প্ল্যান দরকার… নতুন প্ল্যান। এই লোকগুলো মাঝরাতে পার্ক থেকে বেরোবে। কিন্তু ওদের তো অতক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করা যাবে না। মাঝরাতের আগেই ওরা শত্রুপক্ষের হাতে ধরা পড়ে যাবে। এখুনি কেটে পড়তে হবে ওদের।
কিন্তু পার্কের বের হওয়ার পথ থেকে এই কুচকাওয়াজের মাঠে অবস্থা একদম জনশূন্য মরুভূমির মতো। কারণ সব অতিথিরা লেকের চারপাশে ভিড় করেছে। তাই এদিকটা ফাঁকা। যদি ওরা দুজন এ-পথ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে তাহলে ফাঁকা অংশে নির্ঘাত চোখে পড়ে যাবে। আর পার্কের গেইটও নিশ্চয়ই শত্রুপক্ষের নজরদারিতে আছে।
নিজের জখমস্থানকে এক হাত দিয়ে চেপে ধরে রেখেছে ফিওনা। রক্ত চুঁইয়ে বেরোচ্ছে ওর আঙুলের ফাঁক দিয়ে। গ্রের চোখে চোখ পড়ল ওর, আতঙ্কিত।
ফিসফিস করে বলল, আমরা কী করতে যাচ্ছি?
ওকে সাথে নিয়ে গ্রে লোকজনের ভেতরে এগোচ্ছে। একটা উপায় পেয়েছে ও, যদিও সেটা বুঝুঁকিপূর্ণ তবে সাবধানতা অবলম্বন করার কারণে ওরা পার্ক থেকে বেরোতে পারবে না। ফিওনাকে নিজের সামনে নিল গ্রে।
আমার হাতে রক্ত মাখাতে হবে।
কী?
গ্রে ফিওনার শার্টের দিকে ইঙ্গিত করল।
ভ্রু কুঁচকে ব্লাউজের কিনারা উঁচু করল ফিওনা। সাবধানে…
জখম থেকে নেমে আসা রক্তধারাটুকু গ্রে সাবধানে মুছে নিল। ব্যথায় কুঁচকে উঠে ছোট্ট করে শ্বাস ফেলল ফিওনা।
দুঃখিত, গ্রে বলল।
তোমার আঙুল তো অনেক ঠাণ্ডা, বিড়বিড় করল ফিওনা।
তুমি ঠিক আছে তো?
আমি বাঁচব।
হা, ওটাই তো লক্ষ্য।
একটু পরেই তোমাকে তুলে নেব… বলে গ্রে উঠে দাঁড়াল।
তুমি কোথায়… কী…?
আমি যখনই বলব সাথে সাথে চিৎকার দেবে। রেডি থাকো।
কিছুই বুঝতে না পেরে নাক কুঁচকাল ফিওনা। তবে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করল গ্রে। দূরে বাঁশি আর ড্রামের আওয়াজ শুরু হলো। ফিওনাকে পাশ কাটিয়ে মেইন গেইটের দিকে এগোল ও। স্কুল ছাত্রদের মাথার ওপর দিয়ে গ্ৰে দেখল, একজন লোকের পরনে ট্রেঞ্চ কোট, তার এক হাত ঝোলানো অবস্থায় আছে। গ্রিট্টির খুনি।
ছোটবাচ্চাদের ভেতর দিয়ে অনেক কষ্টে এগোচ্ছে সে, চোখ বুলাচ্ছে চারিদিকে।
বাঁশি আর ড্রামের তালে তালে প্রাচীন গান গেয়ে ওঠা একদল জার্মানদের ভেতরে ভিড়ে ফিওনার কাছে ফিরে এলো গ্রে। গান শেষ হওয়ার পর আতসবাজির বিস্ফোরণের শব্দও বন্ধ হলো।
এবার… বলল গ্রে, নিচু হয়ে ঝুঁকেছে। সারামুখে রক্তের প্রলেপ মেখে ফিওনাকে নিজের দুহাতে তুলে নিল। ডেনিশ ভাষায় চিৎকার করে বলল, বোম!
আতসবাজি বিস্ফোরণের শব্দ এখনও বাতাসে পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি, তাই ওর চিৎকার সেভাবে কাজে এলো না।
চিৎকার করো, ফিসফিস করে ফিওনাকে বলল ও।
রক্তের প্রলেপ দেয়া নিজের মুখখানা উপরে মেলে ধরল গ্রে। ফিওনা ওর হাতের উপরে থেকে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল।
বোম! আবার গলা ফাটাল গ্রে।
অনেক মুখ ঘুরল ওর দিকে। আকাশে আবার আতসবাজি তার যাত্রা শুরু করেছে। তাজা রক্তে গ্রের গাল চিকচিক করছে। প্রথমে কেউ-ই নড়ল না। কিন্তু তারপর জলোচ্ছ্বাসের মতো সবাই মেইন গেইটের দিকে যাত্রা শুরু করল। একজন আরেকজনকে ধাক্কা মারছে, ঠেলা দিচ্ছে। ভয় পেয়ে অনেকেই চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করায় লোকের চল আরও বেড়ে গেল।
যারা পালিয়ে যাচ্ছে তাদের ঠিক পেছনেই আছে গ্রে। ওর আশেপাশে যারা আছে এরা সবাই খুবই আতঙ্কিত।
তীক্ষ্ণস্বরে চিৎকার করছে ফিওনা। এক হাত নাড়াল, আঙুলে রক্ত চোয়াচ্ছে।
দাবানলের মতো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। লন্ডনে আর স্পেনে আক্রমণ হয়ে যাওয়ায় গ্রের চিৎকার বেশ কাজে লাগল। অনেকেই বোম বলে চিৎকার করছে। একজন আরেকজনের কাছ থেকে শুনে নিজেও চেঁচাচ্ছে।
তাড়া খাওয়া পশুপালের মতো একে অন্যকে ঠেলা-ধাক্কা মেরে এগোচ্ছে সবাই। ওরা এই আবদ্ধস্থান থেকে বেরিয়ে যেতে মরিয়া। আকাশে ওঠা আতসবাজির দম ফুরিয়েছে। এখানকার আতঙ্ক এবার প্যারেড গ্রাউন্ডেও গিয়ে পৌঁছুল। একজন দৌড় দিলে তার দেখাদেখি আর দুইজন দৌড়ায়। এভাবে বেড়েই চলেছে। কত পায়ের থপথপানি চলছে পার্কের পথের ওপর দিয়ে। বাহির-এর দিকে ছুটছে সবাই।
একটি কৌশল রীতিমতো জনতার ঢলে পরিণত হলো।
বের হওয়ার জন্য ছুটছে সবাই।
এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এগোল গ্রে। ফিওনা আছে ওর হাতে। গ্রে প্রার্থনা করল কেউ যেন কারও পায়ের নিচে চাপা না পড়ে। তবে এই ঢলে শুধু নিখাদ আতঙ্ক নয়, আতসবাজির শব্দ মিলিয়ে যেতেই সেটা ভয়ঙ্কর বিষয়ে পরিণত হলো। লোকজনের ঢল ছুটে চলেছে মেইন গেইটের দিকে।
ফিওনাকে নিজের হাত থেকে নামিয়ে দিল গ্রে। আরমানি জ্যাকেটের হাতায় নিজের রক্তমাখা চেহারা মুছল। গ্রের বেল্টে এক হাত দিয়ে নিজের ভারসাম্য বজায় রেখে দাঁড়াল ফিওনা।
সামনে গেইট উদয় হলো।
মাথা নেড়ে এগোল গ্রে। যদি কোনো কিছু হয়ে যায়… দৌড়াবে। থামবে না, যেতেই থাকবে।
আমি জানি না, পারব কিনা। এপাশটা খুব হারামির মতো ব্যথা করছে।
খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে ফিওনা। একটু ভর দিয়েছে গ্রের ওপর।
সামনে, জনতার ঢল সামলাতে ব্যস্ত সিকিউরিটি গার্ডরা। কেউ যেন কারও গায়ের ওপর গিয়ে না পড়ে সেদিকে নজর রাখছে তারা। ওদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে গ্রে খেয়াল করল দুজন গার্ড একটু তফাতে দাঁড়িয়ে আছে। জনতা সামলাচ্ছে না ওরা, সন্দেহজনক। একজন পুরুষ, আরেকজন নারী। দুজনের চামড়া সাদা। নিলাম ভবনে এরাই জিতেছিল। এখন গার্ডের ছদ্মবেশ ধরে গেইটে দাঁড়িয়ে আছে। পিস্তল শোভা পাচ্ছে দুজনের হাতেই।
