তারপর মনে পড়ল ওর।
ও জানে।
দুর্ঘটনা… বলল ক্রো।
ওর হাতের ভেতরে থাকা অ্যানার আঙুল কেঁপে উঠল।
ওটা তাহলে দুর্ঘটনা ছিল না, তাই তো? মাথার ভেতরে ঘুরতে থাকা কথাগুলো মনে করল ক্রো।
স্যাবোটাজও ছিল। মাথা নাড়লেন অ্যানা। প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম ব্যাপারটা দুর্ঘটনা। আমরা বিভিন্ন সময় তরঙ্গ সম্পর্কিত সমস্যায় পড়ে থাকি। বেল-এর আউটপুট হিসেবে সেগুলোকে বের করে দেই। খুব বড় কিছু নয়। এনার্জী বাইরে বের করে দেয়ার ফলে কিছু রোগ হয়। কিছু মৃত্যু হয়, এই তো।
মাথা নেড়ে প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল পেইন্টার, কিন্তু নিজেকে সামলে নিল। তেমন কিছু নয়। রোগ আর মৃত্যুগুলোর কারণে আং গেলু আন্তর্জান্তিক পরিমণ্ডলে ফোন করেছিলেন, যার ফলে পেইন্টার আজ এখানে।
অ্যানা বলে যাচ্ছেন, কিন্তু কয়েক রাত আগে কেউ একজন আমাদের রুটিন সেটিংস বদলে বেল-এর আউটপুটের মান অনেক বাড়িয়ে দেয়।
আর সেটার প্রভাব পড়ে মঠ ও গ্রামের ওপর।
ঠিক বলেছেন।
অ্যানার হাত শক্ত করে ধরল ক্রো। মনে হলো তিনি বোধহয় হাত ছাড়িয়ে নিতে চাচ্ছেন। কিন্তু পেইন্টার ছেড়ে দেয়ার পাত্র নয়। অ্যানা পুরো বিষয়টি খোলাসা করা এড়িয়ে যেতে চাইছেন। কিন্তু পেইন্টারও জানে আসল ঘটনা ওকে জানতেই হবে। তাহলে একে অপরকে সাহায্য করার প্রস্তাবটি সম্পর্কেও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
মঠের সন্ন্যাসী আর গ্রামবাসীরাই শুধু আক্রান্ত হয়নি, বলল পেইন্টার। তাদের সাথে এখানকার সবাই আক্রান্ত হয়েছে। আপনারা সবাই আমার মতো অসুস্থ। মঠের মতো অত গভীর লক্ষণ প্রকাশ পায়নি, তবে আপনারাও আমার মতো ধীরে ধীরে মৃত্যুর পথে এগোচ্ছেন।
চোখ সরু করলেন না। ক্রোকে পর্যবেক্ষণ করে মেপে নিলেন কতখানি বলবেন… অবশেষে মাথা নাড়লেন তিনি। আমরা এখানে… কোনমতে নিরাপদ আছি। বেল-এর ক্ষতিকারক রেডিয়েশনের অধিকাংশই শ্যাফট দিয়ে উপরে পাঠিয়ে বাইরে বের করে দেয়া হয়েছে।
পাহাড়ের উপরে ভূতুড়ে আলোর কথা মনে পড়ল পেইন্টারের। নিজেদেরকে বাঁচানোর জন্য জার্মানিরা বিপজ্জনক রেডিয়েশন পুরো এলাকায় ছড়িয়ে দিয়েছে। যদিও এখানকার বিজ্ঞানীরা এত চেষ্টা করেও পুরোপুরি রক্ষা পায়নি।
কোনোরকম কুণ্ঠা ও অপরাধবোধে না ভুগে অ্যানা বললেন। আমরা সবাই এখন একই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত।
হাতে অন্যকোনো রাস্তা খোলা আছে কিনা ভাবল পেইন্টার। নেই। দুই পক্ষের কেউই কাউকে বিশ্বাস করছে না, কিন্তু দুই পক্ষ এখন একই নৌকার যাত্রী। সে হিসেবে মিলেমিশে থাকাই ভাল। অ্যানার হাত ঝাঁকিয়ে দিয়ে ডিল পাকা করল ক্রো। সিগমা ও নাৎসি এখন একদল।
০৭. ব্ল্যাক মাম্বা
দ্বিতীয় খণ্ড
০৭. ব্ল্যাক মাম্বা
ভোর ৫ টা ৪৫ মিনিট।
হুলুহুলুই-আমফলোজি প্রিজার্ভ
জুলুল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা।
প্রধান ওয়ার্ডেনের ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে আছে খামিশি টেইলর। ওয়ার্ডেন জেরাল্ড কেলজ ওর দেয়া গতকালের রিপোর্ট পড়ে শেষ করা পর্যন্ত মেরুদণ্ড শক্ত করে অপেক্ষা করল। মাথার ওপরে ঘুরতে থাকা ফ্যান থেকে বেরোনো আওয়াজ ছাড়া রুমে কোনো আওয়াজ নেই।
ধার করা পোশাক পরে আছে খামিশি। প্যান্ট খুব বেশি লম্বা আর শার্ট বেশ টাইট হয়েছে। তবে ওগুলো শুকনো। গতকাল সারাদিন-রাত কাদাপানিতে শরীর ডুবিয়ে রাইফেল হাতে তৈরি হয়ে ছিল ও। ডাঙায় উঠে এখন এই শুকনো কাপড়-চোপড়ের মূল্য বুঝতে পারছে।
দিনের আলো যে কতখানি জরুরি সেটাও বুঝতে পারছে ও। অফিসের পেছনের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে ভোরের সূর্য গোলাপি আভা ফোঁটাচ্ছে আকাশে। ছায়া থেকে বেরিয়ে আসছে পৃথিবী।
বেঁচে ফিরেছে খামিশি। বেঁচে আছে।
নিজেকে বাঁচানো ছাড়া কিছু করার ছিল না ওর।
ওর মাথায় এখনও উকুফার চিৎকার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
রিপোর্ট পড়তে পড়তে প্রধান ওয়ার্ডেন জেরাল্ড কেলজ তার গোঁফ মোচড়ালেন। ভোরের আলো এসে তার চকচকে টাকঅলা মাথায় পড়ে সেটাকে তেলতেলে উজ্জ্বল করে তুলল। নাকের ডগায় অর্ধচন্দ্রাকৃতির রিডিংগ্লাস নিয়ে অবশেষে মুখ তুললেন তিনি।
মিস্টার টেইলর, আপনি চান আমি এই রিপোর্ট ফাইল করে রাখি? রিপোর্টের হলদে কাগজের ওপর এক আঙুল চালিয়ে দেখালেন। একটা অজ্ঞাত জানোয়ার। ড. ফেয়ারফিল্ডকে টেনে নিয়ে গিয়ে খুন করেছে একটা অজ্ঞাত জানোয়ার। আপনি আর জিনিস খুঁজে পেলেন না?
স্যার, আমি প্রাণীটাকে ভালভাবে দেখতে পাইনি। কেমন যেন বিশাল সাদা। লোমশঅলা। রিপোর্টে লিখেছি, স্যার।
সিংহী হবে হয়তো। বললেন জেরাল্ড।
না, স্যার… কোনো সিংহ-টিংহ নয়।
কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছেন? একটু আগেই না বললেন, প্রাণীটাকে আপনি ভালভাবে দেখতে পাননি?
জ্বী, স্যার… মানে ইয়ে… স্যার… আমি পরিচিত কোনো প্রাণীর সাথে ওটার কোনো মিল পাইনি।
তাহলে কী পেয়েছেন?
চুপ মেরে গেল খামিশি। ও জানে উকুফার নাম উচ্চারণ করলেই ল্যাঠা চুকে যাবে। কিন্তু সাদামাটা রৌদ্রউজ্জ্বল দিয়ে উকুফার কথা বললে হাসির পাত্র হতে হবে ওকে। খামিশি আফ্রিকার উপজাতির বংশধর হওয়ায় কুসংস্কারে আক্রান্ত বলে সবাই পরিহাস করবে।
কোনো একটা জানোয়ার ড. ফেয়ারফিল্ডকে আক্রমণ করে টেনে নিয়ে যায়। আপনি ওটাকে কাছ দেখে দেখতে পারেননি যে চিনে ফেলবেন…
ধীরে ধীরে খামিশি মাথা নাড়ল।
