আং গেলুকে বড় কাস্তে নিয়ে আক্রমণ করা রেলু নাআর কথা মনে পড়ল লিসার। সেই পাগল সন্ন্যাসীর চোখেও এই একই অবস্থা দেখেছিল ও। ঠাণ্ডা শিরশিরে স্রোত বয়ে গেল ওর অনাবৃত চামড়া দিয়ে।
লোকটির অন্য চোখ লক্ষ করল লিসা। দুটো চোখ দুরকম।
একটির মণি নীল।
অন্যটি ধবধবে সাদা।
হয়তো ক্যামেরার ফ্ল্যাশের জন্য এটা কেমন দেখাচ্ছে।
শুরুর দিকে ভোলা ছবিগুলোর দিকে এগোল লিসা।
ভূগর্ভস্থ সেলারের ছবিগুলোর আগে তোলা সর্বশেষ ছবি এটা। রক্ত দিয়ে লেখা একটি দেয়ালের ছবি। ও এই ছবিটির কথা ভুলেই গিয়েছিল।
কী এটা? জানতে চাইল ক্রো।
লামা খেমসারের দুঃখজনক ঘটনা ইতোমধ্যে ওকে জানিয়েছে লিসা। বৃদ্ধ সন্ন্যাসী এগুলো দেয়ালে লিখেছিলেন। কয়েকটি চিহ্নকে বারবার ব্যবহার করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
পেইন্টার একটু সামনে ঝুঁকল। জুম করো তো।
লিসা জুম করল।
ভ্রু কুঁচকালো পেইন্টার। এটা তিব্বতিয়ান কিংবা নেপালি অক্ষর নয়। চিহ্নগুলো কেমন যেন আড়ষ্ট। দেখে মনে হচ্ছে স্ক্যান্ডেনেভিয়ান প্রাচীন বর্ণ কিংবা ওরকম কিছু একটা হতে পারে।
তোমার তা-ই মনে হয়?
বললাম তো, হতে পারে। ক্লান্ত হয়ে পিঠ টান দিল ক্রো। তাছাড়া, হয়তো লামা খেমসার যা জানতে চেয়েছিলেন তার চেয়েও বেশি জানতেন।
পেইন্টারকে একটি ব্যাপার জানাতে ভুলে গিয়েছিল ও। বৃদ্ধ সন্ন্যাসী নিজের গলা কেটে ফেলার পর আমরা তার বুকে একটি অঙ্কিত চিহ্ন দেখেছিলাম। পাগলামী কিংবা কাকতালীয় ভেবে আমি ওটাকে গুরুত্ব দেইনি কিন্তু এখন মনে হচ্ছে…
ওটা দেখতে কেমন ছিল? এঁকে দেখাতে পারবে?
অত কিছুর দরকার হবে না। স্বস্তিকা চিহ্ন ছিল।
ভ্রু উঁচু করল পেইন্টার। স্বস্তিকা?
তাই তো দেখলাম। এমনও তো হতে পারে তিনি অতীত রোমন্থন করছিলেন। যে জিনিসটা ভয় পাইয়ে দিয়েছিল সেটা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিলেন, হতে পারে না?
আং গেলুর আত্মীয় রেলু নাআর কাহিনি শুনাল লিসা। মাওবাদী বিদ্রোহীদের কাছ থেকে কীভাবে পালিয়েছিল, নিরপরাধ চাষীদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নিয়েছিল তারা, রেল তাদের বর্বরতা মেনে নিতে পারেনি। অথচ পরবর্তী রে নাআ সেই কাজই করেছিল। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে অপ্রকৃতিস্থের মতো আচরণ করেছিল সে।
লিসার বলা শেষ হলে ভ্রু কুঁচকে রইল পেইন্টার। লামা খেমসারের বয়স আনুমানিক ৭৫ বছর হবে। সে হিসেবে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি কিশোর ছিলেন। ওদিক দিয়ে বিচার করলে স্বস্তিকার ব্যাপারটা ঠিকই আছে। নাৎসিরা হিমালয়ে রিসার্চ অভিযান চালিয়েছিল।
এখানে? কেন?
শ্রাগ করল পেইন্টার। হেনরিক হিমল্যারকে দিয়ে কাহিনি শুরু করতে হবে। এসএস এর প্রধান, গুপ্ত কিছুর ব্যাপারে বদ্ধপরিকর ছিল সে। হাজার বছরের পুরোনো লিপি ঘেটে জেনেছিল এটা আর্যদের জন্মস্থান। সেই বিশ্বাস নিয়ে হারামজাদা নাসি এখানে অভিযান পাঠালো, প্রমাণ সংগ্রহ করবে। ঘোড়ার ডিম ছাড়া আর কিছু পায়নি সেটা বলাই বাহুল্য।
হাসল লিসা। হয়তো বৃদ্ধ লামা তখন সেই অভিযানের সাথে কোনোভাবে জড়িত। ছিলেন। হয়তো গাইড হিসেবে কাজ করেছিলেন কিংবা অন্যকিছু।
হতে পারে। কিন্তু আমরা আর সেটা জানতে পারব না। গোপন যা-ই কিছু হয়ে থাক, তিনি মারা যাওয়ার সাথে সাথে সেগুলোও হারিয়ে গেছে।
হয়তো না। হয়তো তিনি তার রুমে কিছু একটা করার চেষ্টা করছিলেন। তার কিছু। হতে পারে তার অজ্ঞাতেই তার মন তাকে দিয়ে গোপন কিছু প্রকাশ করতে চাচ্ছিল।
অনেক হয়তো রয়ে যাচ্ছে, কপালে হাত বুলাল ক্রো। আমি আরও একটা হয়তো যোগ করি। হয়তো এগুলোর সবই স্রেফ পাগলামী।
এর বিপরীতে আপত্তি তোলার মতো কিছু পেল না লিসা। শ্বাস ফেলে প্রসঙ্গ : পরিবর্তন করার চেষ্টা করল। যথেষ্ট গরম হয়েছ তো?
হ্যাঁ, ধন্যবাদ।
হিটার বন্ধ করল ও। বুটেন গ্যাস অপচয় করা যাবে না।
মাথা নাড়ল ক্রো, হাই উঠছিল ওর, ঠেকানো চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো।
আমরা বরং একটু ঘুমিয়ে নিই, বলল লিসা। পালা করে ঘুমাব।
.
কয়েক ঘণ্টা পর উঠল পেইন্টার। কেউ একজন ওর কাধ ধরে ঝাঁকাচ্ছে। দেয়ালের। সাথে ঠেস দিয়ে ঘুমিয়েছিল, সোজা হয়ে বসল এখন। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সামনে থাকা বরফের দেয়ালে যেন আলকাতরা মেখে দেয়া হয়েছে।
তবে ঝড় মনে হয় থেমে গেছে।
কী সমস্যা? ক্রো প্রশ্ন করল।
কম্বলের এক অংশ ফেলে দিল লিসা।
এক হাত দিয়ে ইশারা করে ফিসফিস করে বলল, দাঁড়াও।
ঘুম তাড়িয়ে লিসার আরও কাছে ঘেঁষল ও। আধা মিনিট অপেক্ষা করল। ঝড় থেমে গেছে, নিশ্চিত। বাতাসের গর্জনও নেই। গুহার বাইরে পর্বত আর উপত্যকা জুড়ে সুনসান নীরবতা। সন্দেহজনক কোনো কিছু শোনার জন্য কান খাড়া করল ও।
নিশ্চয়ই কিছু একটা লিসাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে।
ক্রো ওর মনের ভয় অনুভব করতে পারল। কারণ লিসা ভয়ে রীতিমতো কাঁপছে।
লিসা, কী হয়েছে…
হঠাৎ করে বরফের দেয়াল উজ্জ্বল আলোয় জ্বলে উঠল। মনে হলো বাইরের আকাশে আতশবাজির খেলা হচ্ছে। তবে কোনো আওয়াজ নেই। আমোর ঝালর কিছুক্ষণ থেকে তারপর বিলীন হয়ে গেল। সব আবার অন্ধকার।
ভূতুড়ে আলো… ফিসফিস করল লিসা। তাকাল ক্রোর দিকে।
তিন রাত আগের কথা ভাবল ক্রো। তখন থেকেই তো শুরু। গ্রামের অসুস্থতা, মঠে পাগলামী। লিসার অনুমানের কথা মনে পড়ল ওর। এই আলোর সাথে অসুস্থতার লক্ষণের সরাসরি সম্পর্ক আছে।
