কিন্তু তবুও একটা অপরাধবোধ ওকে ভোগাচ্ছে, শান্ত-স্থির হতে দিচ্ছে না। বিকেলের অধিকাংশ সময় নিজের রুমে হাঁটাহাঁটি করে কাটিয়েছে ও। বিগত দিনগুলো বারবার ওর মানসপটে ফুটে উঠেছে। শুরু থেকেই আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল… আর সাবধানতা অবলম্বন…।
পকেটে গ্রের সেল ফোন কেঁপে উঠল। বের করে নাম্বার চেক করল ও। বাঁচা গেল। ফোন রিসিভ করে বারান্দার রেইলিঙের কাছে গেল ও।
র্যাচেল… তুমি ফোন করেছ দেখে খুশি হয়েছি।
তোমার মেসেজ দেখলাম। তুমি ঠিক আছে তো?
র্যাচেলের কণ্ঠে ব্যক্তিগত ও পেশাদার দুটো বিষয় নিয়েই আগ্রহের সুর পেল ও। মেসেজে লিখেছিল, ওদের হয়তো সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দেখা হবে। বিস্তারিত কিছু লেখেনি। যতই প্রেম করুক, পেশাদারিত্বের খাতিরে নিরাপত্তাজনিত কিছু জিনিস মেনে চলতেই হয়।
আমি ভাল আছি। কিন্তু কথা হলো, মনক আসছে। মাঝরাতের পর পর এখানে এসে পৌঁছুবে।
আমি এইমাত্র ফ্রান্কফ্রুটে এলাম, বলল র্যাচেল। কোপেনহ্যাগেনে ল্যান্ড করেই মেসেজ চেক করেছি।
আমি সত্যিই দুঃখিত…।
তাহলে আমি ফিরে যাব?
র্যাচেলকে কোনোভাবেই এখানে জড়ানো যাবে না। সেটাই ভাল হবে। আমরা নাহয় অন্য কোনো সময় দেখা করব। এখানকার পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হোক। আচ্ছা, ফেরার পথে আমিই নাহয় একবার রোমে নামব। তোমার সাথে দেখা করব তখন।
খুশি হব।
র্যাচেলের কণ্ঠে হতাশার সুর পরিষ্কার টের পেল গ্রে।
কথা দিলাম… দেখা করব, গ্রে বলল। মনে মনে আশা করল, এই প্রতিজ্ঞা যেন, সে রাখতে পারে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল র্যাচেল, বিরক্তিতে নয়, পরিস্থিতি মেনে নিয়ে। ওদের সম্পর্কটা বেশ দূরের। দুজন দুই দেশে থাকে, দুটো ভিন্ন ক্যারিয়ার। কিন্তু তবুও ওরা সম্পর্কটা চালিয়ে যেতে চায়। দেখতে চায়… এই সম্পর্ক কোথায় নিয়ে যায় ওদের।
আমি ভেবেছিলাম আমরা একটু কথা বলার সুযোগ পাব, র্যাচেল বলল।
র্যাচেলের এই শব্দগুলোর পেছনে থাকা গভীর অর্থ গ্রে অনুধাবন করতে পারল। ওরা দুজন একে অন্যের বেশ কাছাকাছি সময় কাটিয়েছে, দুজন দুজনার ভাল দিক, মন্দ দিক সম্পর্কে জানে। তবে দূরতুযুক্ত এই রোমান্টিক সম্পর্কে কেউ আগবাড়িয়ে নিজের মনের আসল কথা বলতে রাজি নয়। ওরা দুজনই জানে পরবর্তী ধাপ নিয়ে ওদের আলোচনা করা উচিত।
আলোচনা ওদের এই দূরত্ব কমিয়ে আনতে পারে।
ওদের সর্বশেষ দেখা হয়েছে অনেক দিন আগে, মাঝের এতদিনের দেখা না হওয়াটাই হয়তো এই ধরনের আড়ষ্টতার জন্য দায়ী। কিছু না বলা কথা নিয়ে ওরা দুজনই ভেবেছে। এখন সময় এসেছে, এগুলো জানাতে হবে।
আরও সামনে এগোবে নাকি এগোবে না।
আচ্ছা, গ্রে নিজের উত্তর জানে তো? র্যাচেলও ভালবাসে। ওকে নিয়ে জীবন শুরু করতে একদম প্রস্তুত। এমনকী ওরা বাচ্চা নিয়েও কথা বলেছে। কিন্তু তবুও… কী যেন ওকে বাগড়া দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, ওদের আর এসবের সময় নেই, দেরি হয়েছে। অনুভূতিটা কেমন যেন অদ্ভুত, আলাদা। পার্থিব অন্য অনুভূতির সাথে একদমই মেলে না।
হয়তো ওদের দুজনের কথা বলা উচিত।
রোমে আসব, বলল গ্রে। প্রমিস করলাম।
ঠিক আছে, আমি কিন্তু তোমার জন্য চুলোয় রান্না তুলে দিয়ে অপেক্ষা করব! গ্রে টের পেল র্যাচেলের কণ্ঠ থেকে দুশ্চিন্তার সুর মিলিয়ে যাচ্ছে। আমি তোমাকে মিস করি গ্রে। আমরা…।
গাড়ির কর্কশ হর্নের কারণে ওর কথার বাকি অংশ গ্রে শুনতে পেল না।
নিচের রাস্তার দিকে তাকাল গ্রে। একজন নারী চলমান গাড়ির ভেতর দিয়ে দুই লেন দৌড়ে পার হচ্ছে। পরনে কাশিরী জ্যাকেট ও পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ঝুলে থাকা পোশাক। চুল খোঁপা করা। গ্রে প্রায় চিনতেই পারছিল না। কিন্তু হর্ন বাজানো ড্রাইভারের দিকে ঘুরে তাকাতেই চিনতে পারল।
ফিওনা।
এই মেয়ে এখানে কী করছে?
গ্রে…? র্যাচেল ফোনে বলল।
হড়বড় করে জবাব দিল গ্রে। আমি দুঃখিত… র্যাচেল… আমাকে যেতে হচ্ছে।
ফোন কেটে দিয়ে পকেটে ভরল।
নিচে ফিওনা নিলাম ভবনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। নিজের ল্যাপটপের কাছে ফিরল গ্রে। ওর ক্যামেরা মেয়েটির ছবি তুলে নিয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ভেতরে ডোরম্যানের সাথে তর্ক করছে ফিওনা। ডোরম্যানের হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিল সে। লোকটি কাগজ পরীক্ষা করল, উঁকুটি করে ভেতরে যাওয়ার জন্য ইশারা করল ওকে।
ডোরম্যানকে পেরিয়ে ঝড়ের বেগে ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল ফিওনা। তারপর ক্যামেরায় সব অন্ধকার।
একবার ল্যাপটপ আরেকবার রাস্তার দিকে তাকাল গ্রে।
ধেৎ..
আচ্ছা, পেইন্টার ক্রো হলে কী করতেন?
ভেতরে ঢুকে নিজের পোশাক বের করল ও। ওর স্যুট জ্যাকেট বিছানায় রাখা আছে। জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহার করার জন্য রেখে দিয়েছিল।
এরকম পরিস্থিতিতে পেইন্টার নিশ্চয়ই চুপচাপ হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতেন না।
.
সকাল ১০টা ২২ মিনিট।
হিমালয়।
আমাদেরকে শান্ত থাকতে হবে, বলল পেইন্টার। চুপ করে বসে থাকো।
ওদের সামনে ভূতুড়ে আলো উদয় হলো… আবার নিভে গেল। জমাট বাঁধা ঝরনাধারাকে প্রবল আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আবার ঢেকে দিল ঘন কালো অন্ধকারে। চারদিকে ঠাণ্ডা, সুনসান নীরবতা।
পেইন্টারের আরও কাছে ঘেঁষল লিসা। হাত ধরল ক্রোর। এতটাই শক্ত করে ধরল যে ক্রোর হাতের তালুতে রক্ত চলাচলে বিঘ্ন ঘটল।
ভাবনার কিছু নেই, আমাদেরকে ওরা খুঁজবে না, ভয়ে ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছে না লিসা। ফিসফিস করে বলল, এই ঝড়ের ভেতরে কেন আমাদের খুঁজতে আসবে? ওই ভয়ঙ্কর আলো দিয়েই তো আমাদেরকে শেষ করে দিতে পারবে। আলো থেকে তো আর আমরা বাঁচতে পারব না।
