বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞান কমিউনিটির সাথে আমাদের যোগাযোগ রাখতে হয়েছে। যুদ্ধের পর নাৎসি বিজ্ঞানীরা বাতাসে মিলিয়ে গেল। তাদের অনেকেই গায়েব হয়েছিল পৃথিবীর বিভিন্ন ব্ল্যাক প্রজেক্টে। ইউরোপ, সোভিয়েত ইউনিয়ন, সাউথ আফ্রিকা, আমেরিকা ইত্যাদি দেশে। আসলে তারা ছিল আমাদের সোর্স। আমাদের কান আর চোখ হিসেবে কাজ করত তারা। তথ্য পাচার করত। তাদের অনেকে সেচ্ছায় কাজ করলেও বাকিদেরকে অতীত স্মরণ করিয়ে ব্ল্যাকমেইল করতে হয়েছিল।
আচ্ছা, তাহলে আপনারা কাজ চালিয়ে গেলেন?
মাথা নাড়লেন অ্যানা। পরবর্তী দুই দশকে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছিল। সুপারচিলড্রেনগুলো জন্ম নিয়ে আরও দীর্ঘদিন করে বাঁচতে শুরু করল তখন। এখানে। ওদেরকে রাজকুমারদের মতো আদর-যত্ন করে বড় করা হতো। ওদের উপাধি ছিল Ritter des Sonnekonig অর্থাৎ, রাজা সূর্যের বীর। কারণ কালো সূর্য নামের প্রজেক্ট থেকে ওদের জন্ম হয়েছিল।
কেমন হাস্যকর শোনাচ্ছে, একটু উপহাস করে বলল ক্রো।
হয়তো। আমার দাদা ঐতিহ্য পছন্দ করতেন। তবে আমি আপনাকে এতটুকু বলতে পারি, এখানে পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত সবাই ছিল সেচ্ছাসেবী।
কিন্তু সেটাকে নৈতিকভাবে নেয়া হয়েছিল? নাকি হিমালয়ে আপনারা আর কোন ইহুদি না পেয়ে অগত্যা…?
ভ্রু কুঁচকালেন অ্যানা। তবে ওর কথায় থাকা খোঁচাটুকু গায়ে মাখলেন না। পাকাঁপোক্ত প্রক্রিয়া চললেও Sonnekonige-দের মধ্যে মহামারী লেগেই রইল। এদিকে সেই শুরুর দিকে থাকা পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার লক্ষণগুলো আবার দেখা দিতে শুরু করল দুই বছর পর। তবে এবারের মাত্রা একটু কম। কিন্তু আয়ু বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি কিছু লক্ষণ দেখা দিল। যেমন : মানসিক সমস্যা, তীক্ষ্ণ মানসিক বৈকল্য, অনুভূতি ও কাজের মধ্যে ভিন্নতা, অস্বাভাবিক আচরণ ইত্যাদি।
মুখ খুলল লিসা। শেষের লক্ষণগুলো… অনেকটা মঠের সন্ন্যাসীদের সাথে মিলে যাচ্ছে।
অ্যানা মাথা নাড়লেন। প্রতিক্রিয়ার বিষয়টা মাত্রা আর বয়সের ওপর নির্ভর করে। বাচ্চাদের প্রতিক্রিয়া ছিল অল্প, কারণ ওরা বেল-এর নিয়ন্ত্রিত কোয়ান্টাম রেডিয়েশনের ভেতরে ছিল। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্করা, যেমন আমি, পেইন্টার, আমরা অনিয়ন্ত্ৰতিতভাবে রেডিয়েশনের কবলে পড়েছি। যার ফলে আমাদের অবস্থা অনেক বেশি খারাপ। আর সন্ন্যাসীরা একদম চুড়ান্ত মাত্রার রেডিয়েশনের কবলে পড়েছিল ফলে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে।
আর Sonnekonige? ক্রো প্রশ্ন করল।
আমাদের মতো, ওদের রোগেরও কোনো চিকিৎসা ছিল না। এমনকি বেল যখন আমাদেরকে সাহায্য করে যাচ্ছে তখন ওরা বেল-এর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। ওদের চিন্তাধারা ছিল–এই বেল-কে আর কোনো কাজ করতে দেয়া যাবে না। হোক সেটা ভাল কিংবা মন্দ। বেল বন্ধ করতে হবে।
তাহলে ওরা যখন পাগল হয়ে গেল…? পুরো ক্যাসল জুড়ে সুপারম্যানদের তাণ্ডব কল্পনা করল ক্রো।
তখন পরিস্থিতি আমাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মানুষকে নিয়ে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা তখন বন্ধ করা হয়।
ক্রো বিস্ময় লুকোতে পারল না। তার মানে, আপনারা রিসার্চ বন্ধ করে দিলেন?
না, আসলে তা নয়। মানুষ নিয়ে পরীক্ষা করতে যাওয়া অনেক ঝক্কির বিষয়। ফলাফল জানতে অনেক সময় লেগে যায়। অপচয় মনে হচ্ছিল ব্যাপারটা। আমরা নতুন মডেল পেলাম। ইঁদুরের পরিবর্তিত পেশি, কোষকে বাধা দেয়া ইত্যাদি। মানুষের জেনোম বের করে ডিএনএ পরীক্ষা করলেই আমরা দ্রুত ফল পেয়ে যাচ্ছিলাম। দ্রুত এগোচ্ছিলাম আমরা। মাঝে মাঝে তো মনে হয়, Sonnekonige প্রজেক্টটা আবার শুরু করলে আজকের দিনে হয়তো আগের চেয়ে ভাল ফল পাওয়া যেত।
তাহলে আপনারা আবার চেষ্টা করলেন না কেন?
শ্রাগ করে অ্যানা বললেন, আমাদের ইঁদুরগুলোতে এখনও পাগলামোর লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি। এটাই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আমরা কিন্তু মানুষ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা ছেড়ে দিয়েছি। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে গত দশ বছরে। নতুন জাতির অগ্রদূত হিসেবে নিজেদেরকে না ভেবে আমরা এখন পুরো মানবজাতির উৎকর্ষের স্বার্থে কাজ করতে চাই।
তাহলে আপনারা বাইরে বেরিয়ে আসছেন না কেন? লিসা প্রশ্ন করল।
বের হয়ে বিভিন্ন দেশের আইন-কানুন আর হাবড়াদের রাজনীতির খুঁটি হব? বিজ্ঞান কোনো গণতান্ত্রিক পদ্ধতি নয়। অত ন্যায়নীতি মেনে কাজ করতে গেলে আমাদের কাজের গতি কচ্ছপের স্তরে নেমে আসবে। ওটা হতে দেয়া চলবে না।
নাক দিয়ে সজোরে নিঃশ্বাস ফেলল ক্রো। যদি এটা ঠেকানোর জন্য চেষ্টা করেছিল কিন্তু কাজ হয়নি। দেখা যাচ্ছে, নাৎসিদের সেই দর্শন এখনও এখানে আছে।
sonnekonige-দের কী হলো? প্রশ্ন করল লিসা।
খুব খারাপ। ওদের অনেকেই মানসিক অবস্থার অবনতির কারণে মারা গিয়েছিল। আবার অনেকজনকে দেয়া হয়েছিল যন্ত্রণাহীন মৃত্যু। তারপরও অনেকজন বেঁচে গিয়েছিল। কালাউস তাদের মধ্যে একজন, আপনারা তো তাকে দেখেছেন।
বিশালদেহি গার্ডটির কথা মনে পড়ল ক্রোর। লোকটির ফ্যাকাসে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আর দুর্বল চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিল তার কিছু একটা হয়েছে। গানরের দিকে তাকাল ক্রো। গানথারও তাকাল। ভাবলেশহীন চেহারা। এক চোখ নীল, আরেক চোখ ধবধবে সাদা। এ-ও একজন Sonnekonige।
