… আর তারপর আপনি কী করলেন? কাদা-পানির ভেতরে গিয়ে লুকালেন? চাপ দিয়ে রিপোর্ট ভাজ করে ফেললেন জেরাল্ড। আপনার কী মনে হয়, এই রিপোর্ট আমাদের সার্ভিসের মানের ওপর প্রশ্ন সৃষ্টি করবে না? আমাদের একজন ওয়ার্ডেন একজন ৬০ বছর বয়স্কা নারীকে মরতে দিয়ে নিজে পালিয়ে জীবন বাঁচিয়েছে! কোন প্রাণী এসে আক্রমণ করেছে সেটা খোঁজার চেষ্টা পর্যন্ত করেনি!
স্যার, বিষয়টা ওরকম না…
কীসের ওরকম না? গর্জে উঠলেন জেরাল্ড। এতটাই জোরে যে রুমের বাইরেও তার গলার আওয়াজ শোনা গেল। রুমের বাইরে সকল স্টাফকে জরুরি তলব করে ডেকে আনা হয়েছে। ড, ফেয়ারফিল্ডের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করে আমি কী বলব? বলব… তাদের মা কিংবা দাদুনানুকে কোনো এক প্রাণী আক্রমণ করে টেনে নিয়ে গেছে আর আমার এক ওয়ার্ডেন… অস্ত্রধারী ওয়ার্ডেন পালিয়ে নিজের জান বাঁচিয়ে গুষ্ঠী উদ্ধার করেছে?
আমার তখন কিছুই করার ছিল না।
শুধু নিজের… চামড়া বাঁচানো ছাড়া।
বাক্যের মধ্যে অনুচ্চারিত শব্দটিও খামিশি শুনতে পেল।
শুধু নিজের কালাচামড়া বাঁচানো ছাড়া।
খামিশিকে চাকরি করতে দেখে জেরাল্ড মোটও অবাক হননি। খামিশির পরিবারের সাথে পুরো আফ্রিকানের সরকারের সাথে সম্পর্ক আছে। আর সেই যোগসূত্র ধরেই এই পদে অধিষ্ঠিত হতে পেরেছে খামিশি। এমনকি সে এখনও ওলডাভি কান্ট্রি ক্লাবের সদস্য, যেখানে কি-না সবসময় অভিজাত সাদা চামড়াধারী বিত্তশালীদের আড্ডা বসে। তবে নতুন আইন পাস হওয়ার পর থেকে অনেক জাত-ভেদ, বাধা-বিঘ্ন কমে গেছে। এখনও সাউথ আফ্রিকায় ব্যবসা বলতে ব্যবসা-কেই বোঝায়। কোনোপ্রকার গণ্ডগোল নেই। ডি বিয়ার্সেস-রা তাঁদের হীরের খনি এখনও ধরে রেখেছে অন্যদিকে বাকি সবকিছু আছে ওয়ালেনবার্গ-এর দখলে।
পরিবর্তন আসবে, তবে সেটা আসবে ধীরে ধীরে।
খামিশির এই পদে যোগদান হলো একটি ছোট পদক্ষেপ মাত্র। ওর এই চাকরির মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বেশ সুবিধে করে দিয়ে যেতে পারবে। নিজের ও পরবর্তী প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে কণ্ঠস্বর শান্ত রাখল খামিশি। যদি তদন্তকারিগণ ঘটনাস্থল পরীক্ষা করে আসেন, তাহলে আমি নিশ্চিত আমার কৃতকর্মের পক্ষেই রায় দেবেন তাঁরা।
তাই নাকি, মিস্টার টেইলর? মাঝরাতে হেলিকপ্টার আপনাকে কাদা-পানির ভেতর থেকে উদ্ধার করে আনার ১ ঘণ্টা পরেই আমি এক ডজন লোক পাঠিয়েছিলাম। ১৫ মিনিট আগে তারা রিপোর্ট দিয়েছে। শিয়াল আর হায়নার তাণ্ডবে প্রায় ছিঁড়ে-খুঁড়ে যাওয়া রাইনোর লাশ পেলেও আপনার রিপোর্টে থাকা বাচ্চা রাইনোর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। তারচেয়েও বড় কথা ড. মারশিয়া ফেয়ারফিল্ডেরও কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
মাথা নাড়ল খামিশি। এই অভিযোগগুলো থেকে নিজেকে মুক্ত করার পথ খুঁজছে। রাতের কথা মনে করল ও। দিন তো মনে হচ্ছিল ফুরোবে না, কিন্তু রাত নামার পর অবস্থা আরও জঘন্য হয়েছিল। সূর্য ডোবার পর থেকে হামলায় আক্রান্ত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল খামিশি। কিন্তু হায়নার ইয়েপ-ইয়েপ-ইয়েপ ডাক, শিয়ালের হুক্কা-হুঁয়া আর বিভিন্ন পশুপাখির ডাক ছাড়া আর কিছুই শুনতে পায়নি।
পশুপাখিদের ডাক শুনে ও তখন ভেবেছিল এখন জিপের দিকে দৌড় দেয়া নিরাপদ হবে। যেহেতু স্বাভাবিকভাবে শিয়াল আর হায়না এখানে উপস্থিত হয়েছে, তার মানে দাঁড়াল, চলে গেছে উকুফা।
কিন্তু খামিশি তবুও নড়ল না।
ওর মনে তখনও ড. মারশিয়ার আক্রান্ত হবার দৃশ্য তাজা ছিল। সাহস হলো না।
ওই প্রাণীর পায়ের ছাপ নিশ্চয়ই অন্যরকম হবে, বলল ও। ওখানে… একটু আশান্বিত হয়ে ভাবল খামিশি। যদি ওর কাছে প্রমাণ থাকত…
সিংহের পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে। বললেন জেরাল্ড। একটু আগে আমি সেটাই বলছিলাম।
সিংহ?
হ্যাঁ। আমার মনে হয় আমাদের কাছে সেই উদ্ভট প্রাণীর কিছু ছবিও আছে। আপনি বরং সেগুলো ভালভাবে দেখে রাখুন, যাতে ভবিষ্যতে দেখলে চিনতে পারেন। আপনার হাতে তো সামনে অঢেল সময়, সময়গুলোকে এই কাজে লাগাবেন।
স্যার?
মিস্টার টেইলর, আপনাকে বরখাস্ত করা হলো।
এই ধাক্কা লুকোতে ব্যর্থ হলো খামিশির চেহারা। ও জানে, এখানে ওর জায়গায় যদি অন্য কোনো ওয়ার্ডেন হতো… সাদা চামড়ার কেউ… তাহলে এই সিদ্ধান্ত হতো না। আরেকটু বিবেচনা করে দেখা হতো। কিন্তু ওর গায়ে যখন উপজাতির কালো চামড়া আছে সেহেতু ও সেই বিবেচনা পাবে না। এই বিষয় নিয়ে খামিশি তর্কে যেতে চায় না। তর্কে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যাবে।
আপনাকে কোনো টাকাও দেয়া হবে না। আগে পুরো তদন্ত শেষ হোক, তারপর পাবেন।
পুরো তদন্ত। খামিশি জানে সেই তদন্ত কীভাবে শেষ হবে।
পুলিশ বলেছে আপনি এই অঞ্চল ছেড়ে কোথাও যেতে পারবেন না। দায়িত্বের বিষয়টা ছাড়াও ক্রিমিনাল ব্যাপার-স্যাপার আছে।
খামিশি চোখ বন্ধ করল।
সূর্য উঠলেও কাল রাতের আঁধার এখনও কাটেনি।
.
দশ মিনিট পর।
জেরাল্ড কেলজ তাঁর ডেস্কে বসে আছেন। অফিস রুম এখন ফাঁকা। ঘেমে যাওয়া হাতের তালু দিয়ে নিজের আপেলের মতো চকচকে মাথায় হাত বুলাচ্ছেন তিনি। ঠোঁট বাঁকিয়ে বসে আছেন, স্বস্তি পাচ্ছেন না। রাতের ঘটনাটি তো আর মুছে ফেলা যাবে না, অনেক ঝক্কি সামলাতে হবে এবার। হাজারটা জিনিসের দিকে নজর রাখতে হবে তাকে। মিডিয়াকে সামলাতে হবে, ড, ফেয়ারফিল্ডের পরিবার ও পার্টনারের মুখোমুখি হতে হবে।
