আর তারপর থেকে আজ পর্যন্ত আপনারা ওটা উৎপাদন করতে সক্ষম হননি? পেইন্টার প্রশ্ন করল।
মাথা নাড়লেন অ্যানা।
আচ্ছা, কিন্তু বেল আসলে কী করত? লিসা জানতে চাইল।
আমি আগেই বলেছি, এটা ছিল স্রেফ একধনের এক্সপেরিমেন্ট। অফুরন্ত জিরো পয়েন্ট এনার্জীকে বাগে আনার চেষ্টা। নাৎসিরা যখন এই প্রজেক্ট চালু করেছিল, তখন থেকেই বিভিন্ন পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে শুরু করে। ফ্যাকাসে উজ্জ্বলতা বিচ্ছুরণ করে বেল! ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতিতে বড় ধরনের শর্ট সার্কিট হয়। মারাও যায় অনেকে। এভাবে একের পর এক এক্সপেরিমেন্ট চালাতে চালাতে তারা ডিভাইসটাকে উন্নত করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। একটা পরিত্যক্ত খনিতে এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল তখন। এরপর থেকে আর কেউ মারা যায়নি। তবে এক কিলোমিটার দূরে থাকা গ্রামের লোকদের মাঝে নিদ্রাহীনতা, মাখা ঘোরা, খিচুনিসহ নানার উপসর্গ দেখা দেয়। বেল থেকে রেডিয়েশনের মাধ্যমে কিছু একটা ছড়াচ্ছিল। বিষয়টা কর্তৃপক্ষের নজর কাড়ল।
অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনা, তাই তো? আন্দাজ করল পেইন্টার।
তা জানি না। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান গবেষক অনেক রেকর্ড ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। তবে সেই দলে থাকা বাকিদের কাছ থেকে বেল-এর কার্যপরিধি সম্পর্কে জানা গিয়েছিল। ফার্ন গাছ, ছত্রাক, ডিম, মাংস, দুধসহ পুরো প্রাণীজগতে জুড়ে বিস্তার ছিল বেল। মেরুদণ্ডী, অমেরুদণ্ডী প্রাণী; সব। তেলাপোকা, শামুক, গিরগিটি, ব্যাঙ, ইঁদুর, বিড়াল… সব।
আর এদের সবার উপরে থাকা প্রাণী? মানুষ? এই মানুষের কী অবস্থা?
অ্যানা মাথা নাড়লেন। হু, হতে পারে। উন্নতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো-বেশি নীতি মেনে চলা।
তো এক্সপেরিমেন্টের সময় কী হয়েছিল? লিসা প্রশ্ন করল। প্লেটে থাকা খাবারের প্রতি ওর কোনো আগ্রহ নেই। খাবার যে মজা হয়নি, সেটা না। এই প্রসঙ্গ ওকে আগ্রহী করে তুলেছে।
ওর দিকে ফিরলেন অ্যানা। এবারের প্রতিক্রিয়াগুলোও ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। গাছপালা থেকে ক্লোরোফিল গায়েব হয়ে সব সাদা হয়ে যাওয়া, কয়েক ঘন্টার মধ্যে পুরো গাছ তেল তেলে কাদায় পরিণত হওয়া ইত্যাদি। এছাড়াও অন্যান্য প্রাণী স্রেফ জেলিতে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। টিস্যুগুলোতে সচ্ছ একধনের উপাদান এসে সব কোষকে একদম ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেয়।
তবে আন্দাজ করছি, বলল পেইন্টার শুধু তেলাপোকারা অক্ষত ছিল।
ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকাল লিসা। তারপর ব্যানার দিকে ফিরে বলল। ওরকম প্রতিক্রিয়া কেন হয়েছিল সে-ব্যাপারে আপনার কোনো ধারণা আছে?
আমরা অনুমান করতে পারি মাত্র। আমাদের বিশ্বাস, বেল যখন ঘুরতো তখন খুব শক্তিশালী ইলেকট্রোম্যাগনেটিক চক্র তৈরি হতো। জিরো পয়েন্ট এনার্জী প্রজেক্টে ব্যবহৃত উপাদান জেরাম-৫২৫ সেই চক্রের অধীনে পড়তেই অলৌকিক, অদ্ভুত রকমের কোয়ান্টাম এনার্জীর জন্ম হতো।
পেইন্টার পুরো বিষয়টিকে মাথায় ঢুকিয়ে নিল। তাহলে জেরাম-২৫২ হলো জ্বালানি আর বেল হলো ইঞ্জিন।
অ্যানা মাথা নাড়লেন।
বেলকে একটা মিক্সমাস্টারে পরিণত করা হচ্ছিল। নতুন একটি কণ্ঠ গমগম করে উঠল।
গানথারের দিকে তাকাল সবাই। তার মুখভর্তি সসেজ। এই প্রথমবারের মতো ওদের কথাবার্তার প্রতি আগ্রহ দেখাল সে।
একটু ত্রুটি থাকলেও কথাটা একেবারে ভুল বলেনি। অ্যানা সহমত পোষণ করলেন।
প্রকৃতিকে কেক চূর্ণ করার বাটি হিসেবে কল্পনা করে ঘুরন্ত বেলকে চূর্ণ করার যন্ত্র। হিসেবে কল্পনা করা যেতে পারে। কেক চূর্ণ করতে গিয়ে কেকের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়বে সেটাই স্বাভাবিক। ঠিক তেমনি এই বেল থেকে বাইরের প্রকৃতিতে কোয়ান্টাম এনার্জী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পাঠানোর ফলে কিছু অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ করা গিয়েছিল। সর্বশেষ এক্সপেরিমেন্ট ছিল, কীভাবে মিক্সারের ঘূর্ণন গতিতে রদবদল করা যায়। গতিতে পরিবর্তন আনতে পারলে কোয়ান্টাম এনার্জীর ছড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ক্ষতি কমানো আরকি। লিসা বলল।
সেইসাথে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার হার কমানো। সেটা সম্ভব হলে খারাপ প্রভাবগুলো কমে গেলে সেখানে ভাল কিছু জায়গা করে নিতে পারবে। বলল ক্রো। ও জানে বিষয়বস্তুর একদম কেন্দ্রে চলে এসেছে ওরা।
অ্যানা সামনে ঝুঁকে বললেন, কিন্তু নাৎসি বিজ্ঞানীরা উল্টো পথে হাঁটল। তারা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া কমানোর চেষ্টা না করে বরং আরও বাড়িয়ে এক্সপেরিমেন্ট করল। ছত্রাক বড় করা, ফার্ন গাছ বড় করা, অত্যধিক ক্ষীপ্রতা ও বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন ইঁদুর ইত্যাদি। বিভিন্ন জাতের প্রাণীর ক্ষেত্রে ফলাফল ভিন্ন ভিন্ন এসেছে। এবং একপর্যায়ে দেখা গেছে সবচেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে বড় জাতের প্রাণীদের ক্ষেত্রে।
তাহলে এরপর মানুষের পালা। বলল ক্রো।
মিস্টার ক্রো, একটু ইতিহাসে চোখ রাখুন। নাৎসিরা ধরেই নিয়েছিল তারা আগামী প্রজন্মকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে। আর সেটা করার অস্ত্র ছিল এটা। নীতি ধুয়ে পানি খাওয়া ছাড়া কোনো কাজ নেই। নীতি কোনো কাজে আসে না। নীতি পরিপন্থী কাজেই বেশি লাভ হয়।
উন্নত প্রজাতির মানুষ তৈরি করে পুরো পৃথিবীতে রাজত্ব কায়েম করা, তাই তো?
নাৎসিরা সেটাতেই বিশ্বাস করতো। শেষের দিকে এসে তারা বেল-এর পেছনে অনেক খেটেছে অনেক পরিশ্রম করেছে কিন্তু পুরো কাজ শেষ করতে পারার আগেই সব ভেস্তে গেল। পরাজয় হলো জার্মানদের। বেল-কে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল যাতে পরবর্তীতে গোপনে কাজ চালিয়ে নেয়া যায়। জার্মানির তৃতীয় প্রজন্মের জন্য শেষ আশা ছিল বেল। আর্য জাতির পুনরুত্থান হওয়ার একমাত্র সুযোগ ছিল। পুরো পৃথিবীতে দাপট দেখানো যেত।
