ক্রসরোডের মাথায় পৌঁছে গেছে, খুব দ্রুত এগোচ্ছে ওরা।
একপাশে কাত করে স্কুটারের গতি কমানোর চেষ্টা করল গ্রে। ওটার ধাতব শরীর থেকে স্ফুলিঙ্গ বেরোল। রাস্তাগুলোর সংযোগস্থল পর্যন্ত হেঁচড়ে এগোল ওরা। একটি ট্রাকের সামনে দিয়ে অপর রাস্তায় গিয়ে উঠল। গর্জে উঠল হর্ন। ব্রেক কষার তীব্র আওয়াজ শোনা গেল।
রাস্তার এক পাশে গিয়ে ধাক্কা লাগল ওদের স্কুটার। ছিটকে গেল গ্রে ও ফিওনা।
রাস্তার পাশে থাকা একটি বেড়া ওদের এই সংঘর্ষের ফলে ভেঙ্গে গেল। তবে গড়ানি খেয়ে কোনোমতে ফুটপাটে উঠে দাঁড়াতে সক্ষম হলো ওরা। গ্রে উঠে দাঁড়িয়ে ফিওনার কাছে গিয়ে বলল, তুমি ঠিক আছে তো?
ফিওনাও উঠে দাঁড়িয়েছে। ব্যথা কম ওর রাগ হচ্ছে বেশি। দুই শ ইউরো দিয়ে এই স্কার্ট কিনেছিলাম। ওর পোশাকের একপাশ লম্বালম্বি আকারে ছিঁড়ে গেছে। এক হাত দিয়ে ছিঁড়ে যাওয়া ফাঁকা অংশটুকু বন্ধ করতে করতে আরেক হাত বাড়িয়ে নিজের পার্স তুলে নিল।
গ্রের আরমানি স্যুটের অবস্থা আরও খারাপ। ওর এক হাঁটু বেরিয়ে পড়েছে, জ্যাকেটের এক হাতা দেখে মনে হচ্ছে ঝামা দিয়ে ঘষা হয়েছে ওটাকে। তবে এসব কাটাছেঁড়া আর সামান্য আঘাত ছাড়া ওরা প্রায় অক্ষত আছে।
অন্যান্য গাড়িঘোড়া চলে যাচ্ছে দুর্ঘটনাস্থলের পাশ দিয়ে।
হাঁটা ধরল ফিওনা। এখানে ভ্যাসপার দুর্ঘটনা প্রায়ই হয়। যখন তখন চুরিও হয় এগুলো। কোপেনহ্যাগেনের সকল স্কুটার হলো অনেকটা সরকারি জিনিসের মতো। দরকার পড়েছে? হাতের কাছে যেটা আছে নিয়ে ছুট লাগাও। কাজ শেষে? যেখানে খুশি ফেলে যাও। ওটা আবার অন্য কেউ ব্যবহার করবে। ভ্যাসপা নিয়ে এখানে কেউ মাথা ঘামায় না।
কিন্তু এবার ঘামাল।
একজোড়া নতুন চাকা দৃষ্টি আকর্ষণ করল ওদের। দুই ব্লক পেছনে একটি ব্ল্যাক সেডান রাস্তা দিয়ে ওদের দিকে ধেয়ে আসছে। হেডলাইটের উজ্জ্বল আলো থাকায় ভেতরে থাকা আরোহীদেরকে চেনা গেল না।
ফিওনাকে নিয়ে ফুটপাতে হাঁটতে শুরু করল গ্রে, গভীর ছায়া খুঁজছে। এখানকার একপাশে ইটের লম্বা দেয়াল ছাড়া আর কিছু নেই। কোনো গলি, বিল্ডিং, কিছু নেই। স্রেফ একটি উঁচু দেয়াল। দেয়ালের পেছন থেকে হালকা সুরে বাঁশির আওয়াজ ভেসে আসছে।
ওদের পেছনে থাকা স্কুটারের পেছনে এসে সেডানের গতি কমল।
বোঝাই যাচ্ছে ওদের স্কুটারে পালানোর খবর রিপোর্ট করা হয়েছে।
এদিকে! বলল ফিওনা।
কাঁধে পার্স ঝুলিয়ে ছায়ায় থাকা একটি পার্ক বেঞ্চের ওপর চড়ল ও। তারপর ওটার হেলান দেয়া অংশটুকু ব্যবহার করে লাফিয়ে উঠে উপরে ঝুলতে থাকা একটি গাছের ডাল ধরল। গাছের ডালের ওপর তুলে দিল দুই পা।
কী করছ?
রাস্তার ছেলেরা এই কাজ সবসময়ই করে। ফ্রি প্রবেশ।
কী?
আরে আসো।
হাতের সাহায্যে গাছের মোটা ডাল ধরে এগোল ফিওনা। ইটের দেয়ালের ওপাশে লাফ দিয়ে নামল।
ধেৎ।
সেডান আবার রাস্তায় চলতে শুরু করেছে।
কোনো উপায় না দেখে গ্রে-ও ফিওনার পথ অনুসরণ করল। বেঞ্চে লাফিয়ে উঠল। গ্রে। দেয়ালের ওপাশ থেকে আলতো করে সুর ভেসে আসছে। মাথা নিচ দিকে ঝুলিয়ে দেয়ালের ওপর দিয়ে কিছু অংশ গেল ও।
ওপাশে জ্বলজ্বলে হারিকেনে সুন্দর একটি ওয়ান্ডারল্যান্ড দেখা যাচ্ছে, খুদে অট্টালিকা আর রাইডের জন্য বিভিন্ন পাকানো রেল।
টিভোলি গার্ডেনস।
এই পার্ক কোপেনহ্যাগেনের কেন্দ্রে অবস্থিত। দেয়ালের এই উচ্চতায় দাঁড়িয়ে গ্রে পার্কের সেন্ট্রাল লেকটা দেখতে পেল। লেকের পানিতে হাজার হাজার হারিকেন আর লাইটের উজ্জ্বল আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। দুপাশে ফুল দিয়ে সাজানো পথ কাঠের রোলার কোস্টার, পানোৎসব আর ফেরিস হুইলের দিকে চলে গেছে। তথ্য-প্রযুক্তির দিক দিয়ে ডিজনির চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও এই পুরোনো পার্কটি বেশ জীবন ঘনিষ্ঠ।
ওয়ালের ওপর দিয়ে গাছের ডাল ধরে পার্কের আরও একটু ভেতরে এগোল গ্রে।
একটু দূরে, ফিওনা ওর জন্য অপেক্ষা করছিল, ওকে দেখে ইশারা করল। বাগানের শেডের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল ও।
এখন পা ছেড়ে দিয়ে গাছের ডাল ধরে ঝুলছে গ্রে।
ডান হাতের পাশে কীসের যেন শব্দ হওয়ায় গ্রে একদম চমকে উঠল। গাছের ডাল ছেড়ে দিল ও। হাত ছুঁড়ে নিজের ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করল। অনেক ফুলের ওপর বেশ সজোরে আছড়ে পড়ল গ্রে। এক হাঁটুত বেশি চাপ লেগেছে। তবে বাগানের দো আঁশ মাটি ওকে একটু আরাম দিল। দেয়ালের পেছনে গর্জে উঠল ইঞ্জিন, দরজা বন্ধ করার আওয়াজ পাওয়া গেল।
ওদেরকে দেখে ফেলেছে।
মুখবিকৃত করে ফিওনার সাথে যোগ দিল গ্রে। বেচারির চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। গুলি হওয়ার আওয়াজ শুনেছে ও। কোনো কথা না বলে টিভোলি গার্ডেনস-এর ভেতরে ছুটল ওরা।
০৬. আগলি ডাকলিং
রাত ১টা ২২ মিনিট।
হিমালয়।
মাঝরাত পার হয়ে গেছে, প্রাকৃতিকভাবে গরম হওয়া মিনারেল পানিতে গোসল করছে লিসা। ও চাইলে চোখ বন্ধ করে নিজেকে ইউরোপের কোনো একটি বিলাস বহুল স্পা তে আছে বলে কল্পনা করতে পারে। রুমের সরঞ্জামাদি চটকদার। পুরু ইজিপশিয়ান কটন তোয়ালে ও আলখাল্লা, চার জনের জন্য থাকা বিশাল খাট, তাতে কম্বল রাখা আর বিছানা তুলতুলে নরম। দেয়াল থেকে ঝুলছে মধ্যযুগীয় চিত্রকলা, পাথুরে মেঝের ওপর। পায়ের নিচে বিছানো আছে তুর্কী গালিচা।
