ও খেয়াল করে দেখল লিসা এই কঠিন সত্য শুনে ভয় পেল না, মনও খারাপ করল না। বরং এটা থেকে শক্তি অর্জন করল।
তাহলে আমরা প্রথমে কী করব? লিসা জানতে চাইল।
কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নামার আগে প্রথমে জানাশোনা থাকা দরকার।
কীরকম?
শত্রুটা কে, সেটা আগে জানতে হবে।
মনে হয় অ্যানা আর তার সাঙ্গপাঙ্গ সম্পর্কে আমি যথেষ্ট জানি।
না। সেটা না। আমি বলতে চেয়েছি, এখানকার বিস্ফোরণের পেছনে কার হাত আছে। স্যাবোটাজটা কে করল… কে বা কারা করাল কাজটা। এখানে বেশ বড় কিছু হচ্ছে। স্যাবোটাজের ব্যাপারগুলো… বেল-এর সেফটি কন্ট্রোলে গোলমাল, অসুখ বিসুখ… এসব করে আমাদেরকে টেনে আনা হয়েছে। অদ্ভুত অসুখ-বিসুখের টোপ দেখিয়ে, ধোঁয়া উড়িয়ে আনা হয়েছে আমাদের।
কিন্তু ওরা সেটা কেন করতে যাবে?
যাতে অ্যানার দলবলের কথা ফাঁস হয়ে যায়। ওরা যা করছে সেটা যেন বন্ধ হয়। দ্য বেল… আমাদের এখানে আসার পর ওটা ধ্বংস করে দেয়া হলো। বিষয়টা তোমার কাছে আশ্চর্য লাগেনি? ঘটনাটা দিয়ে আসলে কী বোঝায়?
তারা চাচ্ছিল অ্যানার প্রজেক্ট বন্ধ হোক এবং সেইসাথে বেল-এর প্রযুক্তি যেন অন্য কারও হাতে না পড়ে?
মাথা নাড়ল ক্রো। ঘটনা হয়তো তারচেয়ে ভয়াবহ। এসবই হয়তো ভুল দিকে প্রলুব্ধ করছে। হাতের কারিশমা দেখাচ্ছে কেউ। হয়তো এদিকে ব্যস্ত রেখে আসল কৌশল খাটাচ্ছে অন্য কোথাও। কিন্তু এত কৌশলের পেছনে থাকা সেই জাদুকরটা কে? সে কী চায়? কী উদ্দেশ্য? আমাদেরকে সেটাই খুঁজে বের করতে হবে।
আর তুমি অ্যানার কাছে যে জিনিসগুলোর জন্য অনুরোধ করেছ, ওগুলো?
ওগুলো দিয়ে হয়তো আমরা এই ঘোরর পরিস্থিতিতে কিছু সুবিধা করতে পারব। যদি আমরা স্যাবোটাজকারীকে ফাঁদে ফেলতে পারি তাহলে হয়তো কিছু প্রশ্নের উত্তর মিলবে। হয়তো জানা যাবে, এসবের পেছনে কার হাত আছে।
দরজায় টোকা পড়ায় ওরা দুজনই চমকে উঠল।
দরজা খুলে যেতে যেতে উঠে দাঁড়াল ক্রো।
গানথারকে পাশে নিয়ে অ্যানা হাজির। শেষবার যখন গানথারকে দেখেছিল তখন বেশ নোংরা দেখালেও এখন পরিষ্কার হয়ে এসেছে। ওদের দুজনকে ভয় দেখানোর জন্য সাথে করে গার্ড আনেনি। এমনকী ওর নিজের কাছেও কোনো অস্ত্র নেই।
আমাদের সাথে সকালের নাস্তা করতে আশা করি আপনাদের আপত্তি নেই, বললেন না। নাস্তা শেষ করে আপনাদের চাহিদা মোতাবেক জিনিসপত্র সরবরাহ করা হবে।
সব? কীভাবে? কোত্থেকে পেলেন?
কাঠমাণ্ডু। পাহাড়ের আরেক পাশে আমাদের একটা হেলিপ্যাড আছে।
সত্যি? হেলিপ্যাড আছে অথচ সেটা কখনও কারো চোখে পড়েনি?
শ্রাগ করলেন অ্যানা। প্রতিদিন গড়ে ১২ বার করে সাইট দেখার টুর আর পর্বতারোহীদের নিয়ে আমাদের হেলিকপ্টার চলাচল করে। যা-ই হোক, ১ ঘন্টার মাঝে পাইলট ফিরবে।
মাথা নাড়ল পেইন্টার। এই ১ ঘণ্টার সর্বোত্তম ব্যবহার করতে হবে ওকে।
সবকিছু জানতে হবে।
প্রত্যেকটা সমস্যারই সমাধান থাকে। আশা করতে দোষ কী।
রুম থেকে বেরোল ওরা। হলওয়েতে আজ বেশ লোকজনের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। ওদের কথা জেনে গেছে সবাই। তাই এক নজর দেখতে এসেছে। কেউ কেউ রেগেও আছে। মনে হচ্ছে… স্যাবোটাজের জন্য পেইন্টার আর লিসা-ই দায়ী। তবে ওদের কেউ খুব কাছে ঘেঁষল না। কারণ সামনে পথ ফাঁকা করতে করতে গানথার এগোচ্ছে। যাদের হাতে বন্দী হয়েছিল তারাই রক্ষকের ভূমিকা পালন করছে এখন।
অ্যানার স্টাডি রুমে পৌঁছুল ওরা।
ফায়ারপ্লেসের সামনে থাকা টেবিলের ওপর একগাদা খাবার সাজানো আছে। সসেজ, পাউরুটি, সেদ্ধ করা খাবার, পরিজ, পনির আর ফল-ফলাদির মধ্যে আছে কালো জাম, তরমুজ ও আলুবোখারা।
আমাদের সাথে পুরো ব্যাটেলিয়নও খেতে বসবে নাকি? খাবারের এত বাহার দেখে পেইন্টার জানতে চাইল।
শীতপ্রধান এলাকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার থাকা খুবই জরুরি বিষয়। এতে দেহ, মন দুটোই ভাল থাকে। বললেন অ্যানা।
বসল ওরা। সবাইকে খাবার পরিবেশন করা হলো। এ যেন বড় এক পরিবার।
যদি চিকিৎসা করার কোনো উপায় থাকে, বলল লিসা, সেক্ষেত্রে আমরা আপনাদের এই বেল সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। বেল-এর ইতিহাস… কীভাবে কাজ করতো… এসব জানতে চাই।
হেঁটে আসার পর অ্যানার মন একটু খারাপ থাকলেও এখন বেশ ভাল লাগছে। তাদের এই আবিষ্কার সম্পর্কে আলোচনা করার জন্য দুনিয়ার সব গবেষক-ই আগ্রহ প্রকাশ করবে। এটাই স্বাভাবিক।
এনার্জী জেনারেটর হিসেবে পরীক্ষার মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল, অ্যানা বলতে শুরু করলেন। একটা নতুন ইঞ্জিন। এর নাম বেল হয়েছিল ঘণ্টা আকৃতির বহিঃস্থ জারের কারণে। সিরামিকের তৈরি জারের আকার ছিল একশ গ্যালন ড্রামের সমান। সীসা দিয়ে লাইন করাছিল। ইঞ্জিনের ভেতরে ছিল দুটো ধাতব সিলিন্ডার। একটা সিলিন্ডারের ভেতরে আরেকটা ঢোকানো ছিল। দুটো পরস্পর বিপরীত দিকে ঘুরতো।
অ্যানা হাত নেড়ে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করলেন।
পুরো জিনিসটায় তেল দিয়ে বেল-এর ভেতরে মারকারির মতো তরল ধাতু দিয়ে ভরে দেয়া হতো। সেই তরল ধাতুর নাম : জেরাম-৫২৫।
নামটা চিনতে পারল ক্রো। এই জিনিসের কথা আপনি আগেই বলেছিলেন। এটা আপনারা পুনরায় উৎপাদন করতে পারছেন না।
মাথা নেড়ে সায় দিলেন অ্যানা। আমরা বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা করে আসছি। তরল ধাতুর ভেতরের কী কী উপাদান আছে সেটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চালিয়েছি অনেক। সেখান থেকে আমরা জেনেছি এতে থরিয়াম আর বেরিলিয়াম পেয়োক্সাইডস আছে। ব্যস এটুকুই, আর কিছু জানা সম্ভব হয়নি। অথচ জেরাম-৫২৫ হলো নাৎসদের জিরো পয়েন্ট এনার্জী প্রজেক্টের একদম প্রধান উপাদান। জেরাম-৫২৫ ছাড়া কোনোভাবেই চলবে না। যে ল্যাবে এটা তৈরি করা হতো যুদ্ধের পর পর সেটাকে ধ্বংস করে দেয়া হয়।
