ধন্যবাদ, বলল পেইন্টার। এইমাত্র তুমি হয়তো আমাদের জীবন বাঁচালে।
শ্রাগ করল লিসা, অন্যদিকে তাকাল। তোমার কাছে আমি ঋণী ছিলাম।
মুখে যতই গম্ভীরভাবে জবাব দিক না কেন ক্রোর কথাগুলো ওর কাছে কেমন যেন উষ্ণ মনে হলো… ও যতখানি আশা করেনি তার চেয়েও বেশি ছুঁয়ে গেল কথাগুলো।
তুমি কীভাবে জানলে এভাবে খুঁজলে… বাক্য শেষ করতে পারল না সজোরে হাঁচি দিল ক্রো। ওউ।
লিসা নিজের প্যাক নামাল। প্রশ্ন পরে হবে। আমাদের দুজনের উষ্ণতা বাড়ানো দরকার।
মেডিক্যাল প্যাক খুলে একটি এমপিআই ইনস্যুলেটিং কম্বল বের করল ও। জিনিসটা পাতলা হলেও এর অ্যাসট্রলার কাপড় শরীর থেকে নির্গত তাপের নব্বই শতাংশ তাপমাত্রা ধরে রাখতে পারে। তবে লিসা অবশ্য শুধু নিজেদের শরীরের তাপমাত্রার ওপরেই নির্ভর করছে না।
ছোট একটি হিটার বের করল ও, পর্বতারোহণের জন্য এই জিনিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বোসো, পেইন্টারকে নির্দেশ করল লিসা। ঠাণ্ডা পাথরের ওপর কম্বলটিকে বিছিয়ে দিল।
ঠাণ্ডায় পেইন্টারের অবস্থা শোচনীয়, কোনো আপত্তি করল না।
লিসাও ওর সাথে যোগ দিয়ে ওদের দুজনের ওপরে কম্বল টেনে নিল। কম্বলের ভেতরে বসেই কোলম্যান স্পোর্ট-ক্যাট হিটারের ইলেকট্রনিক সুইচ অন করল ও। বুটেন গ্যাসের ছোট্ট সিলিন্ডার দিয়ে চলবে এই হিটার। ১৪ ঘণ্টার মতো টিকবে। পরিমিত পরিমাণে ব্যবহার করলে এই সিলিন্ডার দিয়ে সামনের দুই/তিন দিন থাকতে পারবে ওরা।
হিটার গরম হচ্ছে। লিসার পাশে থাকা পেইন্টার কেঁপে উঠল।
জুতো আর গ্লোভস খোলো, ক্রোকে খুলতে বলে নিজেও খুলল। হিটারের গরমে হাতগুলোকে সেঁকে নাও, হাতের আঙুল, পায়ের আঙুল, নাক, কান ম্যাসাজ করো।
ফ্র… ফ্রস্টবাইট থেকে বাঁচার জন্য…
মাথা নাড়ল লিসা।
নিজের শরীর আর পাথরের মাঝে যতটা সম্ভব কাপড় রাখো, যাতে শরীরের তাপমাত্রা পাথরে চলে না যায়।
আস্তে আস্তে গুহার তাপমাত্রা সুন্দর উষ্ণ হতে লাগল।
আমার কাছে কয়েকটা পাওয়ারবার আছে, বলল লিসা। তুষার গলিয়ে পানি পেতে পারি আমরা।
একদম পাক্কা খেলোয়ার! বলল পেইন্টার। শরীর উষ্ণ হতেই কথায় জোর ফিরে পাচ্ছে।
কিন্তু এসবের কিছুই কিন্তু বুলেট ঠেকাতে পারবে না। লিসা বলল। পেইন্টারের দিকে তাকাল ও কম্বলের নিচে নাকের সাথে নাক ছুঁই ছুঁই অবস্থা।
শ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল ক্রো। ওরা ঠাণ্ডার প্রকোপ থেকে রক্ষা পেলেও বিপদ থেকে এখনও উদ্ধার পায়নি। কিন্তু কীভাবে কী করবে? যোগাযোগ করার কোনো রাস্ত ইি নেই ওদের। হাতে কোনো অস্ত্রও নেই।
আমরা লুকিয়ে থাকব, বলল পেইন্টার। মঠে যারা বোমা মেরে আগুন ধরিয়েছে ওরা আমাদেরকে এতদূর পর্যন্ত খুঁজে বের করতে পারবে না। ঝড় কেটে গেলে উদ্ধারকারীরা আসবে। আশা করা যায় হেলিকপ্টার থাকবে তাদের সাথে। রোড ফ্লেয়ার দিয়ে আমরা তাদেরকে সংকেত দিতে পারব। তোমার ইমার্জেন্সি প্যাকে রোড ফ্লেয়ার আছে, আমি দেখেছি।
কামনা করি, অন্যরা আসার আগেই যেন উদ্ধারকারীরা এখানে পৌঁছায়।
লিসার হাঁটুতে হাত রাখল ক্রো। লিসা ওর এই আচরণে খুশি। ক্রো ওকে অন্তত কোনো মিথ্যে আশ্বাস দেয়ার চেষ্টা করেনি। ওরা ফুলশয্যায় নেই, ঘোর বিপদে আছে। ক্রোর হাত ধরল লিসা, শক্ত করে। আশ্বাস দেয়ার চেষ্টা।
চুপচাপ রইল ওরা, যে যার নিজস্ব চিন্তায় ডুবে গেছে।
তোমার কী মনে হেয়, ওরা কারা? নরম স্বরে জানতে চাইল লিসা।
জানি না। তবে ওই লোকটিকে শুইয়ে ফেলার সময় শুনলাম সে জার্মান ভাষায় কী যেন শপথ করল।
জার্মান? তুমি নিশ্চিত?
আমি কোনো কিছুতেই নিশ্চিত নই। তবে লোকটা হয়তো ভাড়া করা সৈনিক। অবশ্যই ওর কিছু মিলিটারি ট্রেইনিং নেয়া ছিল।
দাঁড়াও, লিসা বলল। নিজের প্যাক নাড়াচাড়া করল ও। আমার ক্যামেরা।
ক্রো সোজা হয়ে বসে রইল। কম্বলের এক অংশ সরে যাওয়ায় কাঁপছে। কম্বল টেনে নিয়ে লিসার আরেকটু কাছ ঘেঁষে বসল। যাতে কম্বল দিয়ে দুজনেই নিশ্চিন্তভাবে ঢেকে থাকা যায়। তোমার কী মনে হয়, তুমি ওর কোনো ছবি তুলেছ?
ঘন ঘন ফ্ল্যাশ করার জন্য আমি ক্যামেরাকে একের পর এক ছবি ভোলার অপশনে সেট করেছিলাম। ওই মোডে ডিজিটাল এসএলআর ক্যামেরা প্রতি সেকেন্ডে ৫টা করে ফ্রেম তোলে। জানি না, কী উঠেছে। ক্যামেরা ঠিকঠাক করতে করতে বলল ও।
ওদের দুজনের কাঁধের সাথে কাঁধ ঠেকে আছে। ক্যামেরা এলসিডি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে ওরা। লিসা শেষ ছবিগুলো ওপেন করল, অধিকাংশই অস্পষ্ট। ছবিগুলো একের পর এক দেখে যাওয়ার ফলে মনে হলো ওরা ওদের পালানোর স্লো-মোশন ভিডিও দেখছে। বিস্মিত আক্রমণকারী ফ্ল্যাশের আলো থেকে নিজের চোখ বাঁচানোর জন্য নিজের হাত তুলল, ব্যারেলের আড়ালে লিসা লুকিয়ে পড়তেই গুলি ছুড়ল সে, পেইন্টার ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর।
কয়েকটি ছবিতে লোকটির চেহারার অংশ বিশেষ উঠেছে। ওগুলোকে জোড়া দিয়ে মোটামুটি যে চেহারা পাওয়া গেল: সোনালি-সাদা চুল, কপালটা দেখতে পাশবিক, চোয়াল উন্নত। আক্রমণকারী আর পেইন্টার যখন শুয়ে ধস্তাধস্তি করছিল শেষ কয়েকটি ছবি সম্ভবত তখন উঠে যায়। লোকটির চোখের ক্লোজ-আপ ছবি পেল লিসা। নাইট ভিশন চশমা কানের উপরে সরে গেছে। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে লাল চোখ তাকিয়ে আছে ক্যামেরা ফ্ল্যাশের দিকে।
