করিডোর ধরে এগোচ্ছে ওরা।
পেইন্টার খেয়াল করে দেখল ওরা যত সামনে এগোচ্ছে বাতাসে ঘন বাস্পের পরিমাণ তত বাড়ছে। তবে বাষ্প ছেড়ে ও আবার অ্যানার দিকে মনোযোগ দিল।
তাহলে আপনি জানেন, কোন জিনিসটা আমাকে অসুস্থ করেছে, বলল ক্রো।
আগেই বলেছি, ওটা একটা দুর্ঘটনা ছিল।
কীসের দুর্ঘটনা? একটু জোর করল ও।
উত্তরটা খুব সহজ নয়। এর ইতিহাস জড়িয়ে আছে।
ওর দিকে তাকালেন অ্যানা। এই পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তির ইতিহাস থেকে শুরু করে…
তাই নাকি? ক্রো বলল। তো এই কাহিনি কত লম্বা? মনে রাখা ভাল, আমার হাতে মাত্র তিন দিন সময় আছে।
ওর দিকে তাকিয়ে হাসলেন অ্যানা। সেক্ষেত্রে আমি আমার দাদুর ইতিহাস থেকে শুরু করতে পারি। যুদ্ধ শেষে উনি GranitschloB–এ প্রথমবারের মতো এসেছিলেন। ওই সময়ের গণ্ডগোল সম্পর্কে আপনার জানা আছে। জার্মানির পতন হতেই ইউরোপে যে তুলকালাম শুরু হয়েছিল?
সবকিছু যে যার মতো লুটেছে তখন।
শুধু জার্মানির ভূখণ্ড আর সম্পদ নয়, আমাদের গবেষণা-রিসার্চও লুট হয়েছিল। মিত্রপক্ষ থেকে বিজ্ঞানী ও সৈনিকের দল পাঠিয়ে জার্মান ভূখণ্ডে থাকা গোপন টেকনোলজিগুলো লুট করা হয়েছিল তখন। একদম বিনে পয়সায় সবাই তখন ওসব বাগিয়ে নিয়ে গেছে। ভ্রু কুঁচকে ওদের দিকে তাকালেন অ্যানা। ঠিক বললাম তত?
লিসা ও ক্রো দুজনই মাথা নেড়ে সায় দিল।
টি-ফোর্স কোড নাম দিয়ে ৫ হাজার সৈনিক ও সিভিলিয়ানকে পাঠিয়েছিল ব্রিটেন। টি-ফোর্স মানে, টেকনোলজি ফোর্স। তাদের কাজ ছিল জার্মানির বুকে থাকা বিভিন্ন তথ্য-প্রযুক্তির হদিস বের করা ও সেগুলো লুটে নেয়া। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আমেরিকান, ফ্রেন্স আর রাশিয়ানরা। আচ্ছা আপনি জানেন ব্রিটিশ টি-ফোর্সের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিল?
মাথা নাড়ল পেইন্টার, জানে না। নিজের সিগমা ফোর্সের সাথে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার তথ্য-প্রযুক্তি লুটকারী একটি দলের সাথে কোনোভাবেই তুলনা করতে পারছে না ও। এই ব্যাপারে সিগমা ফোর্সের প্রতিষ্ঠাতা শ্যেন ম্যাকনাইট-এর সাথে আলাপ করা যেতে পারে। যদি ও অতদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে আরকি।
প্রতিষ্ঠাতা কে ছিল? লিসা জানতে চাইল।
ভদ্রলোকের নাম কমান্ডার ইয়ান ফ্লেমিং।
নাক দিয়ে ঘোঁতঘোত করল লিসা। জেমস বন্ডের রচয়িতা?
হ্যাঁ। বলা হয়ে থাকে, তিনি তার সেই ফোর্সের কিছু চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে জেমস বন্ডের স্বভাব-চরিত্র তৈরি করেছিলেন। জেমস বন্ড পড়া থাকলে তাদের সুট পাট করার তেজ, সাহস আর বেপরোয়াপূর্ণ আচরণ সম্পর্কে কিছু ধারণা পাবেন।
যুদ্ধে জয়ী পক্ষ সব লুটে নেয়, শ্রাগ করে বলল পেইন্টার।
হয়তো। তবে আমার দাদুর দায়িত্ব ছিল যতদূর সম্ভব নিজেদের টেকনোলজিগুলো রক্ষা করা। sicherheitsdienst–এর অফিসার ছিলেন তিনি। অ্যানা পেইন্টারের দিকে তাকালেন, পরীক্ষা করে দেখছেন।
তাহলে দেখা যাচ্ছে খেলা শেষ হয়নি। ওকে চ্যালেঞ্জ নিতে হবে।
দ্য sicherheitsdienst ছিল এসএস কমান্ডোর একটি দল। জার্মানের গুপ্তধন যেমন : শিল্প, সোনা, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও টেকনোলজি ইত্যাদি রক্ষা করাই ছিল তাদের কাজ।
সায় দিয়ে মাথা নাড়লেন অ্যানা। যুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে পূর্বাঞ্চল দিয়ে রাশিয়ানরা যখন এগোচ্ছিল তখন আমার দাদুকে একটি দায়িত্ব দেয়া হয়। যেটাকে আপনারা আমেরিকানরা ডিপ ব্ল্যাক মিশন বলে থাকেন। জবরপযংভবৎ ধরা পড়ে আত্মহত্যা করার আগে সরাসরি হেনরিক হিমল্যারের কাছ থেকে নির্দেশ পেয়েছিলেন তিনি।
তার দায়িত্ব কী ছিল? পেইন্টার জানতে চাইল।
কোড নেম ক্রোনস নামের একটি প্রজেক্টের যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ ধ্বংস করে দিতে হবে। die Glocke নামের একটি ডিভাইস বানানোর প্রজেক্ট ছিল সেটা। ওটার আরও একটা নামও আছে : দ্য বেল। সাডেটেন পাহাড়ের কোনো এক পরিত্যক্ত খনিতে রিসার্চ ল্যাবটাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। এই প্রজেক্টের উদ্দেশ্য সম্পর্কে দাদুর কোনো ধারণাই ছিল না। পরে হয়েছিল হয়তো। সবকিছু তিনি প্রায় নষ্টই করে ফেলেছিলেন… কিন্তু দায়িত্ব তো দায়িত্বই।
তাহলে দ্য বেল নিয়ে পালালেন। কীভাবে?
তার হাতে দুটো পরিকল্পনা ছিল। এক, নরওয়ে হয়ে উত্তরদিকে চলে যাওয়া। দুই. অ্যাড্রিয়াটিক হয়ে দক্ষিণে। দুই পথেই তাকে সাহায্য করার জন্য এজেন্টরা তৈরি ছিল। আমার দাদু উত্তর দিকে রওনা হলেন। সম্পর্কে হিমল্যার তাকে জানিয়ে ছিলেন। এক দল নাসি বিজ্ঞানী আর কিছু ইতিহাস নিয়ে পালালেন তিনি। লুকোনোর দরকার ছিল। তার ওপর দাদু একটা প্রজেক্ট শুরু করলেন, যেটা থেকে লোভ-সংবরণ করা বিজ্ঞানীদের জন্য কঠিন ছিল।
দ্য বেল, বলল পেইন্টার।
একদম। ওই সময়ের অধিকাংশ বিজ্ঞানীর মনের চাওয়া পূরণ করেছিল সেটা।
কী?
শ্বাস ফেলে কালাউসের দিকে পেছন ফিরে তাকালেন অ্যানা। পারফেকশন। নিখুঁত, সর্বোৎকৃষ্ট। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন তিনি। ব্যক্তিগত দুঃখে ডুবে গেছেন।
সামনের প্যাসেজ অবশেষে শেষ হলো। লোহা ও কাঠ দিয়ে তৈরি এক জোড়া বিশালাকার দরজা উদয় হলো সামনে। দরজার ওপাশে একটি বেহালদশাঅলা সিঁড়ি প্যাচিয়ে প্যাচিয়ে পাহাড়ের আরও গভীরে নেমে গেছে। সিঁড়িটি পাথর কেটে বানানো হলেও গাছের গুঁড়ির মতো মোটা স্টিলের একটি পিলারকে কেন্দ্র করে নেমে গেছে। নিচে। এই সিঁড়ি দিয়েই ওদের নামতে হবে।
