লিসা ওকে বিছানা পর্যন্ত নিয়ে কম্বল ঠিক করে দিল।
আমি সোফায় ঘুমিয়ে নেব। বাধা দিয়ে বলল ক্রো।
ঢং বাদ দাও। বিছানায় ওঠো। এখন এসব করতে হবে না। আমরা নাৎসিদের খপ্পরে আছি।
সাবেক নাৎসি।
হ্যাঁ, ওটা খুবই খুশির সংবাদ।
অগত্যা বিছানায় উঠল ক্রো। বিছানার পাশ ঘুরে গিয়ে লিসাও উঠল। নিভিয়ে দিল মোমবাতিগুলো। অন্ধকার হয়ে গেলেও ফায়ারপ্লেসের নিভু নিভু আলো রুমকে একটু আসোময় করে রাখল। লিসা এই যাবতীয় অন্ধকার একা সামাল দিতে পারত কিনা সে-ব্যাপারে ওর নিজেরই সন্দেহ আছে।
কম্বলের নিচে ঢুকে ওটাকে থুতনি পর্যন্ত টেনে নিল লিসা। দুজনের মাঝখানে একটু জায়গা ফাঁকা রেখেছে ও। পেইন্টার ওর দিকে পিছ দিয়ে আছে। ক্রো হয়তো ওর ভয় অনুভব করতে পেরে এদিক ঘুরল।
যদি আমরা মারা যাই, বিড়বিড় করল ক্রো, তাহলে আমরা একসাথে মরব।
লিসা ঢোঁক গিলল। পেইন্টারের কাছ থেকে এরকম কিছু শুনবে বলে মোটেও আশা করেনি। তবে একটু ভড়কে গেলেও অদ্ভুত স্বস্তি পেল। কথা বলার ভেতরে একধরনের সুর ছিল, ওতে থাকা সততা, প্রতিজ্ঞা লিসাকে মুগ্ধ করল। নিজেদের বাঁচানোর জন্য বলা দুর্বল যুক্তিগুলোর চেয়ে এই কথাটি মন ছুঁয়ে গেল লিসার।
পেইন্টারকে বিশ্বাস করল ও।
একটু কাছাকাছি এসে ক্রোর হাত ধরল। একে অপরকে জড়িয়ে ধরল দুজনের। আঙুলগুলো। কোনো যৌনতা নয়, স্রেফ দুজন মানুষের ছোঁয়া। পেইন্টারের এক হাত নিজের শরীরের ওপর টেনে নিল লিসা।
ক্রো লিসার হাতে চাপ দিয়ে ভরসা দেয়ার চেষ্টা করল।
ওর আরও কাছে চলে গেল লিসা। ক্রো ওকে ভাল করে জড়িয়ে ধরার জন্য আরও একটু এদিকে ঘুরল।
চোখ বুজল লিসা। ঘুমানোর কোনো আশা নেই।
কিন্তু ক্রোর বাহুডোরে ও ঠিকই ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল।
.
রাত ১০টা ৩৯ মিনিট।
কোপেনহ্যাগেন, ডেনমার্ক।
ঘড়ি দেখল গ্রে।
দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ওরা গা ঢাকা দিয়ে আছে। মাইন নামের রাইডের একটি সার্ভিস শ্যাফটের ভেতরে লুকিয়ে আছে ওরা। একধরনের ভূগর্ভস্থ খনির ভেতর দিয়ে এই আদিকালের রাইড ঘুরে বেড়ায়। আশেপাশে বিভিন্ন কার্টুনের মজাদার অবয়ব থাকে। একই মিউজিক বারবার বাজতে বাজতে রাইড এগিয়ে চলে। এই মিউজিক কানের জন্য বেশ বেদনাদায়ক, অনেকটা চীনা ওয়াটার টর্চারের কাছাকাছি।
টিভোলি গার্ডেনসের লোকজনের ভেতরে ঢুকেই গ্রে আর ফিওনা পুরোনো এই রাইডে চড়ে বাবা-মেয়ে সেজেছে। কিন্তু প্রথম বাক আসামাত্র রাইডের কার থেকে নেমে বিদ্যুৎসংযোজক বিপজ্জনক চিহ্ন দেয়া একটি সার্ভিস দরজার পেছনে চলে গেল। রাইড শেষ না করেই গ্রে কল্পনা করল রাইডের শেষ অংশে কী থাকতে পারে : ফুসফুসের রোগে ভুগে হাসপাতালের বেডে শুইয়ে আছে কার্টুনগুলো।
ভাবল গ্রে।
ডাচ ভাষায় সেই একঘেঁয়ে মিউজিক হাজারবার পুনরাবৃত্তি করে বেজেই চলেছে। ডিজনিল্যান্ডের ইটস-অ্যা-স্মল-ওয়াল্ড রাইডের মিউজিকের মতো অত খারাপ না। হলেও কাছাকাছি আরকী।
ভেতরে ঢুকে ডারউইন বাইবেলটিকে নিজের কোলের ওপর খুলল গ্রে। পেনলাইট জ্বেলে এক এক করে পৃষ্ঠা ওল্টাচ্ছে ও, যদি কোনো কু পাওয়া যায়। মিউজিকের শব্দে ওর মাথা দপদপ করছে।
তোমার কাছে অস্ত্র আছে? এক কোণায় গুটিসুটি মেরে জিজ্ঞেস করল ফিওনা। থাকলে আমাকে এখনি গুলি করে দাও।
শ্বাস ফেলল গ্রে। আমাদের হাতে মাত্র ১ ঘণ্টা সময় আছে।
আমি পারব না। আমার দ্বারা হবে না।
প্ল্যান হলো, পার্ক বন্ধ হওয়া পর্যন্ত ওরা অপেক্ষা করবে। এই পার্ক থেকে বের হওয়ার জন্য অফিসিয়াল গেইট আছে মাত্র একটি। তবে গ্রে জানে পার্কের সব গেইটেই এখন নজরদারি করা হচ্ছে। গভীর রাতে যখন পার্কের ময়লা সরাতে গাড়ি আসবে শুধু তখনই পালানো সম্ভব। মনক কোপেনহ্যাগেন এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছেছে কি-না সেটা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করল গ্রে কিন্তু লোহা আর তামার এই পুরোনো স্থাপনা ওর ফোনের নেটওয়ার্কের দফারফা করে দিয়েছে। ওদেরকে এয়ারপোর্ট যেতে হবে।
বাইবেল থেকে কিছু জানতে পারলে? ফিওনা জানতে চাইল।
মাথা নাড়ল গ্রে। ডারউইন পরিবারের বংশক্রম সুন্দর করে একদম সামনের কভারে দেয়া আছে। দারুণ লাগছে দেখতে। কিন্তু তারপর অনেক পৃষ্ঠা উল্টে যাওয়ার পরও ওগুলো থেকে তেমন কোনো কু পাওয়া গেল না। যা পেল সবই হিজিবিজি রেখা। একই চিহ্ন বারবার এদিক ওদিক করে ব্যবহার করা হয়েছে।
চিহ্নগুলোকে নিজের নোটপ্যাডে টুকে নিল গ্রে। বাইবেলের মার্জিন অংশে ওগুলো লেখা আছে। হয়তো ওগুলো চার্লস ডারউইন নিজে লিখে গেছেন কিংবা পরবর্তীতে কেউ লিখেছে। কিন্তু কে লিখেছে সেটা তো আর গ্রে জানে না।
ঘে ফিওনাকে নোটপ্যাড দেখাল।
পরিচিত মনে হচ্ছে?
সামনে বুকল ফিওনা। চিহ্নগুলোকে ভালভাবে দেখল।
ҚА УКУТ Күн
পাখির আঁচড়, বলল ও। এরজন্য খুনোখুনি কেন হলো বুঝলাম না।
গ্রে নিজের চোখ চালু রাখলেও মুখ বন্ধ রাখল। ফিওনার মুড অফ হয়ে গেছে। ওর সেই প্রতিহিংসাপরায়ণ, রাগী স্বভাবটাই বরং ভাল ছিল। এখানে ঢোকার পর থেকে মেয়েটির মন-মেজাজ অন্যরকম হয়ে গেছে। গ্রে সন্দেহ করল, এই মেয়ের যাবতীয় ঘৃণা, রাগ, জেদ ছিল বাইবেলটিকে হাত করা পর্যন্ত। ওর নানুর মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়া, এইটুকুই। আর এখন এই অন্ধকারে ফিওনার মনের আসল অবস্থা দেখা যাচ্ছে।
