পেইন্টার বুঝল, লিসা ঠিকই বলেছে। ওরা কোনোভাবেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে না। আর এরকম বিরান অঞ্চলে চাপ আর প্রাণঘাতী ঠাণ্ডায় ওরা এমনিতেও মারা যাবে। স্নাইপারের গুলি খেলেও মরতো, এখানেও মরবে।
কিন্তু পেইন্টার আশা ছাড়তে রাজি নয়।
পাগলামো শুরু হতে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। যদি ও সেই দুই ঘণ্টা নষ্ট না করতো। যদি সময়মতো সাহায্যের ব্যবস্থা করা যেত তাহলে হয়তো কাজ হতো।
আমরা এটার ভেতর দিয়ে যাব। হালকা স্বরে বলল পেইন্টার।
লিসা বিরক্ত হলো।
কীভাবে?
ভূতুড়ে আলো আবার উদয় হতেই ক্রোর দিকে তাকাল ও। আলোর উজ্জ্বলতায় গুহা একদম হীরের মতো জ্বলে উঠল। ক্রো যতটা আংশকা করেছিল লিসার চোখে ঠিক ততটা ভয়ের ছাপ ছিল না। তবে লিসা ভয় পেয়েছে কোনো সন্দেহ নেই… বেশ ভালই ভয় পেয়েছে… শক্ত করে তাকিয়ে আছে।
আমাকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে কথা বলবে না, বলে দিলাম। ক্রোর হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে নিল লিসা।
ক্রো মাথা নাড়ল। যদি তাদের বিশ্বাস মতে, এই আলো আমাদের না মেরে ফেলে… তাহলে হয়তো আশা আছে। আর ওরা হয়তো ওই দেয়াল থেকে এই পাহাড়ের ওপর নজর রাখছে না। ঝড় শেষ হয়ে গেলে আমরা হয়তো…
হঠাৎ বন্দুকের শব্দে শীতের সুনসান নীরবতা খান খান হয়ে গেল।
লিসার চোখে চোখ পড়ল ওর।
শব্দটা বেশ কাছ থেকেই এসেছে।
সেটার প্রমাণস্বরূপ কয়েকটি গুলি এসে বরফের দেয়ালে হুমড়ি খেল। কম্বল ছেড়ে পিছু হটল ওরা। গুহার পেছন দিকে এগোল। কিন্তু পালানোর কোনো রাস্তা নেই।
এবার পেইন্টার একটি জিনিস খেয়াল করল।
অন্যবারের মতো ভূতুড়ে আলো এবার আর নিভে যায়নি। চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বলতা নিয়ে জমাট বাঁধা ঝরনাধারা দীপ্তি ছড়াচ্ছে। স্থির করে আলো ধরা আছে ওদের দিকে।
বুলহর্ন (হ্যান্ড মাইক) থেকে আওয়াজ ভেসে এলো। পেইন্টার ক্রো! আমরা জানি আপনি আর সেই মহিলা ওখানে লুকিয়ে আছেন! নারীকণ্ঠ থেকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। উচ্চারণে বিদেশি টান।
হাত উঁচু করে বেরিয়ে আসুন।
লিসার কাঁধে চাপ দিয়ে যতটুকু সম্ভব ভরসা দেয়ার চেষ্টা করল পেইন্টার এখানেই থাকো।
খুলে রাখা পোশাকের দিকে ইশারা করে দেখাল ও, পোশাক পরে নিতে বলল লিসাকে। ক্রো নিজের জুতো পরে বরফের দেয়ালের ভাঙ্গা অংশ দিয়ে মাথা বের করল।
পাহাড়ি অঞ্চলে যেমনটা হয়ে থাকে, ঝড় এই হামলে পড়ে আবার এই নেই! এখানেও একই অবস্থা। কালো আকাশে যেন তারার হাট বসেছে।
রাতের অন্ধকারকে ঝেটিয়ে বিদেয় করেছে হাতের কাছে থাকা একটি স্পটলাইট। জমাট বাঁধা বরফের দেয়ালের ঠিক মাঝ বরাবর ওটাকে তাক করে রাখা হয়েছে। ১৫০ ফুট দূরে একটি নিচু উপত্যকায় স্নোয়মাবাইলের (বরফের ওপর দিয়ে চলাচলের জন্য বিশেষ বাহন, অনেকটা জেট স্কির মতো) উপরে একটি অবয়ব বসে আছে। সার্চলাইট চালাচ্ছে সে। একদম সাধারণ লাইট। তবে এর তীব্রতা আর আভা দেখে মনে হয় গ্যাস ব্যবহার করে এটাকে জ্বালানো হয়।
এটা কোনো রহস্যময় ভূতুড়ে আলো নয়।
স্বস্তির পরশ পেল পেইন্টার। এই আলোই তো জ্বলত সবসময়, বাহনগুলো আসার জন্য সংকেত দিন? ৫টি বাহন আছে, গুনল ও। সাদা পারকা পরা লোকজনগুলোকেও শুনে ফেলল। দুপাশেই ছড়িয়ে সবাই। সবার হাতে রাইফেল।
কোনো উপায় না দেখে… নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও পেইন্টার গুহা থেকে হাত উঁচু করে বেরিয়ে এলো। কাছে থাকা রাইফেলধারী লোকটি রীতিমতো দৈত্যাকার। অস্ত্র তাক করে ওর দিকে এগিয়ে এলো। আলোর ছোট্ট বিম এসে পড়ল পেইন্টারের বুকে। লেজার লাইট, গুলি ছুড়লে ওখানে এসেই লাগবে।
পেইন্টার নিরস্ত্র অবস্থায় এদের সাথে পেরে উঠতে পারবে না। রাইফেলধারী ব্যক্তিকে মনে মনে মেপে নিল ও।
না, সুবিধে হলো না।
লোকটির চোখে চোখ পড়ল ওর।
এক চোখ বরফ নীল, অন্য চোখ ধবধবে সাদা।
মঠের সেই আক্রমণকারী!
এই লোকের গায়ে অসুরিক শক্তি আছে, ওর মনে পড়ল। না, এরকম অস্বাভাবিক ঘটনা তো ভাল নয়। তার ওপর এরা সংখ্যায় অনেক বেশি। সফল হওয়া তো দূরে থাক পেইন্টারের কিছু করারই সুযোগ নেই।
লোকটির পেছন থেকে একজন সামনে এগিয়ে এল। মহিলা। হয়তো ইনিই একটু আগে বুলহর্নে কথা বলেছিলেন। সামনে এগিয়ে মাত্র এক আঙুল ব্যবহার করে রাইফেলকে নিচু করে দিলেন তিনি। মহিলার এরকম ক্ষমতা দেখে পেইন্টার অবাক হলো।
তিনি সামনে এগিয়ে এলেন, পেইন্টার তাকে স্পটলাইটের তীব্র আলোতেই দেখে নিল। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। কালো চুল, বব-কাট দেয়া, চোখগুলো সবুজ। পশমি হুডঅলা ভারী পারকা পরে আছেন তিনি। পোশাকের কারণে তার শারীরিক অবয়ব ঢাকা পড়ে গেছে তবে তার চলন দেখে মনে হলো তিনি বেশ সুতী ও সাবলীল।
ডক্টর অ্যানা স্পোরেনবার্গ, এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে পরিচয় দিলেন তিনি। তাঁর গ্লোভস পরা হাতের দিকে তাকাল ক্রো। এই মহিলাকে টান দিয়ে এর যদি গলায় হাত প্যাচিয়ে ধরি, একে জিম্মি করে ফায়দা,…
কিন্তু মহিলার পেছনে দাঁড়ানো আততায়ীর চোখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু ভাবল না ও। মহিলার সাথে হাত মেলাল। যত যা-ই হোক, ওরা এখনও তো ওকে গুলি করেনি, ভদ্রতা করা যেতেই পারে। যতক্ষণ বেঁচে থাকতে পারবে এই খেলা চালিয়ে যাবে ও। শুধু তাই নয়, লিসার কথাও ওকে ভাবতে হবে।
ডিরেক্টর ক্রো, বললেন অ্যানা। আপনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন এটা নিয়ে বিগত কয়েক ঘণ্টায় সেটা নিয়ে আন্তর্জাতিক ইন্টেলিজেন্স চ্যানেলগুলোতে বেশ হইচই হয়ে গেছে।
