গ্রের কী করার আছে?
কাগজ, কলম তুলে নিয়ে বেচারির মনোযোগ এদিকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করল ও। আরেকটি চিহ্ন আঁকল ও। নিলামে অংশ নেয়া সেই পুরুষ লোকটির হাতে থাকা ট্যাটু।
ও দিকে এগিয়ে দিল গ্রে। এটা পরিচিত মনে হয়?
আগের চেয়েও নাটকীয় ভঙ্গিতে সামনে ঝুঁকল ফিওনা। মাথা নাড়ল। চার পাতা। না, জানি না। কী হতে পারে…. দাঁড়াও… নোটপ্যাড হাতে তুলে নিয়ে আরও কাছ থেকে দেখল। বড় বড় হয়ে গেল ওর চোখজোড়া। এর আগে আমি এটা দেখেছি!
কোথায়?
একটা বিজনেস কার্ডে, বলল ফিওনা। ওটা অবশ্য এরকম ভরাট করা ছিল না। স্রেফ আউটলাইন আঁকা ছিল। গ্রের হাত থেকে কলম নিয়ে আঁকতে শুরু করল ও।
কার বিজনেস কার্ড?
ওই যে দুই মাস আগে এক বজ্জাত এসে আমাদের বিভিন্ন রেকর্ড ঘাঁটাঘাঁটি করে গিয়েছিল তার কার্ডে দেখেছিলাম। ব্যাটা আমাদেরকে ভুয়া ক্রেডিট কার্ড দিয়েছিল। ফিওনা আঁকছে। তুমি এই জিনিস কোথায় দেখলে?
যে লোক বাইবেলের নিলামে জিতেছিল, তার হাতে দেখেছি।
গর্জে উঠল ফিওনা। আমি জানতাম! তাহলে এই সবকিছুর পেছনে এক হারামি কলকাঠি নেড়ে আসছে। প্রথমে চুরি করার চেষ্টা করেছিল। তারপর নিজের কৃতি আড়াল করার জন্য মাটিকে খুন করে দোকান পুড়িয়ে ছাই করে দিল।
বিজনেস কার্ডের নাম মনে আছে? প্রশ্ন করল গ্রে।
ফিওনা মাথা নাড়ল। শুধু চিহ্ন-ই মনে আছে। কারণ এটা আমার পরিচিত।
এতক্ষণ ধরে আঁকা ছবিটি গ্রের দিকে এগিয়ে দিল ও। ট্যাটুর চেয়ে আরও বিস্তারিত রেখার মাধ্যমে আঁকা হয়েছে এখানে। কোথায় কোথায় কীভাবে মোচড় খেয়েছে সেটা। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
৯ বি?
পৃষ্ঠায় টোকা দিল এ। তুমি এটা চিনতে পেরেছ? তোমার পরিচিত?
মাথা নাড়ল ফিওনা। আমি পিন সংগ্রহ করি। যদিও এই পোশাকের সাথে পরতে পারিনি।
হুডঅলা জ্যাকেটের কথা মনে পড়ল গ্রের। তখন মেয়েটিকে চোখে পড়েছিল। প্রতিটি বোতামে বিভিন্ন সাইজের এটা সেটা লাগানো ছিল তখন।
কেলটেক, বলল ফিওনা। আমি এই শুধু এই ব্যান্ডের গান-ই শুনি। আমার অধিকাংশ পিন কেলটেক ডিজাইনের।
আর এই চিহ্ন?
এটাকে আর্থ স্কয়ার কিংবা সেইন্ট হেন্স ক্রস বলা হয়ে থাকে। এটা একধরনের রক্ষাকবচ। পৃথিবীর চার কোণা থেকে শক্তি আনে, এই আরকী। ফিওনা চার পাতার বৃত্তগুলোতে টোকা দিল। সেজন্য এগুলোকে রক্ষাকারী বাঁধনও বলা হয়। ব্যক্তিকে রক্ষা করে।
গ্রে বেশ মন দিয়ে শুনলেও প্রয়োজনীয় কোনো ক্লু পেল না।
এজন্যই আমি মাঠিকে বলেছিলাম ওই বজ্জাতকে যেন বিশ্বাস করে, ফিওনা বলল। একটু পেছনে হেলল ও। একদম খাদে নামিয়ে ফেলল গলা। যেন কথা বলতে ভয় পাচ্ছে। নানু লোকটাকে প্রথমে পছন্দ করছিল না। কিন্তু আমি যখন তার কার্ডে ওই চিহ্ন দেখলাম, ভাবলাম লোকটা ভালই হবে।
তুমি তো আর জানতে না।
মাট্টি জানতো, চট করে বলল ফিওনা। আমার জন্যই ও মারা গেছে। ওর শব্দগুলোতে অপরাধবোধ আর যন্ত্রণা ফুটে উঠল।
বাজে কথা। ফিওনার কাছে গিয়ে এক হাত দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল গ্রে। এরা যে-ই হোক না কেন প্রথম থেকে কাছা দিয়েই মাঠে নেমেছিল। তুমিও তো জানোনা। তোমাদের দোকানে ঢুকে তথ্য বের করার কোনো না কোনো রাস্তা ওরা বের করে ফেলতই। রেকর্ড দেখানোর ব্যাপারটায় নানুকে যদি তুমি না রাজি করাতে তাহলে হয়তো তোমাদের দুজনকে ওরা তখুনি মেরে ফেলত।
ওর দিকে ঝুঁকল ফিওনা।
তোমার নানু…
ও আমার নানু ছিল না, ফিওনা ফাপা কণ্ঠে বাধা দিল।
এটা আগেই বুঝতে পেরেছিল গ্রে, তবে কিছু বলল না। ফিওনাকে বলতে দিল।
আমি ওঁর দোকান থেকে কিছু জিনিস চুরি করছিলাম তখন ওঁর হাতে ধরা পড়ি। কিন্তু নানু পুলিশকে খবর না দিয়ে উল্টো আমাকে স্যুপ খেতে দিল। চিকেন বার্লি।
কথাটা বলতে গিয়ে হেসে ফেলল ফিওনা। অন্ধকারে ওর দিকে না তাকিয়েও গ্রে সেটা বুঝতে পারল।
ও ওইরকম-ই। পথশিশুদের সাহায্য করত। আশ্রয় দিত।
বার্টেল।
সাথে আমাকেও। বলে অনেকক্ষণ চুপ মেরে রইল ও। একটি গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে আমার বাবা-মা মারা গিয়েছিল। পাকিস্তানি ছিল তারা। পাঞ্জাবি। লন্ডনের ওয়ালম ফরেস্টে আমাদের একটা ছোট বাড়ি ছিল, বাগান ছিল। আমরা একটা কুকুর পোষার কথা ভাবছিলাম। কিছু ওরা… ওরা মরে গেল।
আমি দুঃখিত, ফিওনা।
খালা-খালু আমার দায়িত্ব নিল… ওরা অল্পকিছু দিন হলো পাঞ্জাব থেকে এখানে শিফট হয়েছিল। আবার নীরবতা। এক মাস পর থেকে খালু আমার কাছে আসতে শুরু করল, রাতে।
চোখ বন্ধ করল গ্রে। হায় খোদা…
তাই আমি পালালাম… প্রায় দুই বছর লন্ডনের রাস্তাঘাটে জীবন কাটিয়েছি। তারপর খারাপ মানুষদের খপ্পরে পড়ে আবার পালালাম। ইংল্যান্ড ছেড়ে চলে এলাম ইউরোপে। তারপর তো এই যে, এখানে।
গ্রিট্টি তোমাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।
হ্যাঁ, সে-ও নেই। কণ্ঠে অপরাধবোধের শ্লেষ। আমি হয়তো পোড়া কপালি।
ফিওনাকে আরও কাছে টেনে নিল গ্রে। আমি দেখেছি তিনি তোমার খেয়াল কীভাবে রাখতেন। তুমি তার জীবনে খারাপ কিছু আনননি। তোমাকে তো তিনি ভালবাসতেন।
আ… আমি জানি। অন্যদিকে মুখ ঘোরাল ফিওনা। ফোঁপাতেই ওর কাঁধ কেঁপে উঠল।
ওকে ধরে রইল গ্রে। আস্তে করে ঘুরে গ্রের কাঁধে ফিওনা মাথা রাখল। এবার গ্রের অপরাধবোধে ভোগার পালা। গ্রিট্টি একজন দারুণ মহিলা ছিলেন। শিশুদের ভালবাসতে, মনে দয়া-মায়া ছিল। অথচ আজ তিনি বেঁচে নেই। এই ব্যাপারে গ্রে নিজেই শাস্তিযোগ্য। যদি ও আরও সতর্কতা অবলম্বন করত… এত বেপরোয়াভাবে তদন্ত না চালাতে…
