ফিওনাও ওটার দিকে লক্ষ্য স্থির করল।
ক্ষত-বিক্ষত বাম পাখনা নিয়ে ছুটল ডাকলিং। ঝাঁকি খেয়ে রাস্তায় উঠল ওরা। ফিওনা ডাকলিং চালিয়ে গেল।
প্রথম কোণায় চলল, হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল গ্রে।
ফিওনা দক্ষ পেশাদারদের মতো গিয়ার নামিয়ে গ্রের আদেশ পালন করল। কোণার দিকে এগোল ডাকলিং। দুই মোড় পার হওয়ার পর গ্রে ক্যাব থামাতে বলল।
আমরা এই জিনিস আর চালিয়ে নিতে পারি না, বলল ও। এটা দেখতে অদ্ভুত দেখায়। দৃষ্টিআকর্ষণ করে সবার।
তোমার তা-ই মনে হয়? রেগে মাথা নাড়ল ফিওনা।
টুল কিটের ভেতরে গ্রে একটি লম্বা রেঞ্জ পেল। রাস্তার পাশে পাহাড়ের চূড়োয় ক্যাব থামিয়ে ফিওনাকে নামিয়ে দিল ও। গিয়ার বাড়িয়ে ক্লাচ সরাল গ্রে, অ্যাক্সেলেটরের উপরে রেঞ্জ দিয়ে চাপ দিয়ে রেখে আটকে দেয়ার পর ক্যাব থেকে লাফ দিলো।
পাখনায় আলো নিয়ে পাহাড়ের নিচের দিকে রওনা হলো আগলি ডাকলিং। যেখানে গিয়ে এটা ক্রাশ (দুর্ঘটনা, দুমড়ে যাওয়া) করবে সবার দৃষ্টি ওদিকে থাকায় একটু সুবিধে পাবে ওরা।
এখান থেকে ঠিক উল্টো দিকে এগোল গ্রে। আপাতত কয়েক ঘন্টার জন্য নিরাপদ। ঘড়ি দেখল ও এয়ারপোর্টে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় আছে। মনক-ও খুব শীঘ্রিই পৌঁছে যাবে।
খুঁড়িয়ে এগোতে এগোতে পেছনে ফিরে তাকাল ফিওনা। ওদের পেছনে ডাকলিং ডেকে চলেছে।
… কোয়াক, কোয়াক, কোয়াক… কোয়াক, কোয়াক, কোয়াক…
আমি ওকে মিস করব। ফিওনা বলল।
আমিও।
.
ভোর ৪ টা ৩৫ মিনিট।
হিমালয়।
ফায়ারপ্লেসের পাশে দাঁড়িয়ে আছে পেইন্টার। নিজের মৃত্যুদণ্ডের সংবাদ শুনে চেয়ার থেকে উঠে পড়েছে।
ওকে উঠতে দেখে বিশালদেহি এক গার্ড তিন পা এগিয়ে এসেছিল। কিন্তু অ্যানা এক হাত তুলে তাকে থামিয়ে দেন। Nein, Klaus. Alles 1st ganz recht.
কালাউস নামের গার্ডটি তার নিজের পজিশনে ফিরে যাওয়ার আগপর্যন্ত পেইন্টার অপেক্ষা করল।
তাহলে এই রোগের কোনো চিকিৎসা নেই?
মাথা নাড়লেন অ্যানা। যেটা সত্য সেটাই বলেছি।
তাহলে সন্ন্যাসীরা যেরকম পাগলামো করছিল পেইন্টার ওরকম করছে না কেন? লিসা প্রশ্ন করল।
পেইন্টারের দিকে তাকালেন না। আপনি মঠ থেকে দূরে ছিলেন, তাই তো? গ্রামে থাকার ফলে তুলনামূলক কম আক্রান্ত হয়েছেন। দ্রুত স্নায়বিক অধঃপতনের বদলে আপনার শরীর ধীরে ধীরে খারাপের দিকে এগোচ্ছে। তবে এটারও শেষ পরিণতি হলো-মৃত্যু।
অ্যানা নিশ্চয়ই পেইন্টারের চেহারা দেখে কিছু একটা বুঝতে পেরেছিলেন।
চিকিৎসা না থাকলেও অবস্থার অবনতির গতিকে ধীর করার আশা আছে। কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন প্রাণীর ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে আমরা কিছু মডেল উদ্ভাবন করেছি যেগুলো বেশ আশাব্যঞ্জক। আমরা আপনার জীবন দীর্ঘায়িত করতে পারি। মানে পারতাম আরকী।
মানে কী? লিসা প্রশ্ন করল।
উঠে দাঁড়ালেন অ্যানা। এজন্যই আপনাদেরকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। দেখাব আপনাদের। কালাউসের দিকে মাথা নাড়লেন তিনি, সে দরজা খুলে দিল। আমার সাথে আসুন। হয়তো আমরা একে অপরকে সাহায্য করার রাস্তা পেয়ে যাব।
অ্যানা সামনে পা বাড়ানোর পর লিসার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল পেইন্টার। কৌতূহলে মরে যাচ্ছে ও। একই সাথে ফাঁদ এবং আশার আলো দেখতে পাচ্ছে।
টোপটা কী?
লিসা উঠে দাঁড়িয়ে পেইন্টারের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে জিজ্ঞাস করল, কী হচ্ছে এসব?
আমি ঠিক জানি না। কালাউসের সাথে কথাবলায়রত অ্যানার দিকে তাকাল ও।
হয়তো আমরা একে অপরকে সাহায্য করার রাস্তা পেয়ে যাব।
পেইন্টার নিজেও অ্যানাকে এইরকম কিছু বলে প্রস্তাব দেবে বলে ভাবছিল। এমনকি ব্যাপারটি নিয়ে কথাও বলেছিল লিসার সাথে। নিজের জীবন নিয়ে কীভাবে দর কষাকষি করা যায়, কিছু সময় পাওয়া যায়… এসব। ওদের কথাগুলো কী কেউ আড়িপেতে শুনে ফেলেছে? নাকি রুমে ছাড়পোকা (গোপনে কথা পাচার করার ইলেকট্রনিক ডিভাইস) ছিল? নাকি এখানকার ঘটনা আসলেই খুব খারাপ, ওদের সাহায্য সত্যি সত্যিই প্রয়োজন আছে?
দুশ্চিন্তায় পড়ল ক্রো।
আমরা যে বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনেছি, ওটা নিয়েই কিছু একটা হবে হয়তো, লিসা বলল।
মাথা নাড়ল ক্রো। ওর আরও তথ্য প্রয়োজন। কিন্তু আপাতত ওর শারীরিক অবস্থার বিষয়টি প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার ব্যথা শুরু হয়েছে চোখের পেছনে। ওর মাঢ়ির পেছনের অংশেও ব্যথা পৌঁছে গিয়ে জানিয়ে দিল ক্রো আসলেই অসুস্থ।
ওদের দিকে তাকিয়ে চোখ বুলালেন অ্যানা। পিছু হটল কালাউস। তার মুখ গোমড়া হয়ে আছে। অবশ্য পেইন্টার এখনও এই ব্যক্তিকে খুশি হতে দেখেনি। দেখতে চায়ও না। কারণ এই লোকের খুশির সাথে আর্তনাদ আর রক্তারক্তির সম্পর্ক আছে।
আসুন আমার সাথে, ঠাণ্ডা ভদ্রস্বরে বললেন অ্যানা। দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন, তার সাথে সাথে দুজন গার্ডও এগোল। কালাউস রইল পেইন্টার আর লিসার পেছনে। ওর সাথেও দুজন গার্ড আছে।
প্রিজন সেল থেকে ভিন্ন দিকে এগোল ওরা। কয়েক বাঁক পার হওয়ার পর সোজা টানেল উদয় হলো। পাহাড়ের ভেতরে থাকা বিভিন্ন টানেলের চেয়ে এই টানেল বেশি চওড়া। একসারি ইলেক্ট্রিক বা দিয়ে টানেলের ভেতরে আলোর ব্যবস্থা করা আছে। তারের খাঁচা চলে গেছে দেয়ালের গা বেয়ে। এগুলোর মাধ্যমে এখানে এই প্রথম আধুনিকতার নিদর্শন মিলল।
