আমরা নাৎসি না। আমরা আর নাৎসি নেই।
কিছু একটা ঠিক করে রাখা হয়েছে, ক্রো টের পেল ঠিকই কিন্তু ওটা যে ওদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারল না। এরকম অন্ধকারে থাকা ওর মোটেও পছন্দ নয় তবে সেটা সামনাসামনি প্রকাশ করল না।
আচ্ছা, হিমল্যার এখানে কী খুঁজছিলেন? প্রশ্ন করল ক্রো। আর্যদের কোনো হারানো গোত্র? শুভ্র-সাদা সাংরি-লা?
না ঠিক তা নয়। নৃ-তাত্ত্বিক ও প্রাণিবিজ্ঞান সম্পর্কিত গবেষণার মোড়কে তিনি এখানে তার এসএস সদস্যদের পাঠিয়ে ছিলেন। অনেক বছর আগে হারিয়ে যাওয়া আর্যদের শেকড়ের সন্ধান করছিলেন তিনি। প্রমাণ খুঁজছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল তিনি এখান থেকে সূত্র পাবেনই। কিন্তু কিছু না পেয়ে আরও বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েছিলেন। বেপরোয়া পাগলামো যাকে বলে! জার্মানি এসএস-এর জন্য উইউইলসবার্গ নামের একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ নির্মাণের সময় ঠিক ওটার মতো দেখতে আরেকটি দুর্গ এখানেও নির্মাণ করতে শুরু করেন। জার্মান থাকা হাজার খানেক যুদ্ধবন্দীকে এই হিমালয়ে উড়িয়ে নিয়ে এসে শ্রমিকের কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। এক মেট্রিক টন সোনার বার এনেছিলেন জাহাজে করে। নিজেদের জন্য যথেষ্ট রসদ জুগিয়েছিলেন তিনি। বেশ ভাল বিনিয়োগ ছিল ওটা।
কিন্তু এখানে কেন নির্মাণ করতে গেলেন? লিসা জানতে চাইল।
কিছুটা আন্দাজ করতে পারছিল পেইন্টার। তার বিশ্বাস ছিল এই পর্বতমালা থেকে আর্যদের আবার পুনরুত্থান ঘটবে। সেই আর্যদের কথা ভেবেই এই দুর্গ তৈরি করছিলেন।
মাথা নেড়ে সায় দিলেন অ্যানা। গোপন গুরুদেরকেও বিশ্বাস করতেন তিনি, গুরুগণ তাকে জানিয়েছিল, ম্যাডাম বালাভাস্কি এখনও বেঁচে আছে। তাদের সবার জন্য দুর্ভেদ্য দুর্গ নির্মাণ করছিলেন। যাবতীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্রীভূত করার ইচ্ছে ছিল তার।
গোপন শুরু কী কখনও দেখা দিয়েছিলেন? ক্রো মজা করে জানতে চাইল।
না। তবে আমার দাদা যুদ্ধের শেষে একটা জিনিস করে দেখিয়েছিলেন। এমন এক অলৌলিক কাজ করেছিলেন যেটা হিমল্যারের স্বপ্নকে বাস্তবে আনতে সক্ষম ছিল।
কী সেটা? পেইন্টারের প্রশ্ন।
মাথা নাড়লেন না। ওদিকে কথা বলার আগে আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই। আশা করি আপনি মিথ্যা বলবেন না।
হঠাৎ করে কথার মোড় ঘুরতে দেখে ক্রো ভ্রু কুঁচকাল। আমি কোনো কথা দিতে পারব না, সেটা আপনি ভাল করেই জানেন।
প্রথমবারের মতো অ্যানার মুখে হাসি দেখা গেল। যাক, মিস্টার ক্রো, আপনি এতটুকু তো সত্য বলেছেন?
আপনার প্রশ্নটা শুনি। বেশ আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল ক্রো। আসল ঘটনা হয়তো এবার বোঝা যাবে।
ওর দিকে তাকালেন অ্যানা। আপনি কী অসুস্থ? আমি অনেক কিছুই শুনতে পেরেছি। তবে আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনার মাথা বেশ পরিষ্কার।
ক্রোর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। এরকম প্রশ্ন সে আশা করেনি।
পেইন্টার কিছু বলার আগেই লিসা জবাব দিল, হ্যাঁ। ও অসুস্থ।
লিসা…ক্রো বাধা দিতে চাইল।
তিনি এটা কোনো না কোনোভাবে ঠিকই বুঝতে পারতেন। তোমার অসুখ হয়েছে। এটা বোঝার জন্য কোনো মেডিক্যাল ডিগ্রি নেয়ার প্রয়োজন নেই।
অ্যানার দিকে ফিরল লিসা। চোখের সমস্যাসহ কয়েকটি জিনিসে ভুগছে ও।
প্রচণ্ড মাথাব্যথার সাথে চোখের সামনে আলোর দপদপানি আছে?
লিসা মাথা নেড়ে সায় দিল।
আমিও এরকমটাই ভেবেছিলাম। পেছনে হেলান দিলেন অ্যানা। তথ্যগুলো তাকে নিশ্চিত করল।
ভ্রু কুঁচকাল পেইন্টার। কেন?
লিসা কথা বের করতে চাইল। কী হয়েছে ওর? আমার মনে হয়, আমরা… মানে ওর সেটা জানার অধিকার আছে।
ওটা জানতে হলে আরও আলোচনা করতে হবে। তবে আমি আপনাকে তার সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে জানাতে পারি।
কী সেটা?
আগামী তিন দিনের মধ্যে সে মারা যাবে। মৃত্যুটা হবে খুব ভয়াবহ।
কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখানোর জন্য নিজের সাথে রীতিমতো যুদ্ধ করল ক্রো।
লিসাও বেশ স্বাভাবিক রইল, নিরপেক্ষ কণ্ঠে বলল, এর কোনো চিকিৎসা আছে?
না।
.
রাত ১১ টা ১৮ মিনিট।
কোপেনহ্যাগেন, ডেনমার্ক।
ফিওনাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। জখমের স্থান থেকে রক্ত গড়িয়ে বেচারির শার্ট ভিজে যাচ্ছে, টের পেল গ্রে। ওর নিচে হাত দিয়ে সাহায্য করল।
ওদের দুজনের চারদিকে অনেক লোকজন। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ দেখতে দেখতে গ্রে বিরক্ত হয়ে গেল। মিউজিক ও গান বন্ধ হয়ে গেল ওদের পাশ দিয়ে কুচকাওয়াজ চলে যেতেই। সচল বিশালাকৃতির পুতুলগুলো লোকজনের মাথার ওপর দিয়ে ইচ্ছেমতো নড়াচড়া করছে, মাথা নাড়ছে।
লেকের উপরের আকাশে আতসবাজি ফুটছে এখনও। গ্রে এসব কিছু এড়িয়ে গেল। ফিওনাকে যে গুলি করেছে তাকে খুঁজছে ও।
গ্রে ফিওনার জখমস্থান চট করে দেখে নিল। স্রেফ ছড়ে গেছে, চামড়া পুড়েছে একটু, রক্ত বেরোচ্ছে, গুলিবিদ্ধ না হলেও ওকে ডাক্তার দেখানো দরকার। ব্যথায় বেচারির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
গুলি ছোঁড়া হয়েছে পেছন থেকে। অর্থাৎ স্নাইপার গাছ আর ঝোঁপঝাড়ের ভেতরে পজিশন নিয়েছিল। কপাল ভাল ওরা দুজন লোকজনের ভেতরে পৌঁছুতে পেরেছে। যেহেতু ওদেরকে এখানে দেখে ফেলে… শত্রুপক্ষ হয়তো এতক্ষণে কাছাকাছি চলেও এসেছে। এই লোকজনের ভেতরেই কোথায় ঘাপটি মেরে আছে তারা।
গ্রে ঘড়ি দেখল। পার্ক বন্ধ হতে আর ৪৫ মিনিট বাকি।
