উপরে তাকাল পেইন্টার। পিলারটি ছাদ পর্যন্ত ওঠার পর সেটা ছাড়িয়ে আর উপরে চলে গেছে… পাহাড় ফুড়ে গেছে সম্ভবত। বজ্রনিরোধক রঙ, ভাবল পেইন্টার। ও অনুভব করল বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ বেড়ে গেছে। ধোয়ার চেয়ে এখন অক্সিজেন বেশি।
পেইন্টারকে তাকাতে দেখে বললেন অ্যানা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত এনার্জী আমরা এই শ্যাফট দিয়ে পাহাড়ের বাইরে পাঠিয়ে দেই। উপরের দিকে নির্দেশ করে দেখালেন।
ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল পেইন্টার। এই অঞ্চল থেকে ভূতুড়ে আলো আকাশে ওঠে। এটা কী সেই আলোর উৎস? আলো আর অসুস্থতা হয়তো এই একই উৎস থেকে নির্গত হয়েছে?
নিজের রাগে লাগাম টেনে সিঁড়ির দিকে মনোযোগ দিল পেইন্টার। ওর মাখার ভেতরে আবার দপদপ করে শুরু করায় কেমন যেন দুলে উঠতে চাইল সবকিছু। মনোযোগ অন্যদিকে সরাতে ও কথা বলতে শুরু করল। দ্য বেল-এর কাহিনিতে ফিরে যাই। তারপর?
চিন্তা থেকে বেরিয়ে এলেন অ্যানা। প্রথমে কেউ কিছুই জানত না। রিসার্চের মাধ্যমে বেরিয়ে এলো এটা একধরনের এনার্জী সোর্স। কেউ কেউ ভাবল এটা হয়তো কোনো একধরনের টাইম মেশিন হবে। আর সেজন্যই হয়তো এটার কোড নেম দেয়া হয়েছিল ক্রোনস।
টাইম ট্রাভেল? প্রশ্ন করল পেইন্টার।
আপনাকে মনে রাখতে হবে, অ্যানা বললেন, তথ্য-প্রযুক্তির দিক দিয়ে নাৎসিরা অন্য সব জাতি থেকে অনেক এগিয়ে ছিল। আর সেকারণেই জার্মানি থেকে পাইকারী হারে টেকনোলজি চুরির হিড়িক পড়েছিল যুদ্ধের পর। একটু পেছন থেকে বলি… শতাব্দীর শুরুর দিকে দুটো তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে বেশ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল। এক, দ্য থিওরি অব রিলেটিভিটি অর্থাৎ আপেক্ষিক তত্ত্ব। দুই, দ্য কোয়ান্টাম থিওরি। শুরু হয়ে গেল এই দুই থিওরি নিয়ে ঠেলাঠেলি। এমনকি আপেক্ষিক তত্ত্বের জনক আইনস্টাইন স্বয়ং বলেছিলেন, এই দুই থিওরি পরস্পরবিরোধী। থিওরি দুটো পুরো বিজ্ঞান জগৎকে দুই ভাগে ভাগ করে দেয়। আর আপনি খুব ভাল করেই জানেন পশ্চিমা বিশ্ব কোন থিওরিকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিল।
আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব।
অ্যানা মাথা নাড়লেন। সেই থিওরি থেকে অ্যাটম বোম্ব ও নিউক্লিয়ার এনার্জীর মতো জিনিসের জন্ম হয়েছিল। ম্যানহ্যাটেন প্রজেক্ট-এ পরিণত হয়ে গেল পুরো পৃথিবী। সবকিছুর পেছনে ছিল আইনস্টাইনের সেই থিওরি। এদিকে ভিন্ন পথ বেছে নিল নাসিরা। তাঁরাও তাদের নিজস্ব ম্যানহ্যাটেন প্রজেক্ট তৈরি করল। তবে সেটার ভিত্তি হলো কোয়ান্টাম থিওরি।
ভিন্ন পথ, ভিন্ন থিওরি বেছে নেয়ার কারণ জানতে চাইল লিসা।
খুব সহজ কারণ। অ্যানা ওর দিকে ফিরলেন। কারণ আইনস্টাইন ইহুদি ছিলেন।
কী?
ওই সময়কার পরিস্থিতির কথা মনে করে দেখুন। আইনস্টাইন ইহুদি ছিলেন। তাই নাৎসিদের চোখে তার আবিষ্কারের গুরুত্বও ছিল কম। আর সেজন্য নাৎসিরা একজন খাঁটি জার্মান বিজ্ঞানীর কাজের কদর করতে শুরু করল। জার্মান বিজ্ঞানীর আবিষ্কার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাদের কাছে। ওয়ার্নার হেইন্সবার্গ ও এরউইন স্করডইঙ্গার-এর মতো বিজ্ঞানীদের কর্মের দিকে মনোযোগ দিল। বিশেষ করে নজর দিল ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক-এর দিকে। কারণ ম্যাক্স হলেন কোয়ান্টাম থিওরির জনক। তো নাৎসিরা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ওপর ভিত্তি করে হাতে-কলমে কাজ করতে শুরু করল, তাদের কাজ এই আজকের দিনে এসেও ব্যাপক মর্যাদা লাভ করেছে। নাৎসি বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস ছিল কোয়ান্টাম মডেল ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে শক্তির উৎসের মুখে ছিপি আটকে দেয়া সম্ভব। আর তাদের সেই চিন্তাধারা সবেমাত্র কিছুদিন হলো মানুষজন অনুধাবন করতে পারছে। আজকের আধুনিক বিজ্ঞান ওটার নাম দিয়েছে জিরো পয়েন্ট এনার্জী।
জিরো পয়েন্ট পেইন্টারের দিকে তাকাল লিসা।
মাথা নেড়ে সায় দিল পেইন্টার। বিজ্ঞানের এই অংশ ওর জানা আছে। যখন কোনো বস্তুকে শূন্য ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের চেয়ে আর ৩ হাজার ডিগ্রি নিচে ঠাণ্ডা করা হয়, ওটার ভেতরে থাকা সকল পরমাণুর নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায় তখন। সবকিছু একদম স্থির। দ্য জিরো পয়েন্ট অব নেচার। কিন্তু তখনও এনার্জী বা শক্তি থাকে। একটা ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন থাকে যেটা থাকার কথা নয়। প্রচলিত থিওরিগুলো দিয়ে ওই এনার্জীর উপস্থিতির ব্যাখ্যা দেয়া অসম্ভব।
কিন্তু কোয়ান্টাম থিওরি দিয়ে সম্ভব, দৃঢ় কণ্ঠে বললেন না। পরমাণুগুলোকে এই থিওরি নড়াচড়া করতে দেয়, এমনকি একদম ঠাণ্ডা স্থবির তাপমাত্রাতেও।
সেটা কীভাবে সম্ভব? লিসা জানতে চাইল।
অ্যাবসুলেট জিরো অর্থাৎ পরম শূন্য তাপমাত্রায় পরমাণুগুলো উপরে, নিচে, ডানে কিংবা বামে নড়তে পারে না ঠিকই কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্স অনুসারে ওগুলো নিজ অবস্থানে থেকে গায়েব হয়ে গিয়ে এনার্জী বিকিরণ করতে পারে। ওটাকে জিরো পয়েন্ট এনার্জী বলা হয়।
গায়েব হয়ে গিয়ে এনার্জী বিকিরণ করতে পারে? মনে হচ্ছে লিসা একটু সন্তুষ্ট।
বলার দায়িত্ব নিল পেইন্টার। কোয়ান্টাম ফিজিক্স একটু উদ্ভট গোছের। সাদা চোখে এটাকে পাগলামো বলে মনে হলেও এনার্জী কিন্তু সত্যি সত্যিই পাওয়া যায়। ল্যাবে রেকর্ডও করা হয়েছে। পুরো পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা সবকিছুর ভেতরে এই এনার্জীর উৎস বসাবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এটার মাধ্যমে অফুরন্ত, অসীম শক্তি বা পাওয়ার পাওয়া যেতে পারে।
