লুকিয়ে কাজ করার জন্য এই এলাকা বেছে নিলেন হিমল্যার, বলল ক্রো। হিমালয়ের গভীরে। কী পাগলামো। ও মাথা নাড়ল।
সবসময় মেধার চেয়ে এই পাগলামো-ই পৃথিবীকে সামনে এগিয়ে নিয়েছে। তাছাড়া কে-ইবা এরকম অসম্ভবকে সম্ভব করার পেছনে উঠে পড়ে লাগতে যাবে?
আর এসব করতে গিয়ে গণহত্যাও কম হয় না।
অ্যানা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
আলোচনাকে মূল প্রসঙ্গে ফিরিয়ে আনল লিসা। মানুষের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে কী পাওয়া গেল? কণ্ঠস্বর যতদূর সম্ভব নিরপেক্ষ রেখে জানতে চাইল ও।
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে তখনও ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিল। বিশেষ করে উচ্চতর সেটিঙে। কিন্তু রিসার্চ থেমে থাকল না। মাতৃগর্ভে ভ্রুণের বয়স যখন ৮ সপ্তাহ তখন সেটার ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে বেশ ভাল ফলাফল পাওয়া যায়। প্রতি ৬ শিশুর ১ জন এরকম পজেটিভ ফল দিয়েছে। জিন পরিবর্তন হওয়ার ফলে বাচ্চাগুলোর মাংসপেশি বেশ সুগঠিত ছিল। এছাড়া আরও কিছু উন্নতি দেখা গিয়েছিল। যেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিক্ষমতা, হাত ও চোখের মধ্যে উন্নত সমন্বয়, দুর্দান্ত আইকিউ ইত্যাদি।
সুপারচিলড্রেন! বলল পেইন্টার।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, বাচ্চাগুলো ২ বছরের বেশি পার করতে পারত না, বললেন অ্যানা। ধীরে ধীরে ওরা অধঃপতিত হয়ে ফ্যাকাসে হয়ে যেত। স্ফটিকের টুকরোর মতো হয়ে যেত কোষগুলো। হাত-পায়ের আঙুলগুলো ঝরে পড়ে যেত।
ইন্টারেস্টিং, বলল লিসা। পরীক্ষার শুরুর দিকে থাকা পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার মতো শোনাচ্ছে এগুলো।
ওর দিকে তাকাল পেইন্টার। ইন্টারেস্টিং বলল নাকি? অ্যানার দিকে আগ্রহী দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে লিসা। ও এত নিরপেক্ষ মুখভঙ্গি কীভাবে ধরে রাখছে? তারপর খেয়াল করে দেখল টেবিলের নিচে লিসার হাঁটু লাফালাফি করছে। হাত দিয়ে ছুঁয়ে ক্রো ওর হাটুর কাঁপাকাঁপা থামিয়ে দিল। ওর ছোঁয়া পেতেই একটু কেঁপে উঠল লিসা। তবে চেহারায় সেসবের কোনো প্রকাশ নেই। পেইন্টার বুঝতে পারল, এই ব্যাপারে লিসার আগ্রহ স্রেফ ভান ছাড়া কিছুই নয়। নিজের রাগ আর ভয় লুকিয়ে রেখে ক্রোকে সুবিধে করে দিচ্ছে। ওর এরকম সহযোগী আচরণের কারণে অ্যানার মুখ থেকে কিছু কঠিন প্রশ্নের উত্তর বের করা সম্ভব। আর ওই উত্তরগুলোই ওদের দরকার।
কাজের বাহবাস্বরূপ লিসার হাঁটু চাপড়ে দিল ক্রো।
লিসা তার অভিনয় চালিয়ে গেল। আপনি বললেন, ৬টা বাচ্চার মধ্যে ১টা বাচ্চা এরকম উন্নত ক্ষমতা নিয়ে জন্মালেও অল্পদিন বাঁচত। তাহলে বাকি ৫ বাচ্চা?
মাথা নাড়লেন অ্যানা। জন্মের সময়ই মারা যেত, মারাত্মক বিকৃতি, রূপান্তর। মায়েদের মৃত্যু। মৃত্যুর হার অনেক বেশি ছিল।
এই বাচ্চাগুলোর মা ছিল কারা? ওদের দুজনের কথার ভেতরে নাক গলাল পেইন্টার। আশা করি, কোনো সেচ্ছাসেবী ছিল না।
মিস্টার ক্রো, এত রূঢ়ভাবে বিচার করবেন না। আপনার নিজের দেশে কত মানুষ মারা যায় সে হিসেব রাখেন? তৃতীয় বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে আপনাদের দেশের অবস্থা বেশি জঘন্য। ওই মৃত্যুগুলো থেকে কী ফায়দা হয়, বলুন দেখি?
ও, খোদা! এই মহিলা কী সিরিয়াস? এরকম উদ্ভট তুলনা দিচ্ছে কী করে।
প্রয়োজন ছিল বলেই নাৎসিরা সেটা করেছিল, বললেন অ্যানা। আর তাদের প্রয়োজন একটু হলেও ন্যায়সঙ্গত ছিল।
অ্যানাকে কিছু কথা শুনিয়ে দিতে ইচ্ছে করল ক্রোর কিন্তু রাগের দমকে কিছুই বলতে পারল না।
মুখ খুলল লিসা। ওর হাঁটুর উপরে থাকা ক্রোর হাতে হাত রেখে শক্ত করে ধরল। আশা করি, এখানকার বিজ্ঞানীরা বেল-কে সুন্দর করার কোনো একটা উপায় বের করেছিলেন। যাতে পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়াগুলো আর দেখা না দেয়।
অবশ্যই। কিন্তু যুদ্ধের শেষের দিকে আর তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। একটা নিখুঁত বাচ্চা জন্ম নেয়ার ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত একটা রিপোর্ট ছিল একটা। এই বাচ্চা ছাড়া বেল-এর অধীনে জন্ম নেয়া সব বাচ্চারই কোনো না কোনো সমস্যা ছিল। তুকের ভিন্ন রঙ, বিসদৃশ অঙ্গ-প্রতঙ্গ, ভিন্ন রঙের চোখ। গানথারের দিকে একবার দৃষ্টি বুলালেন অ্যানা। কিন্তু ওই একটা বাচ্চা ছিল নিখুঁত। চুল-চেরা জেনেটিক বিশ্লেষণ করেও বাচ্চাটির কোনো খুঁত পাওয়া যায়নি। কিন্তু কোন পদ্ধতি ব্যবহার করে ওই বাচ্চার জন্ম দেয়া হয়েছিল সেটা অজানাই রয়ে গেছে। প্রধান রিসার্চার তার শেষ পরীক্ষা একদম গোপনে চালিয়ে ছিলেন। আমার দাদা যখন বেল-এর সবকিছু সরিয়ে নেয়ার জন্য হাজির হয়েছিলেন তখন ব্যক্তিগত ল্যাবের সব জিনিসপত্র আর নোটগুলো ধ্বংস করে দিয়েছিলেন সেই রিসার্চার। তারপর বাচ্চাটা মারা যায়।
পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার কারণে?
না, রিসার্চারের মেয়ে ওই বাচ্চাকে নিয়ে পানিতে ঝাঁপ নিয়ে আত্মহত্যা করে।
কেন?
মাথা নাড়লেন অ্যানা। আমার দাদা এ-ব্যাপারে কিছু বলতে নারাজ ছিলেন। গল্পটা সংক্ষিপ্ত, এখানেই শেষ।
তো সেই গবেষকের নাম কী ছিল? জানতে চাইল পেইন্টার।
মনে পড়ছে না। তবে আপনি যদি চান তো দেখতে পারি।
পেইন্টার শ্রাগ করল। সিগমার কম্পিউটার যদি এখন ও ব্যবহার করতে পারত। ওর মন বলছে, অ্যানার দাদা সম্পর্কে কম্পিউটারে এরচেয়ে বেশি তথ্য আছে।
সেখান থেকে সব সরিয়ে আনার পর রিসার্চ এখানে শুরু হলো? লিসা প্রশ্ন করল।
