আর এখন ওরা সেই অভিশপ্ত ভূমিতেই অবস্থান করছে।
একদম কাছে।
পেইন্টার দেখল চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বলতায় বরফ জমা ঝরনাধারা আবার প্রজ্জ্বলিত হলো। ভূতুড়ে আলো ফিরে এসেছে।
০৫. সামথিং রটেন
০৫. সামথিং রটেন
সন্ধ্যা ৬টা ১২ মিনিট।
কোপেনহাগেন, ডেনমার্ক।
ইউরোপে কোনো কিছুই কী সঠিক সময়ে শুরু হয় না?
হাতঘড়ি দেখল গ্রে।
নিলাম শুরু হওয়ার কথা ৫ টায়।
এখানে বাস, ট্রেন বেশ ভালই পাওয়া যায় কিন্তু যদি ঠিক সময়ে কোনো অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ আসে তখন ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। এক ঘণ্টা লেট। ৬টারও বেশি বাজে এখন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠান শুরু হবে সাড়ে ৬টায়। উত্তর সাগরে ঝড় হওয়ার কারণে অনেকে দেরি করে আসছে। সাগরের বৈরি আবহাওয়ার কারণে কোপেনহ্যাগেনে আসতে দেরি হয়েছে প্লেনগুলোর।
নিলামে অংশগ্রহণকারী বিডাররা (ক্রেতা) এখনও আসছে ধীরে ধীরে।
সূর্য কোপেনহ্যাগেনের আকাশ থেকে বিদেয় নিতেই স্ক্যানডিক হোটেল ওয়েবারস-এর তিনতলার বারান্দায় এসে দাঁড়াল গ্রে। Ergenschein Auction House এর রাস্তার অপর পাশেই এটার অবস্থান। চার তলা ভবনের এই নিলাম অফিসটিকে আর্ট গ্যালারি বলে মনে হয়। আধুনিক ডেনিশ ছিমছাম স্টাইল, সবকিছু গ্লাস আর সাদা রঙের কাঠ দিয়ে সাজানো। চার তলা ভবনের নিচতলায় নিলাম অনুষ্ঠিত হবে।
শীঘ্রি শুরু হবে, আশা করা যায়।
হাই তুলে আড়মোড়া ভাঙল গ্রে।
কিছুক্ষণ আগে ওর আগের হোটেলে গিয়ে নজরদারির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে এসেছে। আসার সময় চেক-আউট করেছে হোটেল থেকে। তারপর নতুন নাম আর মাস্টারকার্ড নিয়ে এই হোটেলে রুম বুক করেছে ও। এই রুম থেকে কোপেনহ্যাগেনের সিটি স্কয়ারের বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো পার্কগুলোর মধ্যে অন্যতম টিভলি গার্ডেনস এই হোটেল থেকে খুব বেশি দূরে নয়। ওখান থেকে ভেসে আসা গান ও হাসাহাসি শোনা যায় ওর বারান্দা থেকে।
রাস্তার পাশের দোকান থেকে একটি হট ডগ কিনে এনেছিল গ্রে। খোলা ল্যাপটপের পাশে ওটা আধ-খাওয়া অবস্থায় পড়ে আছে। সারাদিনে এই হট ডগ ছাড়া আর কিছু খায়নি ও। মানুষ মনে করে, ওর মতো এজেন্টরা বিভিন্ন অভিজাত ক্যাসিনো ঘুরে বেড়ায় আর রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া করে। ভুল। ওগুলো স্রেফ গুজব। হট ডগ কিনতে গিয়ে আমেরিকান ডলারে ওর খরচ হয়েছে ৫ ডলার। গলা কাটা দাম নিলেও খেতে ভালই ছিল।
মোশন সেনসেটিভ ক্যামেরা দ্রুত কয়েকটি ছবি তুলতেই ল্যাপটপের স্ক্রিন কেঁপে উঠল। নিলামে অংশগ্রহণকারী প্রায় দুই ডজন ব্যক্তির ছবি ও ইতোমধ্যে তুলে ফেলেছে। যেমন : ব্যাংকার, হাস্যউজ্জ্বল ইউরোপীয়, চকচকে স্যুট পরা তিন জন ভদ্রলোক–দেখেই বোঝা গেল এরা মাফিয়া, এক বেটে-খাটো মহিলা-অধ্যাপিকা হবে হয়তো এবং সাদা রঙের দামি পোশাক পরা চার জোড়া ব্যক্তি–ওদের প্রত্যেকের মাথায় নাবিকদের মতো ক্যাপ আছে। শেষের কয়েকজন আমেরিকান ভাষায় কথা বলল। বেশ উচ্চস্বরে।
গ্রে মাথা নাড়ল।
সম্ভবত লোকজন যা আসার এসে পড়েছে। আর খুব একটা বাকি নেই।
নিলাম ভবনের সামনে একটি লম্বা লিমুজিন এসে থামল। নামল দুজন। দুজনই হালকা-পাতলা, বেশ লম্বা। ম্যাচিং করে দুজন আরমানি কালো স্যুট পরেছে। একজন পুরুষ অন্যজন নারী। পুরুষটি রবিন পাখির ডিমের ছবিঅলা নীল টাই পরে আছে। অন্যদিকে তার সঙ্গিণীর পরনে আছে সিল্কের রাউজ, ওটাও নীল। দুজনের বয়সই কম, ঊর্ধ্বে ২৫ বছর হবে। কিন্তু তাদের হাবভাব দেখে মনে হলো তারা নিজেদেরকে তারচেয়েও বেশি বয়স্ক হিসেবে উপস্থাপন করতে চাচ্ছে। ওদের দেখতে নির্বাক যুগের সিনেমার তারকার মতো লাগল। টগবগে বয়স। মুখে কোনো হাসি নেই, আবার গম্ভীর করেও রাখেনি। ছবিতে দেখা গেল তাদের চোখে স্বাভাবিক সৌহার্দ্যপূর্ণ ছাপ আছে।
ডোরম্যান ওদের জন্য দরজা টেনে ধরল।
ডোরম্যানকে মাথা ঝাঁকিয়ে ধন্যবাদ দিল ওরা… পরিমিত ভঙ্গিতে, কোনোরকম আদিখ্যেতা ছাড়া। ভেতরে ঢুকল ওরা। ওদের পেছন পেছন ডোরম্যানও ঢুকে পড়ল। বোঝা গেল, এই দম্পতির পর আর কেউ আসবে না। এমনও হতে পারে, এদের জন্যই নিলাম অনুষ্ঠান এতক্ষণ দেরি করা হয়েছে।
এরা কারা?
কৌতূহল দমন করল গ্রে। লোগান গ্রেগরি মানা করেছেন।
গ্রে ভোলা ছবিগুলো আবার চেক করল। দেখে নিল অংশগ্রহণকারী সবার চেহারা স্পষ্টভাবে উঠেছে কি-না। সন্তুষ্ট হয়ে ফাইলগুলো একটি পেন-ড্রাইভে নিয়ে ওটা পকেটে রেখে দিল। এখন ওকে এই নিলাম অনুষ্ঠান শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। যেসব জিনিস বিক্রি হয়ে যাবে সেগুলোর নাম ও ক্রেতার তালিকা যোগাড় করার ব্যবস্থা লোগান করে রেখেছেন। ওর মধ্যে কয়েকটি ছদ্মনাম থাকবে, বলাই বাহুল্য। তবে এই তথ্যগুলো ইউ.এস টাস্ক ফোর্স ও প্রয়োজনে ইউরোপোল ও ইন্টারপোলকে দেয়া হবে। এখানকার আসল ঘটনা হয়তো গ্রের আর কখনও জানা হবে না।
যেমন : কেন ওকে আক্রমণ করা হয়েছিল? গ্রিট্টি নেয়াল কেন খুন হয়ে গেলেন?
নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করেছিল গ্রে। পুরো বিকেল লেগে গেল এই কাজে, কিন্তু মনের অস্থিরতা কমল। লোগান ওকে শান্ত থাকতে বলেছেন, বিষয়টি মেনে নিতে শুরু করল ও। এখানে কী হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে ওর কোনো ধারণা নেই। অন্ধের মতো কিছু করতে গেলে হয়তো আরও লোকজন মারা পড়বে।
