মুখ শুকনো থাকার কারণ তার পিছু পিছু উদয় হলো। গার্ড একটি মেয়ের হাতের উপরের অংশ ধরে এদিকে নিয়ে আসছে।
ফিওনা।
ওর চেহারায় রাগ ফুটে উঠেছে। চেপে ধরেছে ঠোঁট, লাল হয়ে গেছে ওগুলো।
বেশ ক্ষিপ্ত।
গ্রে ওদের দিকে এগোল।
একদিকে সরে গেলেন ইরগেনচেইন। নরম কাপড়ে প্যাচিয়ে কী যেন নিচ্ছেন তিনি। প্রধান ডিসপ্লে কেসের সামনে গেলেন তিনি। এই কেস এতক্ষণ খালি ছিল। একজন স্টাফ কেবিনেটের লক খুলে ফেলল। ইরগেনচেইন খুব আলতোভাবে প্যাচানো কাপড় খুলে জিনিসটিকে কেসে রাখলেন।
গ্রেকে এগোতে দেখে দুহাত একসাথে করে সামনে এগোলেন তিনি। গ্রের সামনে এসেও হাত জড়ো করে রইলেন, যেন প্রার্থনা করছেন। স্টাফ তার পেছনের কেসটিকে তালাবন্ধ করে দিল।
কেসের বস্তুটিকে খেয়াল করল গ্রে।
দ্য ডারউইন বাইবেল।
গ্রেকে দেখতে পেয়ে ফিওনার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
ওকে না দেখার ভান করে নিলামদারের সাথে কথা বলল গ্রে। কোনো সমস্যা?
না, স্যার, একদমই না। এই তুরুণীকে বাইরে রেখে আসা হচ্ছে, এই আরকী। ওর কাছে কোনো নিমন্ত্রণপত্র নেই তো, তাই।
নিজের কার্ড বের করে দেখাল গ্রে। আশা করি, আমি এখানে একজন গেস্টকে সাথে রাখতে পারব। আরেক হাত ফিওনার দিকে বাড়িয়ে দিল ও। ও এখানে আগেভাগে চলে এসেছে দেখে আমি খুশি হয়েছি। আমার এক ক্রেতার সাথে কনফারেন্স কল করতে গিয়ে আটকে পড়েছিলাম। আমি এই মিস, নেয়ালের সাথে আজ একটি জিনিস ব্যক্তিগতভাবে কেনা-বেচার ব্যাপারে কথা বলে এসেছি।
গ্রে মাথা নেড়ে ডারউইন বাইবেল দেখাল।
পুরো শরীর দিয়ে নিজের হতাশা প্রকাশ করলেন ইরগেনচেইন, ঠিক প্রকাশ নয়, বলা যায় প্রকাশের ভান করলেন। দুঃখজনক ঘটনা। আগুন লেগে গিয়েছিল। তবে গ্রিট্টি নেয়াল তার নিজের লটের জন্য নিলাম ভবনের সাথে চুক্তি করেছিলেন। তাঁর পক্ষের ব্যারিস্টার যদি না আসে তাহলে এই বাইবেল নিলামে উঠবেই উঠবে, আইন তো সেটাই বলে।
গার্ডের হাতে ধরা থাকা অবস্থায় হেঁচকা টান মারল ফিওনা, খুনের নেশা ওর চোখে।
ইরগেনচেইন যেন ফিওনাকে দেখতেই পাচ্ছেন না। স্যার, ওটা কিনতে হলে আপনাকে নিলামে অংশগ্রহণ করতে হবে, দুঃখিত, আমার হাত বাধা।
তাহলে সেক্ষেত্রে মিস, নেয়াল যদি আমার সাথে থেকে নিলামে অংশগ্রহণ করেন তাহলে নিশ্চয়ই আপনার আপত্তি থাকবে না?
আপনার যেমন মর্জি। ফাটা হাসি দিলেন নিলামদার। ইশারা করে গার্ডকে ছেড়ে দিতে বললেন। তবে সে যেন সবসময় আপনার সাথে থাকে। যেহেতু সে আপনার গেস্ট, সেহেতু তার দায়-দায়িত্ব আপনার।
ফিওনাকে ছেড়ে দেয়া হলো। গ্রে ওকে নিয়ে পেছনে ফিরতে গিয়ে খেয়াল করল গার্ডটিও ওদের সাথে আসছে। দেখে মনে হলো ওরা যেন ব্যক্তিগত বডিগার্ড পেয়ে গেছে!
শেষ সারিতে গিয়ে বসল ওরা। এমন সময় ঘোষণা এলো, আর এক মিনিটের মধ্যে নিলাম অনুষ্ঠান শুরু হতে যাচ্ছে। আসনগুলোতে লোকজন বসতে শুরু করল, অধিকাংশই বসল সামনের অংশের কাছাকাছি। গ্রে আর ফিওনা পেছনের সারিতেই বসে রইল।
তুমি এখানে কী করছ? ফিসফিস করে বলল গ্রে।
আমার বাইবেল ফেরত নিতে এসেছি, তাচ্ছিল্যের সাথে ফিওনা জবাব দিল। কিংবা অন্তত চেষ্টা করে দেখছি।
সিটের পেছনে ধপ করে হেলান দিল ও, চামড়ার পার্সের ওপরে ওর হাত দুটো আড়াআড়ি করে রাখা।
সামনে থাকা মঞ্চে উঠে কিছু সাধারণ নিয়মাবলি ঘোষণা করছেন ইরগেনচেইন। পুরো নিলাম অনুষ্ঠান ইংরেজিতে পরিচালিত হবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা উপস্থিত আছেন তাই সবার সুবিধার্থে ইংরেজি ভাষা ব্যবহৃত হবে। নিলামে দর হাঁকার নিয়ম বর্ণনা করলেন তিনি। নিলাম ভবনের বিভিন্ন চার্জ থেকে শুরু করে কিছু আদব-কায়দাও শিখিয়ে দিলেন। নিলামে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়মটি হলো একজন। ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বার দর হাঁকতে পারবে। আর ভবনের ডিপোজিটে যে পরিমাণ অর্থ। জমা রেখেছে সেটাই হবে তাঁর দর হাঁকার সর্বোচ্চ সীমা, অর্থাৎ এর ওপরে আর সে কোনো দর হাঁকতে পারবে না।
এত নিয়ম-কানুন শোনায় কান দিল না গ্রে। ফিওনার সাথে কথা বলতে লাগল, সামনের সারি থেকে কয়েকজন অসন্তুষ্টি নিয়ে তাকাল ওদের দিকে।
তুমি বাইবেলের জন্য এখানে এসেছ? কেন?
জবাব না দিয়ে ফিওনা হাত শক্ত করল।
ফিওনা…
রাগে চোখ-মুখ শক্ত করে গ্রের দিকে তাকাল ফিওনা। কারণ ওটা মাট্টির জিনিস! ওর চোখ ছলছল করতে লাগল। এটার জন্য ওরা ওকে খুন করেছে। আমি ওটা ওদের হাতে যেতে দেব না।
কারা খুন করেছে?
হাত নাড়ল ও। যারাই খুন করে থাকুক, আমি ওটা নেব এবং পুড়িয়ে ফেলব।
শ্বাস ফেলে পেছনে হেলান দিল গ্রে। ফিওনা ওর নিজের সাধ্যমতো প্রতিশোধ নেয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। ও তাদেরকে আঘাত করতে চায়। অবশ্য গ্রে ফিওনাকে দোষও দিতে পারছে না… কিন্তু এভাবে বেপরোয়া আচরণ করলে তো এই বেচারিও মারা পড়বে।
বাইবেল আমাদের। আমি ওটা নিয়ে নেব। বলতে বলতে গলা ভেঙে গেল ওর। মাথা নেড়ে নাক মুছল।
গ্রে ওকে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল।
ফিওনা একটু সংকোচ করলেও গ্রের হাত সরিয়ে দিল না।
সামনে নিলাম শুরু হয়ে গেছে। প্যাডেল উঠছে, নামছে। যে সেরা দাম হাঁকবে সেই জিতবে। গ্রে খেয়াল করে রাখল কে কোন জিনিস কিনে নিচ্ছে। বিশেষ করে ওর নোটবুকে যে জিনিসগুলোর কথা লেখা আছে ওগুলো কারা কিনে নিচ্ছে সেদিকে বাড়তি নজর রাখল। মেন্ডেল-এর জেনেটিক্স পেপার, ফিজিক্সের ওপর লেখা ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কসের বই এবং হিউগো ডি ভ্রিসেস-এর উদ্ভিদ রূপান্তরের ওপর লেখা ডায়েরি।
