নিজের চেহারা যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক রাখল ক্রো। নিজের পরিচয় অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই ওর। হয়তো এই পরিচয়কে ব্যবহার করে সুবিধা আদায় করা যাবে। তাহলে তো আপনি জানেন, আমাকে ওরা কীভাবে খুঁজে বের করবে।
Natiarlich, মাথা নাড়লেন তিনি। ভুলে জার্মান বলে ফেলেছেন। কিন্তু তারা সফল হবে বলে আমি মনে করি না। আমি বলব, আপনি আর সেই মহিলা যেন আমার সাথে যোগ দেন।
পেইন্টার এক পা পিছু হটল। ডক্টর কামিংসের সাথে আমার কোনো লেনদেন নেই। তিনি এখানকার অসুস্থতার চিকিৎসা করতে এসেছিলেন, ব্যস। এর বাইরে আর কিছুই জানেন না।
ওটা সত্য নাকি মিথ্যা সেটা আমরা খুব শীঘ্রি বের করে ফেলব।
ও আচ্ছা, তাহলে এই ব্যাপার। ওদেরকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে ওদের সন্দেহজনক জ্ঞানের কারণে। হয়তো রক্ত আর কষ্টের মাধ্যমে সেই জ্ঞান বের করে নেয়া হবে। পেইন্টার এই মুহূর্তে কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করল। ধুকে ধুকে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর চেয়ে তাৎক্ষণিক মৃত্যু ভাল। টর্চার সহ্য করার ব্যাপারে ও খুব স্পর্শকাতর।
কিন্তু ও তো এখানে একা নয়। লিসার কথা মনে পড়ল, ওর হাতের সাথে লিসার হাত লেগে উষ্ণ হওয়ার কথা মনে পড়ল। যতক্ষণ ওরা বাঁচবে ততক্ষণ আশাও থাকবে।
আরও গার্ড যোগ হয়ে গুহা থেকে লিসাকে অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক বের করে নিয়ে এলো। স্নোমোবাইলের দিকে এগোল ওরা।
ক্রোর চোখে চোখ পড়ল লিসার, ওর চোখ ভয়ে জ্বলজ্বল করছে।
পেইন্টার সিদ্ধান্ত নিল, নিজের ক্ষমতার সর্বোচ্চটা দিয়ে লিসাকে রক্ষা করবে।
রওনা হওয়ার আগমুহূর্তে অ্যানা পোরেনবার্গ এলো ওদের কাছে। রওনা হওয়ার আগে কিছু কথা বলে রাখি। আমরা কিন্তু আপনাদেরকে ছেড়ে দেব না। আশা করি, আপনার বিষয়টা বুঝতে পারবেন। আমি কোনো মিথ্যা আশ্বাস দিতে পারব না। তবে আমি এতটুকু কথা দিতে পারি ব্যথাহীন, শান্তিতে আপনাদেরকে পরপারে পাঠানো হবে।
সন্ন্যাসীদের মতে, কর্কশ কণ্ঠে বলল লিসা। আপনাদের দয়ার নমুনা আমরা দেখেছি।
লিসার চোখে চোখ রাখার চেষ্টা করল পেইন্টার। এখন এদের সাথে দ্বন্দ্ব করা ঠিক হবে না। মানুষ মারতে এই হারামিদের কোনো বিবেকবোধ হয় নাকি। এখন ওদের দুজনকে বাধ্য বন্দীর মতো আচরণ করে যেতে হবে।
কিন্তু দেরি হয়ে গেছে।
অ্যানা এই প্রথম লিসাকে সামনাসামনি দেখলেন। ওর দিকে ঘুরলেন তিনি। তার কণ্ঠে উত্তাপের আঁচ সুস্পষ্ট। হ্যাঁ, দয়াই করা হয়েছে, ড. কামিংস। রাইফেলধারী লোকটির দিকে এক পলক তাকালেন। মঠে কীরকম রোগ হয়েছিল সেসম্পর্কে আপনি কিছুই জানেন না। সন্ন্যাসীদের জন্য যে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছিল সেটাও জানেন না। কিন্তু আমরা জানি। ওদের মৃত্যুকে খুন বলা যাবে না। ওগুলো স্রেফ যন্ত্রণাহীন মৃত্যু।
আপনাকে সেটা করার অধিকার কে দিয়েছে? লিসা প্রশ্ন ছুড়ল।
লিসার কাছে এগোল পেইন্টার। লিসা, হয়তো…।
না, মিস্টার ক্রো। অ্যানাও লিসার কাছে এগোল। কীসের অধিকার, তাই না? অভিজ্ঞতা, ড. কামিংস, অভিজ্ঞতা। বিশ্বাস করুন, যখন আমি আপনাকে বলব… তখন বুঝবেন ওখানকার মৃত্যুগুলো দয়া ছিল, নিষ্ঠুরতা নয়।
হেলিকপ্টারে চড়ে আমার সাথে যে সন্ন্যাসী এসেছিলেন, তাঁর বেলায়? ওটাও দয়া ছিল নাকি?
শ্বাস ফেললেন অ্যানা, শব্দ গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলেন। সিদ্ধান্তটা কঠিন ছিল তবুও নিতে হয়েছে। আমাদের কাজটা বেশি জরুরি ছিল।
আর আমরা? অ্যানা পিঠ ফিরিয়ে ঘুরতেই লিসা প্রশ্ন করল। আমরা চুপচাপ সব মেনে নিয়ে আপনার সাথে গেলে যন্ত্রণাহীন মৃত্যু। আচ্ছা, যদি আমরা না যেতে চাই, আপস না করি তাহলে?
স্নোমোবাইলের দিকে এগোলেন অ্যানা। আপনি যেমনটা ভাবছেন, আমরা আপনাদের কোনো নির্যাতন করব না। স্রেফ ড্রাগ দেব। আমরা বারবারিয়ানদের মতো নিষ্ঠুর নই, ড. কামিংস।
না, আপনারা তো নাৎসি! হিসিয়ে উঠল লিসা। আমরা স্বস্তিকা দেখেছি!
বোকার মতো কথা বলবেন না। আমরা নাৎসি নয়। সোমোবাইলে পা তুলে দিয়ে শান্ত চোখে তাকালেন তিনি। আমরা আর নাৎসি নই।
.
সন্ধ্যা ৬টা ৩৮ মিনিট।
কোপেনহ্যাগেন, ডেনমার্ক।
রাস্তা পার হয়ে দ্রুত নিলাম ভবনের দিকে এগোল গ্রে।
ফিওনা এখানে কী মনে এসেছে? ডোরম্যানের সাথে রফা করার পর কী হলো?
মেয়েটির নিরাপত্তা নিয়ে ভাবল ও। অবশ্য এটাও স্বীকার করতে হবে ফিওনার কারণেই ও এখানে সশরীরে ঢোকার একটি অজুহাত পেয়েছে। দোকানে বোমা হামলা, গ্রিট্টি নেয়ালকে খুন এবং গ্রেকে খুন করার চেষ্টা যে বা যারা করে থাকুক না কেন… সূত্র ধরে তারা এখানেও আসবে।
ফুটপাতে পৌঁছে গতি কমাল গ্রে। সূর্যের তির্যকরশ্মি নিলাম ভবনের দরজায় পড়ে ওটাকে রুপোলি আয়নায় পরিণত করেছে। সেই আয়নায় গ্রে নিজের সুন্দর পরিপাটি পোশাক আরেকবার দেখে নিল। ওকে সরু লম্বা চেকঅলা আরমানি স্যুটে বেশ ভাল মানিয়েছে। কিন্তু কলারের কাছে আঁটোসাঁটো হয়ে আছে সাদা শার্ট। গ্রে ওর হালকা হলুদ রঙের টাই-টা একটু ঠিক করে নিল।
নিজেকে লুকিয়ে রাখা চলবে না। ওকে একজন বিত্তশালী আমেরিকান ধনী ব্যক্তির চরিত্রে অভিনয় করতে হবে।
ও নিলাম ভবনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। লবির পুরোটা স্ক্যান্ডেনেভিয়ান ডিজাইনে সাজানো। এখানে সাদা রঙের কাঠ, গ্লাস দেয়া পার্টিশনসহ বিভিন্ন জিনিসের ঘাটতি আছে। লবির ভেতরে আসবাবপত্র বলতে ভাস্কর্য সাইজের একটি টেবিলের পাশে ডাকটিকেট সাইজের এই চেয়ার! ব্যস, এতটুকুই। টেবিলের ওপরে একটি অচিড় গাছের পট রাখা আছে।
