পেইন্টার আছে বাইরের রুমে। ওদের ছোট ফায়ারপ্লেসে কাঠ দিচ্ছে।
ছোট্ট একটি প্রিজন সেলে (জেলখানার কামরা) আছে ওরা।
পেইন্টার অ্যানা পোরেনবার্গকে বলেছিল, ওরা দুজনে একটু পূর্ব পরিচিত। মিথ্যে কথা। আসলে দুজন যেন একসাথে থাকতে পারে তাই চালাকি করে কথাটা বলেছে।
লিসাও আপত্তি করেনি।
ও এখানে একা থাকতে চায় না।
এখানকার পানির তাপমাত্রা অস্বস্তিকর গরমের চেয়ে কয়েক ডিগ্রি কম। গরম পানির কারণে লিসার শরীর কেঁপে উঠল। নিজে ডাক্তার হওয়ায় লিসা ওর শরীরের শক পাওয়া চিহ্নগুলো বুঝতে পারল। আর একটু হলেই ওখানে জার্মান মহিলাটির সাথে ওর হাতাহাতি লেগে যেত। ওর এই আচরণের কারণে পেইন্টারসহ ওকেও হয়তো মরতে হতো গুলি খেয়ে।
পেইন্টার বরাবরই শান্ত-শিষ্ট। এমনকি এখনও ও শুনতে পাচ্ছে, ধীরচিত্তে ফায়ারপ্লেসে কাঠ দিয়ে যাচ্ছে পেইন্টার। সুন্দর সাবলীলভাবে আছে সে। তবে ও নিশ্চয়ই একদম খালি হয়ে গেছে। একটু আগে গোসল সেরেছে পেইন্টার। না পরিষ্কার হওয়ার জন্য নয় বরং ফ্রস্টবাইট থেকে বাঁচার জন্য ওকে গোসল করতে হয়েছে। ওর কানের লতিতে সাদা সাদা দাগ দেখে লিসা-ই ওকে আগে গোসল করতে পাঠিয়েছিল।
গরম কাপড়ে বেশ ভাল অবস্থাতেই ছিল লিসা।
এই মুহূর্তে লিসা নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বাথটাবে ডুবিয়ে রেখেছে। পানির নিচে ওর মাথা, চুলগুলো আলগোছে পানিতে ভাসছে। পানির তাপমাত্রা ওর শরীরের প্রত্যেকটি কোষে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল। বিস্তৃত হলো ওর অনুভূতি। এখন ওকে শুধু একটি কাজ করতে হবে-~~-পানির নিচে নিঃশ্বাস নিতে হবে। ব্যস, তাহলেই সব শেষ। কয়েক মুহূর্ত ছটফট করে সবকিছু চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। এত ভয়, দুশ্চিন্তা সব। নিজের ভাগ্যকে নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে লিসা… ওকে যারা বন্দি করে রেখেছে এভাবে তাদের কাছ থেকে নিজের মুক্তি আদায় করে নিতে পারবে।
দরকার শুধু একবার নিঃশ্বাস নেয়া…
তোমার গোসল কী প্রায় শেষ? পানির ভেতরে কথাগুলো শুনতে পেল ও, মনে হলো শব্দগুলো অনেক দূর থেকে আসছে। ওরা আমাদের জন্য গভীর রাতের খাবার এনে দিয়েছে।
পানির নিচ থেকে উঠল লিসা, ওর চুল, মুখ বেয়ে পানি চোয়াচ্ছে। আর এক মিনিট।
ঠিক আছে, তাড়াহুড়ো নেই, সময় নাও। মেইন রুম থেকে বলল পেইন্টার।
লিসা শুনতে পেল পেইন্টার আরেকটি কাঠ আগুনের ভেতরে দিয়ে দিল।
পেইন্টার এখন নড়ছে কীভাবে? বিছানায় পড়ে ছিল তিন দিন, ভূগর্ভস্থ সেলারের হাতাহাতি, বরফের ভেতর দিয়ে এপর্যন্ত আসা… তারপরও ওর ভেতরে কোনো ক্লান্তি নেই। ব্যাপারটা লিসার মনে আশা যোগাল। হয়তো এটা স্রেফ বেপরোয়া ভাব তবে ও ঠিকই পেইন্টারের ভেতরে একটি মজবুত শক্তির ছাপ দেখতে পেল, যেটা শারীরিক শক্তির চেয়ে বেশি কিছু।
ওর কথা ভাবতে ভাবতে লিসার কাঁপুনি কমে এলো।
বাথটাব থেকে উঠে দাঁড়াল ও, গায়ে পানি ঢেলে ভোয়ালে জড়িয়ে নিল। হুক থেকে একটি পুরু আলখাল্লা ঝুলছিল, কিন্তু আপাতত ওটা নিল না ও। পুরোনো বেসিনের পাশে মেঝের দৈর্ঘ্য বরাবর আয়না আছে, আয়নার তল একটু ঘোলা হয়ে গেলেও ওর নগ্ন শরীর ঠিকই দেখা যাচ্ছে ওতে। পা নড়াল ও। আত্মঅনুভূতি কিংবা তৃপ্তির জন্য নয়, কোথায় কোথায় আঁচড় লেগেছে সেটা দেখল। ওর জরায়ুর ভেতরে একটু গভীর ব্যথা ওকে জরুরি কিছু একটা মনে করিয়ে দিল।
ও এখনও বেঁচে আছে।
টাবের দিকে তাকাল।
ও ওদেরকে তৃপ্তি পেতে দেবে না। ব্যাপারটার মোকাবেলা করবে।
আলখাল্লা গায়ে চড়িয়ে নিল। কোমড়ের অংশে ফিতে টাইট করে বাঁধার পর বাথরুমের ভারী ছিটকানি খুলে বাইরে বেরোল। পাশের রুম আরও বেশি গরম। গরম বাস্প রুমকে উষ্ণ করে রেখেছে। তবে ফায়ারপ্লেসে আগুন দেয়ায় আরও সুন্দর হয়েছে রুমের তাপমাত্রা। ফায়ারপ্লেসে ঘোট ঘোট আগুনের শিখা লাফাচ্ছে, পট পট শব্দ হচ্ছে, রুমে একধরনের উজ্জ্বলতা এনে দিয়েছে ওটা। বিছানার পাশে থাকা কয়েকটি মোমবাতি এই প্রিজন সেলারে একধরনের ঘরোয়া পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। যোগ হয়েছে। বাড়তি আলো।
এই রুমে কোনো কারেন্ট নেই।
এখানে ওদের পুরে রাখার সময় অ্যানা পোরেনবার্গ বেশ গর্বের সাথে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়েছিল কীভাবে এখানে ১০০ বছর পুরোনো রুডলফ ডিজেলের তৈরি জেনারেটর থেকে তাপমাত্রার মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। রুডলফ ডিজেল একজন ফরাসী বিজ্ঞানী ছিলেন, ডিজেল ইঞ্জিনের আবিষ্কারকর্তা তিনিই। তবে এখানে বিদ্যুৎ অপচয় করা হয় না। ক্যাসলের শুধু নির্দিষ্ট কিছু অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা আছে।
এখানে নেই।
রুমে লিসা ঢুকতেই পেইন্টার ওর দিকে ফিরল। লিসা খেয়াল করল পেইন্টারের চুলগুলো শুকিয়ে এলোমেলো হয়ে গেছে। একটু লম্পট ছোকরার মতো লাগছে ওকে। পা নগ্ন আর গায়ে একটি আলখাল্লা পরে আছে পেইন্টার। দুটো পাথরের মগে করে ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে এলো।
জেসমিন চা, লিসাকে ফায়ারপ্লেসের সামনে থাকা একটি ছোট সোফায় বসার ইঙ্গিত করল ও।
নিচু টেবিলে কিছু খাবার রাখা আছে। শক্ত পনির, পাউরুটি, রোস্ট করা গরুর মাংস, সরিষা ও এক বাটি ব্ল্যাকবেরি। সাথে ঘোট এক বাটি ক্রিম।
আমাদের জীবনের শেষ খাওয়া? একটু হালকাভাবে কথাটা বলতে চেয়েছিল লিসা কিন্তু পারল না, ভারী-ই হয়ে গেল। সকাল হতেই ওদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হবে।
