বাগানের পথ পেরিয়ে সেন্ট্রাল প্লাজায় ঢুকল ওরা। বিভিন্ন লাইট আর হারিকেনের আলোতে এখানটা বেশ আলোকিত হয়ে আছে। প্লাজার ভেতরে কুচকাওয়াজের প্রথম দল ঢুকতেই একটু সমস্বরে হওয়া হই হই আওয়াজ ভেসে এলো। প্লাজা ৩ তলা। পাথরে একটি মৎস্যকন্যা আঁকা আছে। পান্না ও উজ্জ্বল নীল আলো দিয়ে অলংকার করা হয়েছে ওটার। একটি হাত স্বাগতম জানাচ্ছে। ওটার পেছন দিয়ে যাচ্ছে অন্যরা। মনোরম সুরে বাঁশি বাজছে, ড্রাম বাজছে।
দ্য হ্যানস ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসেন প্যারেড, বলল ফিওনা। এই লেখকের ২০০-তম জন্মবার্ষিকী পালন করা হচ্ছে এখানে। এই শহরের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তিনি।
সেন্ট্রাল লেকের পাশ দিকে এগোনোলোকদের দিকে এগোল গ্রে। লেকের পানিতে প্রতিফলন ফেলে একটি বড় আতসবাজি আকাশে বিস্ফোরিত হলো। রাতের আকাশ জুড়ে আতসবাজির বিভিন্ন উজ্জ্বল শিখা দাপাদাপি করে হুটোপুটি খেল।
কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণ করা লোকদের কাছাকাছি থাকলেও চারদিকে নজর বুলাচ্ছে গ্রে। কালো পোশাক পরিহিত ফ্যাকাসে চেহারা খুঁজছে ও। কিন্তু এই কোপেহ্যাগেনে প্রতি ৫ জনে ১ জনের চুল সাদা। আর ডেনমার্কে তো এখন কালো পোশাক পরা হালের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ড্রামের তালে তালে গ্রের বুকও লাফাচ্ছে। উত্তেজনায় তালা লেগে গেছে ওর কানে। অবশেষে ওরা লোকজনের কাছে পৌঁছুল।
ওদের মাথার ঠিক ওপরেই আতসবাজি ফুটলো। আগুনের শিখায় উজ্জ্বল হলো রাতের আকাশ, ফটফট করে শব্দ হলো।
হোঁচট খেল ফিওনা।
গ্রে ওকে ধরে ফেলল, ওর কানে ভোঁ ভোঁ আওয়াজ হচ্ছে।
আতসবাজির বিস্ফোরণ মিলিয়ে যেতে ওর দিকে তাকাল ফিওনা, চমকে গেছে। এক হাত বের করে গ্রেকে দেখাল ও।
ওর হাত রক্তে লাল হয়ে গেছে।
.
ভোর ৪টা ০২ মিনিট।
হিমালয়।
অন্ধকারে জেগে উঠল ক্রো। আগুন নিভে গেছে। কতক্ষণ ঘুমিয়েছে ও? জানালা নেই, সময়ও বুঝতে পারছে না। কিন্তু ওর মন বলছে বেশিক্ষণ হয়নি।
কিছু একটা ওকে জাগিয়ে দিয়েছে।
কনুইয়ে ভর দিয়ে উঠল ও।
বিছানার অপর পাশে লিসাও জেগে গেছে, দৃষ্টি দরজার দিকে। তুমি টের পেয়েছ…?
বেশ ভয়াবহভাবে রুম কেঁপে উঠল। দূর থেকে গুরুগম্ভীর ভারী শব্দ এসে পৌঁছুল ওদের কাছে।
কম্বল সরিয়ে ফেলল ক্রো। বিপদ।
জার্মানদের দেয়া কয়েকটি পরিষ্কার পোশাকের দিকে ইঙ্গিত করল ও। চটপট পরে নিল ওরা: লম্বা আন্ডারওয়্যার, ভারী জিন্স আর মোটা সোয়েটার।
রুমের অন্যপাশে মোমবাতিগুলো জ্বালাল লিসা। গাট্টাগাট্টো এক জোড়া লেদার বুট পায়ে দিল, যদিও এটা ছেলেদের জন্য। চুপচাপ অপেক্ষা করল ওরা… প্রায় ২০ মিনিট। আওয়াজ ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।
ওরা দুজন আবার বিছানায় গেল। তোমার কী মনে হয়, কী হলো? ফিসফিস করে বলল লিসা।
হাঁক-ডাকের আওয়াজ শোনা গেল।
জানি না… তবে আমরা বোধহয় জেনে যাব।
পুরু ওক কাঠের দরজার ওপাশ থেকে পাথুরে প্যাসেজ ধরে বুটের শব্দ ভেসে আসছে। উঠে দাঁড়াল ক্রো। কান সজাগ।
এদিকেই আসছে। বলল ও।
ওর কথা সত্য প্রমাণ করতে দরজায় কড়া আওয়াজ হলো। এক হাত উঁচু করে লিসাকে পেছনে থাকতে বলল ক্রো। নিজেও পেছালো এক কদম। দরজার বাইরে থাকা একটি ভারী লোহার দণ্ডের খসখসে আওয়াজ শোনা গেল।
খুলে গেল দরজা। চারজন অস্ত্রধারী রুমে ঢুকল, অস্ত্রগুলো ওদের দুজনের দিকে তাক করা। পাঁচ নম্বর ব্যক্তি ঢুকল এখন। এই ব্যক্তিকে দেখতে অনেকটা গানথারের মতোবিশাল দেহ, মোটা ঘাড়, হাল ধূসর রঙের চুলগুলো খাটো খাটো। পরনে বাদামি প্যান্ট, কালো বুট আর প্যান্টের সাথে ম্যাচ করা বাদামি শার্ট।
কালো অস্ত্র আর স্বস্তিকা ছাড়া তাকে দেখতে নাৎসি স্ট্রম ট্রুপারের মতো লাগছে।
কিংবা সাবেক নাৎসি স্ট্রম ট্রুপারও বলা যেতে পারে।
গানথারের মতো এর চেহারাও ফাঁকাসে, তবে একটু সমস্যা আছে। স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীর মতো তার চেহারা বাম পাশ একটু গেছে, দরজার দিকে সে তার বাম হাত তুলে দেখাতেই ওটা কেমন যেন কেঁপে উঠল।
Kommen mit mir! বলল সে।
ওদেরকে রুম থেকে বেরোনোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিশালদেহি লোকটি নির্দেশ দিয়ে ঘুরে চলে গেল। সে জানে, তার আদেশ অমান্য করার মতো পরিস্থিতি নেই। তার ওপর রাইফেলের ব্যবস্থা তো আছেই।
লিসার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল ক্রো। সবাই বেরোল রুম থেকে। হলওয়ে বেশ সরু, দুজন মানুষ একসাথে যাওয়া কঠিন। গার্ডদের অস্ত্রের সাথে থাকা ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় পথ দেখে এগোল ওরা। রুমের চেয়ে এই হলওয়েতে বেশি ঠাণ্ডা। তবে সেটা হিমশীতল নয়।
ওদেরকে বেশিদূর নেয়া হবে না। পেইন্টার ক্রো আন্দাজ করল ওদেরকে হয়তো ক্যাসলের সামনের অংশে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ওর ধারণাই সত্য। বাতাসের হিস হিস আওয়াজও শুনতে পেল ও। বাইরে নিশ্চয়ই ঝড় আবার হামলা করেছে।
সামনে থাকা গার্ড কাঠের দরজায় নক করল। চাপা শব্দে অনুমতি দেয়া হলো ভেতর থেকে। উষ্ণ আলোয় হল আলোকিত হলো, উষ্ণ হাওয়াও এলো সাথে।
গার্ড ভেতরে ঢুকে দরজা ধরে রইল।
লিসাকে নিয়ে এগোল পেইন্টার রুমে চোখ বুলাল। লাইব্রেরি আর স্টাডি রুম বলে মনে হচ্ছে। দোতলা, চার দেয়ালে খোলা বুকশেলফ। উপরের তলার পুরোটা লোহার বেলকুনি দিয়ে ঘেরা, বেশ ভারী, তবে সাজ-সজ্জা নেই। উপরে যেতে হলে মই ছাড়া গতি নেই।
