোল্ডারিং করায় মন দিল ক্রো। বেরিয়ে আসা ভূগর্ভস্থ তারের সাথে একটা ক্যাবলের সংযোগ দিচ্ছে। এই ওয়্যারিং পুরো ক্যাসলে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন অ্যান্টেনার সাথে সংযুক্ত রয়েছে। শুধু তাই না, পাহাড়ের চূড়োয় কোনো এক জায়গায় লুকোনো স্যাটেলাইট আপলিংক ডিসের সাথেও সংযোগ আছে এর।
কাজ শেষ করে পেছনে হেললো পেইন্টার। সদ্য করা সোল্ডারিং-কে ঠাণ্ডা হতে দিচ্ছে। একটা বেঞ্চের ওপর বসে আছে সে। সার্জনের মতো ওর পাশে নানান রকম যন্ত্রপাতি ছড়িয়ে আছে। দুটো ল্যাপটপ খোলা অবস্থায় আছে এখানে।
ল্যাপটপ দুটো দিয়েছে গানথার। সন্ন্যাসীদেরকে খুন করেছে, আং গেলুকে খুন করেছে; এই গানথার। এই লোকের ধারে কাছে গেলেই পেইন্টারের ভেতরে ক্রোধ জেগে ওঠে।
যেমন এখনও জাগছে।
ওর কাঁধের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে বিশালদেহি গানথার। ওর প্রত্যেকটা নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করছে। মেইনটেন্যান্স রুমে ওরা দুজন একা। পেইন্টার একবার ভাবল, এই সোল্ডারিং গানটা লোকটার চোখে ঠেসে ধরবে কিনা। কিন্তু তারপর? সভ্য জগৎ থেকে ওরা অনেক দূরে অবস্থান করছে। মৃত্যুদণ্ডের খাড়া ঝুলছে মাথার ওপর। সহযোগিতা করলেই বাঁচার আশা আছে, নইলে নেই। অন্যদিকে লিসা রয়ে গেছে অ্যানার স্টাডি রুমে। চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করেছে সে।
আর এখানে পেইন্টার আর গানথার এসেছে ভিন্ন দিকে।
স্যাবোটেজকারীকে ধরবে ওরা।
গানধারের ভাষ্য অনুযায়ী, যে বোম বেল-কে ধ্বংস করেছে সেটা হাতে বসানো হয়েছিল। যেহেতু বিস্ফোরণের পর কেউ এই ক্যাসল থেকে চলে যায়নি সেহেতু কালপ্রিট এখনও ক্যাসলে আছে বলে ধরে নেয়া যায়।
বিষয়টা নিয়ে এগোতে পারলে হয়তো সামনে আরও অনেক কিছু জানা যাবে।
আর সেটা করার জন্য লোকমুখে কিছু কথা ছড়িয়ে টোপ ফেলা হয়েছে।
এখানকার সব কাজ করা হচ্ছে সেই টোপকে কাজে লাগিয়ে ফাঁদে পরিণত করার জন্য। একটা ল্যাপটপকে ক্যাসলের কমিউনিকেশন সিস্টেমের সাথে সংযোগ করে দেয়া হয়েছে। গানথারের কাছ থেকে পাওয়া পাসওয়ার্ডগুলো ব্যবহার করে ইতোমধ্যে সিস্টেমে ঢুকে পড়ে কাজ করতে শুরু করেছে ক্রো। কমিউনিকেশন সিস্টেম থেকে যাওয়া যাবতীয় আউটগোয়িং কল তদারকি করার জন্য ক্রো বেশ কয়েকটা সিরিজ কমপ্রেসড কোড ছেড়েছে। স্যাবোটাজকারী যদি বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে তাহলে তার অবস্থানসহ এখানে সেটা ধরা পড়বে।
তবে পেইন্টারের ধারণা, কালপ্রিট এত বোকা নয়। সে পুরুষ হোক বা নারী গোপনে সে দীর্ঘদিন ধরে নিজের কাজ করে আসছে। সে হিসেবে বোঝা যাচ্ছে, কালপ্রিট বেশ ধুরন্ধর।
এজন্য নতুন কিছু তৈরি করল পেইন্টার।
কালপ্রিটের কাছে নিশ্চয়ই ব্যক্তিগত স্যাটেলাইট ফোন আছে। নিজের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদের সাথে ওটা দিয়ে যোগাযোগ রক্ষা করে। কিন্তু ওরকম ফোনকে অরবিটিং স্যাটেলাইটের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে হলে পরিষ্কার, ঝকঝকে, বাধাহীন লাইন প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই ক্যাসলে সেরকম আরামের জায়গা আনেক আছে। কোটর, জানালা, সার্ভিস হ্যাঁচ; ইত্যাদি বহু জায়গা ব্যবহার করে গার্ডের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোনো প্রকার সন্দেহের সৃষ্টি না করে কালপ্রিট নিজের চাহিদা মেটাতে পারবে।
ভিন্ন কিছু দরকার।
ভূগর্ভস্থ তারের সাথে লাগানো সিগন্যাল অ্যামপ্লিফায়ার চেক করল ক্রো। সিগমায় থাকাবস্থায় এই ডিভাইস ও নিজে বানিয়েছিল। ডিরেক্টর হওয়ার আগে সিগমায় দক্ষ অপারেটিভ হিসেবে দায়িত্বরত ছিল ক্রো। তখন নজরদারি আর মাইক্রোইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে কাজ করতো। তাই, এসব কাজ ওর কাছে ডাল-ভাত।
আরেকটা ল্যাপটপের সাথে ভূগর্ভস্থ তারের সংযোগ ঘটিয়েছে এই অ্যামপ্লিফায়ার।
তৈরি হয়ে গেছে, বলল ক্রো, ওর মাথাব্যথা এখন একটু কমেছে।
চালু করা যাক।
ব্যাটারি অন করল পেইন্টার। সিগন্যালের বিস্তার ও পালস রেট ঠিক করে দিল। বাকি কাজ ল্যাপটপ করে নেবে। সিগন্যাল পেলেই ধরে ফেলবে এটা। তবে একেবারে নিখুঁত হবে তা কিন্তু নয়। অবৈধভাবে কোনো সিগন্যালকে দেখলেই উৎসের ৯০ ফুটের মধ্যে অবস্থান নির্ণয় করে দেখাতে পারবে। এতখানিই যথেষ্ট।
