হাতে থাকা সিগারেটটিকে পটে ঠেসে ধরে নিভাল ডোরম্যান, মুখ বেজার করে গ্রের দিকে এগোল। ওতে উল্লেখ করা হয়েছে ভবনের ফান্ডে ২.৫ মিলিয়ন ডলার পাঠিয়ে নিশ্চিত করা হয়েছে–এরকম একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে এই ক্রেতা উপস্থিত হওয়ার মতো সামর্থ্য রাখেন।
আমন্ত্রণপত্র পরীক্ষা করে মাথা নাড়ল ডোরম্যান। লম্বা লম্বা পা ফেলে মখমলের ফিতার দিকে এগোল। ওই ফিতা নিচ তলায় যাওয়ার জন্য চওড়া সিঁড়িকে বন্ধ করে রেখেছে। ডোরম্যান ফিতা সরিয়ে গ্রেকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ইশারা করল।
সিঁড়ির নিচে এক সেট সুইংভোর ওকে নিলাম অনুষ্ঠানের মূল ফ্লোরে পৌঁছে দিল। দুজন গার্ড প্রবেশমুখের দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে। একজনের হাতে মেটাল ডিটেকটর। হাত উঁচু করে নিজেকে সার্চ করতে দিল গ্রে। ও খেয়াল করল দরজার দুপাশে ভিডিও ক্যামেরা সংযুক্ত আছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশ ভাল। ওকে সার্চ করা শেষ হতেই সুইচ টিপে সামনের দরজা খুলে দিল অন্য গার্ডটি।
বিভিন্ন রকম গুঞ্জন শুনতে পেল ও। ভাষাগুলো চিনতেও পারল : ইটালিয়ান, ডাচ, ফ্রেন্স, আরবি ও ইংলিশ। দেখে মনে হচ্ছে এই নিলামে অংশ নিতে পুরো দুনিয়া হাজির হয়ে গেছে।
ভেতরে ঢুকল গ্রে। ওর দিকে তাকাল কয়েকজন। তবে অধিকাংশেরই নজর দেয়ালের পাশে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা কাঁচের কেসগুলোর দিকে। নিলাম ভবনের স্টাফরা সবাই কালো রঙের পোশাক পরে জুয়েলারি দোকানের মতো কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের হাতে সাদা গ্লোভস পরা। নিলামের জন্য ভোলা বিভিন্ন জিনিসকে ভাল করে ধরে ক্রেতাদের সামনে উপস্থাপন করছে।
এক কোণায় দুটো বেহালা বাজছে আলতো সুরে। কয়েকজন স্টাফ ঘুরে ঘুরে অতিথির মাঝে লম্বা গ্লাসে করে শ্যাম্পেন পরিবেশন করছে।
পাশে থাকা ডেস্কের দিকে তাকাল গ্রে। ওখানে বিভিন্ন সংখ্যাযুক্ত প্যাডেল রাখা আছে। আরও ভেতরে এগোল ও আগতদের অনেকই আসগ্রহণ করেছে। নিলাম অনুষ্ঠানকে থামিয়ে রেখে দেরি করে আসা নির্বাক সিনেমার সেই দুই সুপারস্টারকে দেখল গ্রে। একদম প্রথম সারিতে বসে আছে তারা। ওই মহিলার কোলে একটি প্যাডেল পড়ে আছে। সঙ্গিণীর দিকে ঝুঁকে কানে কানে কী যেন বলছে পুরুষটি। দৃশ্যটি দেখতে কেমন যেন একটু অন্তরঙ্গ অশালীন বলে মনে হলো। হয়তো মহিলার ঘাড় বাঁকা থাকার কারণেই এমন লাগছে। দেখে মনে হচ্ছে, বোধহয় একটি চুমো পাওয়ার আশা করছে সে।
গ্রে আসনগুলোর মাঝখানের সারির দিকে এগোতেই মহিলাটি ওর দিকে তাকাল। তার চোখ ওর ওপর দিয়ে দৃষ্টি বুলিয়ে সরে গেল অন্যদিকে।
চিনতে পারেনি।
গ্রে নিজের অনুসন্ধান চালিয়ে গেল। মঞ্চের সামনের রুমে পৌঁছে গেল ও। ঘুরতে লাগল আস্তে আস্তে। কোনো বাহ্যিক হুমকির আশংকা দেখল না ও।
ফিওনারও দেখা পেল না।
মেয়েটি গেল কোথায়?
কাঁচের কেসের পাশ দিয়ে এগোল ও। অপরপ্রান্তের নিচের অংশে চোখ রাখল। আশেপাশে হওয়া কথাবার্তার জন্য ও কানে স্বাভাবিকের চেয়ে অর্ধেক কম শুনতে পারছে। এক স্টাফের পাশ দিয়ে এগোল ও। এক ভদ্রলোককে একটি চামড়ায় মোড়া বই দেখাচ্ছে সে। ভদ্রলোক নাকের ওপর চশমা রেখে সামনে ঝুঁকলেন।
বইটি খেয়াল করল গ্রে। প্রজাপতির ওপর হাতে লেখা ১৮৮৮ সালের একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ।
আসনের সারির নিচের অংশের দিকে এগোল ও। দরজার সামনে আবার হাজির হতেই সেই বেঁটে-খাটো মহিলার মুখোমুখি হলো। এই মহিলার ছবি সে ল্যাপটপে দেখে এসেছে। মহিলার হাতে একটি ছোট খাম। ওটা গ্রের দিকে এগিয়ে দিল। খাম হাতে নিয়ে গ্ৰে ভাবল, কী আছে এর ভেতর? মহিলার এই বিষয়ে কোনো আগ্রহই নেই, সে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে।
খামের সাথে একধরনের সুগন্ধীর ঘ্রাণ পেল গ্রে।
আজব।
বুড়ো আঙুলের নখ দিয়ে খামের সিল ভেঙে একটি ভাঁজ করা জিনিস বের করে আনল। এর ওয়াটারমার্ক বেশ মূল্যবান। পরিষ্কার হস্তাক্ষরে একটি ছোট্ট নোট লেখা আছে।
এমনকি গিলড পর্যন্ত জানে এই আগুনের ধারে কাছে না এসে ঘুরে ঘুরে দেখা উত্তম। সাবধানে থেকো।
চুমো রইল।
নোটে কোনো স্বাক্ষর নেই। তবে একদম নিচে গাঢ় টকটকে লাল কালি দিয়ে একটি ছোট কোঁকড়ানো ড্রাগনের প্রতীক আঁকা আছে। গ্রের আরেক হাত ওর গলায় চলে গেল। এই একইরকম দেখতে একটি রুপোলি ড্রাগন ঝুলছে ওখানে। ওর এক প্রতিযোগীর কাছ থেকে পাওয়া উপহার।
শিচ্যান।
মেয়েটি গিলড-এর হয়ে কাজ করে। সন্ত্রাসীদের মদদ যোগায় গিলড; একটি ছায়াময় সংগঠন। অতীতে সিগমা ফোর্সের সাথে ওর মোকাবেলা হয়েছিল। গ্রে টের পেল ওর ঘাড়ের চুলগুলো দাঁড়িয়ে গেছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে পুরো রুম খুঁজল ও। সেই মহিলা ওকে নোট ধরিয়ে উধাও হয়ে গেছে।
গ্রে আবার নোটটির ওপর চোখ বুলাল।
সতর্কবাণী।
দেরিতে হলেও এই-ই বেশি…
গিলড অন্তত এখানে আছে। তারমানে, যদি শিচ্যান বিশ্বাস করে…
আসলে শিচ্যানের কথা মেনে নিতে গ্রে রাজি।
যেহেতু ওরা দুজনই এখানে চোর, তাই চোর হয়ে চোরকে সম্মান দেখানো যেতেই পারে।
একটু হৈচৈ হওয়ায় রুমের পেছন দিকে তাকাল গ্রে।
পেছনের দরজা দিয়ে একজন লম্বা ব্যক্তি নিলাম অনুষ্ঠানে প্রবেশ করলেন। ডিনার জ্যাকেটে তাঁকে দারুণ দেখাচ্ছে। ইনি মিস্টার ইরগেনচেইন, নিলামদার। তেল দেয়া কালো চুলে হাত বুলালেন তিনি, কলপ দেয়া চুল, বোঝাই যাচ্ছে। একটি বইয়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার শুকনো মুখে ছোট্ট করে হাসি ফুটল।
