রুমের এক পাশে বড় ফায়ারপ্লেস আছে, উষ্ণতার উৎস ওটা। ওখানে ছোটখাটো দাবানল জ্বলছে। জার্মান ইউনিফর্ম পরা এক ব্যক্তির ওয়েল পেইন্টিং তাকিয়ে আছে ওদের দিকে।
আমার দাদু, বললেন অ্যানা পোরেনবার্গ। পেইন্টারকে সেভাবে উদ্দেশ্য করে বলেননি। একটি বিরাট ডেস্কের পেছন থেকে উঠে এলেন তিনি। তার পরনেও কালো জিন্স আর সোয়েটার। এটাই এই ক্যাসলের ড্রেস-কোড। যুদ্ধের পর তিনি এই ক্যাসল অধিকার করে নিয়েছিলেন।
ফায়ারপ্লেসের সামনে গোল করে বসানো চেয়ারে বসতে ইশারা করলেন তিনি। পেইন্টার তার চোখ খেয়াল করে দেখল ওখানে কালি জমেছে। মনে হচ্ছে তিনি একটুও ঘুমাননি। তার শরীর থেকে একধরনের সুগন্ধি বেরোচ্ছে।
ইন্টারেস্টিং।
তিনি ভারী চেয়ারের দিকে এগোতেই পেইন্টারের সাথে তাঁর চোখাচোখি হলো। ঘাড়ের পেছনে থাকা ছোট ছোট চুলগুলো দাঁড়িয়ে গেল ক্রোর। চোখের নিচে কালি জমলেও অ্যানার চোখ দুটো বেশ উজ্জ্বল ও তীক্ষ্ণ। পেইন্টার তার চোখে ধূর্ত, দানবীয় ও হিসেবি দীপ্তি দেখতে পেল। ওকে খুব কাছ থেকে দেখে তিনি কী যেন হিসেব করছেন।
হচ্ছেটা কী?
setzen Sie, bitte মাথা নেড়ে চেয়ারগুলো দেখালেন তিনি। বসতে বলছেন।
পাশে থাকা দুটো চেয়ারে বসল লিসা ও ক্রো। অ্যানা ওদের বিপরীতে বসলেন। গার্ডটি দরজা বন্ধ করে দিয়ে ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে। হাত দুটো আড়াআড়িভাবে রাখা। পেইন্টার জানে বাকি গার্ডগুলো দাঁড়িয়ে আছে দরজার বাইরে। এই রুম থেকে পালানোর পথ খুঁজল গ্রে। পুরু কাঁচের এক জানালা ছাড়া এখান থেকে পালানোর আর কোনো উপায় নেই। ঠাণ্ডার কারণে কাঁচ ঘোলা হয়ে রয়েছে, এছাড়াও পুরো জানালায় লোহার দণ্ড দিয়ে গ্রিল দেয়া।
এদিক দিয়ে পালানো চলবে না।
অ্যানার দিকে মনোযোগ দিল ক্রো। হয়তো অন্য কোনো উপায় আছে। অ্যানার ভাবভঙ্গি একটু বিপজ্জনক হলেও ওদেরকে তো একটি কারণে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। ক্রো এখান থেকে যত সম্ভব তথ্য জেনে নিতে চায়। তবে ওকে খুব চতুরভাবে পা ফেলতে হবে। অ্যানার পরিবারের এক ব্যক্তিকে তো ও ওয়েল পেইন্টিং থেকে দেখে নিয়েছে। এটা দিয়েই শুরু করা যাক।
আপনি বললেন, আপনার দাদু এই ক্যাসল অধিকার করে নিয়েছিলেন, বলল পেইন্টার। মনে মনে জবাব আশা করছে। পা ফেলছে নিরাপদে। এই ক্যাসল তার আগে কার দখলে ছিল?
চেয়ারের পেছনে হেলান দিলেন অ্যানা। আগুনের সামনে বসে একটু রিল্যাক্স করা যেতে পারে। তবে তার দৃষ্টি এখনও তীক্ষ্ণ, হাত দুটো কোলের ওপর রাখা, লিসার ওপর দিয়ে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ক্রোর ওপর থামলেন। GranitschloB–এর এক লম্বা অন্ধকার ইতিহাস আছে, মিস্টার ক্রো। আচ্ছা, আপনি হেনরিক হিমল্যারের নাম শুনেছেন?
হিটলারের সেকেন্ড ইন কমান্ড?
হ্যাঁ। এসএস-এর প্রধান। সেইসাথে কসাই ও উন্মাদ।
এরকম শব্দে ভূষিত করায় পেইন্টার বিস্মিত হলো। এটা কী কোনো ছলনা? খেলা শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু কীভাবে পা ফেলে খেলতে হবে সেটা ও জানে… অন্তত এখনও পর্যন্ত জানতে পারেনি।
বলছেন অ্যানা, হিমল্যার নিজেকে রাজা হেইনরিচ-এর পুনর্জন্ম ব্যক্তি হিসেবে বিশ্বাস করতেন। দশম শতাব্দীতে স্যাক্সন অঞ্চলের রাজা ছিলেন হেইনরিচ। এমনকি তার ধারণা ছিল তিনি নাকি হেইনরিচের কাছ থেকে দৈববাণী পেতেন!
মাথা নাড়ল পেইন্টার। আমি শুনেছিলাম অতিপ্রাকৃত ব্যাপার-স্যাপারে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি।
একদম অন্ধ ছিলেন তিনি। পুরোপুরি বদ্ধমূল ধারণা ছিল তার। শ্রাগ করলেন অ্যানা। অনেক জার্মানির অনুরাগ ছিল এটার ওপর। ম্যাডাম বালাভাস্কি থেকে শুরু করি… আর্যজাতি নিয়ে তিনি সর্বপ্রথম হুজুগ তুলেছিলেন। দাবি করলেন, বুদ্ধ মঠে দীক্ষা লাভ করতে গিয়ে তিনি নাকি কোনো এক গোপনবিদ্যা অর্জন করেছেন। গোপন গুরু তাকে জানিয়েছেন কীভাবে মানবজাতি ধীরে ধীরে এত উন্নত হয়েছে এবং একদিন অবনতিও হবে।
প্রচলিত ধারণা, বলল পেইন্টার।
একদম। ঠিক তার ১০০ বছর পর, গুইডো ভন লিস্ট নামের একজন ম্যাডামের সেই বিশ্বাসের সাথে জার্মান মিথলজিকে মিশিয়ে একটু পরিমার্জন উত্তরদেশীয়দের পূর্বপুরুষ হিসেবে এই কাল্পনিক আর্যজাতিকে উপস্থাপন করেন।
তারপর জার্মানের লোজন সেই গল্পে একদম মজে গেল। একটি টোপ ফেলল ক্রো।
তা তো মজবেই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমাদের হারের পর এরকম একটা ধারণা খুব জনপ্রিয়তা পেয়ে গেল। পুরো ব্যাপারটা জার্মানির অতিপ্রাকৃত বিভিন্ন কেন্দ্রে গিয়ে ঠাই পেল। দ্য গুলি সোসাইটি, দ্য ড্রিল সোসাইটি, দ্য অর্ডার অফ দ্য নিউ টেম্পলারস… ইত্যাদি।
আর আমার যতদূর মনে পড়ে, হিমল্যার নিজে খুলি সোসাইটিতে যুক্ত ছিলেন।
হ্যাঁ, তিনি এই মিথলজি পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন। এমনকি স্ক্যান্ডেনেভিয়ানদের প্রাচীন অক্ষরগুলোর জাদুতেও তার বিশ্বাস ছিল। সেজন্য ডাবল sig প্রাচীন অক্ষর আর জোড়া বজ্রপাত ব্যবহার করে তিনি তাঁর নিজের যোদ্ধা যাজকদের পরিচয় তুলে ধরতেন, দ্য Schutzstafel, দ্য SS। ম্যাডাম বালাভাস্কির কাজ পর্যালোচনা করে তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন, এই হিমালয় থেকে আর্যজাতিদের যাত্রা শুরু হয়েছিল আর ঠিক এখান থেকেই তাদের পুনরুত্থান হবে।
প্রথমবারের মতো মুখ খুলল লিসা। তাই হিমল্যার হিমালয়ে অভিযান পাঠিয়ে ছিলেন। একটু পেইন্টারের দিকে তাকাল ও। এই বিষয়টি নিয়ে ওরা আগে কথা বলেছে। দেখা যাচ্ছে ওদের চিন্তা-ধারায়ও খুব বেশি ভুল ছিল না। তবে পেইন্টার এখনও অ্যানার সেই দুর্বোধ্য কথার মর্মার্থ খুঁজে বেড়াচ্ছে।
