পাশে থাকা জায়গায় বসল পেইন্টার।
লিসাও বসল।
পেইন্টার পাউরুটি কাটছে, এই ফাঁকে এক খণ্ড পনির তুলে নিল লিসা। নাক কুঁচকে আবার রেখে দিল। ক্ষিধে নেই।
খাওয়া উচিত। বলল পেইন্টার।
কেন খাব? যাতে ওরা যখন আমাকে ড্রাগ দেবে তখন শক্ত হয়ে থাকতে পারি?
এক টুকরো মাংস মুড়িয়ে মুখে পুরল ক্রো। ওটা চিবুতে চিবুতে বলল, কোনো কিছুই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে হ্যাঁ, আমি যদি জীবনে কিছু শিখে থাকি অন্তত এটা শিখেছি।
লিসা পটেনি। মাথা নাড়ল। তাহলে তুমি কী বলছ? ভাল কিছু হবে এই আশায় বসে থাকবে?
ব্যক্তিগতভাবে আমার প্ল্যান পছন্দ।
ওর দিকে তাকাল লিসা। কোনো প্ল্যান আছে তোমার?
সাদা-সিধে একটা আছে। গোলাগুলি করে, বোমা-টোমা মেরে হুলস্থুল কারবার করব না। একদম সহজ।
কী সেটা?
মাংসটুকু গিলে লিসার দিকে ফিরল পেইন্টার ক্রো। আমি এমন একটা জিনিস খুঁজে পেয়েছি যেটা অনেক সময় যোগাতে কাজে দেয়।
উত্তরের জন্য অপেক্ষা করে আবার প্রশ্ন করল লিসা। কী?
সততা।
১৪৫
লিসা কাঁধ ঝুলিয়ে ধপ করে পেছনে হেলান দিল। দারুণ।
একটি পাউরুটির টুকরো তুলে ওতে একটু সরষে, এক খণ্ড মাংস আর পনির দিয়ে লিসার দিকে এগিয়ে ধরল ক্রো। খাও।
শুধু ক্রোকে খুশি করার জন্য শ্বাস ফেলে লিসা খাবার হাতে নিল।
একই জিনিস নিজের জন্যেও বানাল ক্রো। ধরো, আমি তো ডারপার অধীনে থাকা সিগমা ডিভিশনের ডিরেক্টর। আমেরিকার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে এরকম বিষয় নিয়ে আমরা গবেষণা করি। সাবেক স্পেশাল ফোর্সের সৈন্যরা আমাদের হয়ে কাজ করে। ডারপার সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষেত্র হলো সিগমা ফোর্স যেটা সরোজমিনে কাজ করে থাকে।
পাউরুটির এক প্রান্তে একটু কামড় দিয়ে একটু সরষে মুখে পুরল লিসা। তো আমরা কী সেই সৈন্যদের দ্বারা উদ্ধার হওয়ার কোনো আশা করতে পারি?
নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। আমাদের হাতে যতটুকু সময় আছে এতে হবে না। আমার লাশ যে ওই মঠের ধ্বংসস্তূপের ভেতরে নেই সেটা ওদের বের করতে কয়েকদিন লেগে যাবে।
তাহলে আমি তো কোনো আশা দেখতে পা…।
হাত উঁচু করল ক্রো। পাউরুটি মুখে নিয়ে চিবুতে চিবুতে বলল, সততাই সব। খোলামেলাভাবে সৎ হতে হবে। তারপর দেখা যাক, কী হয়। এখানকার অদ্ভুত ঘটনাগুলোর ওপর সিগমার নজরে পড়েছে। অসুখের খবরটা ওখানে পৌঁছে গেছে অনেক আগেই। পাহাড়ের ভেতরে এতগুলো বছর ধরে সবকিছু গোপনে চলতে চলতে হঠাৎ গত কয়েকমাস ধরে এসব গড়বড় কেন শুরু হলো? আমি এই ঘটনাগুলোকে কাকতালীয় মানতে রাজি নই। অ্যানা সেই সৈন্যকে কী বলছিল সেটা আমি শুনেছি। কোনো একটা সমস্যার কথা বলছিল অ্যানা। সমস্যাটা ওদের ভোগাচ্ছে। আমার মনে হয়, আমাদের দুই পক্ষের লক্ষ্য এক ও অভিন্নই হবে। তাতে আমরা একে অপরকে সাহায্য করতে পারব।
সেই সাথে আমাদেরকে যদি বাঁচতে দেয়? একটু অবহেলা করে বলল লিসা, যদিও মনে মনে আশা ছাড়েনি। নিজের বোকামি ঢাকার জন্য একটু পাউরুটি মুখে পুরল।
তা বলতে পারছি না, সত্তাবে বলল ক্রো। আমরা যতক্ষণ আমাদেরকে উপকারী ও কার্যকরী হিসেবে প্রমাণ করতে পারব ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের হাতে সময় থাকবে। যদি কয়েকটা দিন বাড়িয়ে নিতে পারি… তাহলে সেটা আমাদের উদ্ধার কিংবা এখানকার পরিস্থিতি বদলে দেয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেবে।
গভীর চিন্তা করতে করতে খাবার চিবুচ্ছে লিসা। ও টেরই পেল না ওর হাত ফাঁকা হয়ে গেছে। অথচ ওর ক্ষিধে শেষ হয়নি। ব্ল্যাকবেরির ওপরে ক্রিম ঢেলে দিয়ে ওরা দুজনে ভাগাভাগি করে খেলো।
পেইন্টারের দিকে নতুন দৃষ্টিতে তাকাল লিসা। এই ব্যক্তির অদম্য জেদ। ওই নীল চোখগুলোর পেছনে বুদ্ধির ঝিলিক আর সাধারণ জ্ঞানে ভরপুর। লিসার নিরীক্ষা বুঝতে পেরেই হয়তো পেইন্টার ওর দিকে তাকাল। চট করে দৃষ্টি ঘুরিয়ে খাবারের ওপর বসাল লিসা।
চুপচাপ খাবার শেষ করে ওরা চায়ে চুমুক দিল। পেটে খাবার পরার পর পরম প্রশান্তি ওদের ওপর ভর করল। কথা বলতেও ইচ্ছে হলো না ওদের। পেইন্টারের পাশে চুপচাপ বসে থাকতেই লিসার ভাল লাগছে। ক্রোর শ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজ শুনতে পেল ও। সদ্য গোসল করে আসা একটু ভেজা ত্বকের ঘ্রাণও পাচ্ছে।
চা শেষ করে লিসা খেয়াল করল ক্রো কপালের এক অংশ ডলছে, বাঁকা হয়ে গেছে এক চোখ। ওর মাথাব্যথা আবার বাড়তে শুরু করেছে। ডাক্তারি করে ক্রোকে দুশ্চিন্তায় ফেলতে চায় না লিসা। চুপচাপ ওর আচরণ খেয়াল করল। কেঁপে উঠল আরেক হাতের আঙুলগুলো। প্রায় নিভে আসা আগুনের দিকে ও চোখ মেলতেই দেখা গেল ওর চোখের পাতা একটু একটু কাঁপছে।
পেইন্টার সতোর ব্যাপারে কথা বলল। কিন্তু সে কি নিজের অবস্থার ব্যাপারে সঠিক তথ্যটুকু জানতে চায়? মাথাব্যথা তো দেখা যাচ্ছে বেশ ঘনঘন ফিরে আসছে। লিসার ভেতরের একটি অংশ স্বার্থপরের মতো ভয় পেল। না, ক্রোর স্বাস্থ্যের কথা ভেবে নয়, ক্রোর কিছু হয়ে গেলে বাঁচার যে ক্ষীণ আশাটুকু আছে ওটা নিভে যাবে, সেই কারণে। ক্রোকে ওর প্রয়োজন।
উঠল লিসা। আমাদের একটু ঘুমিয়ে নেয়া উচিত। ভোর হতে খুব বেশি দেরি নেই।
একটু গোঙাল পেইন্টার, মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল। একটু টলমল করে উঠতেই ওর কনুই ধরল লিসা।
আমি ঠিক আছি। বলল পেইন্টার।
এই হচ্ছে সতোর নমুনা।
