এক মুহূর্তের জন্য গ্রের দিকে চোখ পড়ল নারী গার্ডের।
কিন্তু স্রেফ চোখ বুলিয়ে দৃষ্টি সরে গেল।
ফিরল আবার।
চিনতে পেরেছে।
জনতার স্রোতের উল্টো দিকে রওনা হলো যে! একদম উজান পাড়ি দিচ্ছে।
কী? ফিওনা প্রশ্ন করল।
ফিরে চল। অন্যকোনো রাস্তা দেখতে হবে।
কীভাবে?
জনতার ভিড় ঠেলে একটু পাশে সরল গ্রে। সোজাভাবে এরকম উজান পাড়ি দেয়া অনেক কঠিন। একটু পরে পরিবেশ একটু হালকা হলো। বড় স্রোত চলে গেছে, অল্পকিছু লোক আছে এখন।
তবে ওদের লুকোনোর জায়গা দরকার।
যে দেখল ওরা জনশূন্য প্যারেড গ্রাউন্ডে চলে এসেছে। কোনো কুচকাওয়াজের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না এখানে। মিউজিকও নেই, তবে আলো জ্বলছে। কুচকাওয়াজে অংশ নেয়া বিভিন্ন রথ পড়ে আছে মাটিতে। রথ ফেলে চালকেরা জান নিয়ে পালিয়েছে যে যার মতো। এমনকী এখানকার সিকিউরিটি গার্ডরাও গেইটের দিকে চলে গেছে।
রথের ভেতরে থাকা একটি ক্যাবের দরজা খোলা দেখে ওদিকে এগোল গ্রে।
চলো।
ফিওনাকে প্রায় টেনে নিয়ে ক্যাবের কাছে গেল ও। ক্যাবের উপরে খেলনা হাঁসের একটি বিশালাকৃতির মাথা শোভা যাচ্ছে। যে চিনতে পারল। হ্যানস ক্রিস্টিয়ান অ্যান্ডেরসেন-এর রূপকথার গল্প দ্য আগলি ডাকলিং অবলম্বনে এটা তৈরি করা হয়েছে।
হাসের খোলা পাখনার নিচ দিয়ে এগোল গ্রে। পাখনায় আলো জ্বলছে। খেলনা হলেও এই পাখনা ডানার মতো ঝাপটাতে পারে। যে ফিওনাকে ক্যাবে উঠতে সাহায্য করল। মনে মনে ভাবছে, এই বুঝি পেছন থেকে গুলি লাগল। ফিওনার পর নিজেও ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। দরজা বন্ধ করার সময় যতটুকু সম্ভব শব্দ না করার চেষ্টা করল ও।
উইনশিন্ড (যানবাহনের সামনের কাঁচ) দিয়ে সামনে তাকাতেই বুঝল ওর সতর্কতা। মাঠে মারা যায়নি।
জনতার ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে আসছে একজন। গ্রিট্টির খুনি। কাছে থাকা শটগান লুকোনোর কোনো চেষ্টাই করছে না সে। সবাই পার্কের সামনের দিকে ব্যস্ত। লেক আর প্যারেড সার্কিটের দিকে কারও নজর নেই।
ফিওনাকে সাথে নিয়ে মাথা নিচু করল গ্রে।
কয়েক ফুট দূর দিয়ে গেল লোকটা। পড়ে থাকা রথগুলোর পাশ দিয়ে এগোচ্ছে।
আর একটু হলেই হয়েছিল, ফিওনা ফিসফিস করল। আমাদের উচিত…
শশশ। গ্রে ফিওনার ঠোঁটের ওপর আঙুল চেপে ধরল। এই কাজ করতে গিয়ে একটি লিভারে ছুঁয়ে গেল ওর কনুই। ড্যাশবোর্ডে কীসের যেন ক্লিক শব্দ হলো।
এই সেরেছে!
ক্যাবের ওপরে থাকা ঢাউস মাথার ভেতরে স্পিকার বসানো আছে।
… কোয়াক, কোয়াক, কোয়াক… কোয়াক, কোয়াক, কোয়াক…
জেগে উঠেছে আগলি ডাকলিং।
সবাই জেনে গেল ব্যাপারটা।
সোজা হলে গ্রে। ৯০ ফুট দূরে শটগানধারী পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়াল।
লুকোচুরি শেষ।
হঠাৎ ক্যাবের ইঞ্জিন গর্জে উঠল। গ্রে তাকিয়ে দেখে, ফিওনা ক্লাচ নাড়াচাড়া করছে।
চাবি দেয়াই ছিল, গিয়ার বদলাতে বদলাতে বলল ফিওনা। লাইন ছেড়ে রথ সামনে এগোল।
ফিওনা, আমাকে দাও…
শেষবার তুমি চালিয়েছিলে। দেখো, কোথায় এনে ফেলেছ আমাদের। শটগানধারী লোকটির দিকে ক্যাব তাক করল ও। তাছাড়া, এই হারামজাদার সাথে আমার বোঝাপড়া আছে।
আচ্ছা, তাহলে সে-ও আততায়ীকে চিনতে পেরেছে। এই লোক ওর নানুকে খুন করেছিল। ২ নম্বর গিয়ার দিল ও, ওদিকে শটগানধারী অস্ত্র উঁচিয়েছে। কোনো পরোয়া না করে আগলি ডাকলিং-কে তার দিকে নিয়ে চলল ও।
কিছু একটা করতে চাইল গ্রে, ক্যাবের ভেতরে হাতড়াল।
এত এত লিভার…
গুলি করল শটগানধারী।
নিজেকে গুটিয়ে নিল গ্রে, তবে ফিওনা ইতোমধ্যে ক্যাবের হুইল ঘুরিয়ে নিয়েছে। উইনশীল্ডের এক কোণায় মাকড়সার জালের মতো জখম তৈরি হলো। হুইল আবার ঘুরাচ্ছে ফিওনা, আততায়ীকে পিষে ফেলতে চায়।
হঠাৎ করে দিক পরিবর্তন করে হুইল ঘোরানোয় ক্যাব দুই চাকার ওপর উঠে এলো।
ধরে থাকো! চিৎকার করল ফিওনা।
চার চাকায় অবতরণ করল ক্যাব। কিন্তু এই সুযোগে আততায়ী বাড়তি কিছু সময় পেয়ে গেল। বাম দিকে সরে গেল সে। লোকটার হাত খুব চালু। আবার গুলি ছোঁড়ার জন্য ইতোমধ্যে শটগান রেডি করতে শুরু করেছে। এবার তার মতলব, ক্যাব যখন ওর পাশ দিয়ে যাবে তখন জানালায় একদম পয়েন্ট ব্ল্যাক রেঞ্জ (একেবারে কাছ থেকে, প্রায় কোনো দূরত্ব ছাড়া) থেকে গুলি করবে ও।
ফিওনা এবার আর কোনো দিক পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ পেল না।
সারি সারি লিভারগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে একদম বাম পাশের লিভারে হাত দিল গ্রে। অনেকটা আন্দাজেই করল কাজটা। লিভার নিচে নামাল। একটু আগে ডাকলিঙের বাম পাখনা উপরে তোলা ছিল ওটা এখন ঝাপটা মেরে নিচে নেমে এসেছে। আততায়ীর গলায় গিয়ে আঘাত করল ওটা। লোকটির কশেরুকায় আঘাত করে একদম উড়িয়ে নিয়ে একপাশে ফেলে দিলো।
গেইটের দিকে চলল! তাগাদা দিল গ্রে।
দ্য আগলি ডাকলিং প্রথমবারের মতো রক্তের স্বাদ পেয়েছে।
… কোয়াক, কোয়াক, কোয়াক… কোয়াক, কোয়াক, কোয়াক…
সাইরেনের মতো ডাকাডাকি করে রাস্তা পরিষ্কার করল ডাকলিং। সামনে থাকা লোকজন ভড়কে গিয়ে জায়গা করে দিতে বাধ্য হলো। জনতার ঢলের তোপে রীতিমতো নাকানি-চুবানি খেলো গার্ডরা। ছদ্মবেশি দুই গার্ডও বাদ গেল না। লোকজনের ধাক্কায় একটু আগে মেইন গেইটের পাল্লা বড় করে খুলে দেয়া হয়েছে। জনতা ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে ওটা দিয়ে।
