ওরা চুপচাপ কয়েক পা সামনে এগোল।
ঘুরে লিসার দিকে তাকাল পেইন্টার। তুমি কী জানো ১৯৯৯ সালে এখানে ওরা সাংরি-লা আবিষ্কার করেছিল?
ক্রোকে খেয়াল করল ও। স্কার্ফে ঢাকা মুখের আড়ালে ক্রো হাসছে কি-না সেটা ও বুঝতে পারছে না। হয়তো লিসার ভয় দূর করার চেষ্টা করছে। সাংরি-লা… মানে হারানো দিগন্ত, লস্ট হরাইজন? একটি সিনেমা ও বইয়ের কথা মনে পড়ল ওর। হিমালয়ে অবস্থিত বরফে মোড়া উটোপিয়ান স্বর্গ, যেটা হারিয়ে গিয়েছিল।
লিসাকে বুঝাতে শুরু করল ক্রো। এখান থেকে কয়েকশ মাইল দক্ষিণে দুজন ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক অভিযাত্রী বিরাটাকার, গভীর গিরিসঙ্কট আবিষ্কার করেছিলেন। পাহাড়ের পার্শ্বদেশের নিচে ছিল ওটা। তাই স্যাটেলাইট ম্যাপে দেখা যেত না। ওটার তলায় একটা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় স্বর্গ বিছানো ছিল। ঝরনা, দেবদারু ও পাইন গাছ, তৃণভূমি জুড়ে রডোডেনড্রন ফুলের ছড়াছড়ি, জলপ্রবাহের পাশে সারি সারি ফার ও চিরহরিৎ গাছপালা। সবমিলিয়ে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা একটা বুনো বাগান ছিল ওটা। প্রাণসম্পদে ভরপুর জায়গাটির চারদিকে ছিল তুষার আর বরফ।
সাংরি-লা?
শ্রাগ করল পেইন্টার। প্রকৃতি যেটাকে লুকোতে চায় সেটাকে স্যাটেলাইট দিয়ে বের করা সম্ভব না, সাংরিলা সেটা প্রমাণ করে দিয়েছে।
দাঁতে দাঁতে ঠোকাঠুকি লাগছে ওর। কথা বলার কারণে অযথা শ্বাস-প্রশ্বাস ও তাপের অপচয় হয়েছে। ওদের নিজেদের জন্য একটি সাংরি-লা খুঁজে বের করতে হবে।
চুপচাপ এগোল ওরা। তুষার পড়ার পরিমাণ বেড়ে গেছে।
আরও দশ মিনিট পর ওরা দেখল গিরিপথ একদিকে একেবেঁকে সরে গেছে। কোণায় পৌঁছুতেই ওদের মাথার ওপরে থাকা ঢালের ঝুলন্ত অংশ শেষ হয়ে আসছে।
থেমে আলাদা হয়ে তাকাল ওরা।
এখান থেকে ঢাল খুব খাড়াভাবে নিচে নেমে গেছে। প্রসারতাও বেড়েছে। এদের সামনে পর্দার মতো তুষার পড়ছে, যেন তুষারে ভরে যাচ্ছে পৃথিবী। দমকা বাতাস আর গভীর উপত্যকা দেখে যা মনে হলো এটা সাংরি-লা নয়।
বরফে ঢেকে যাওয়া খাঁজ কাটা পাহাড়ের সারি সামনে বিস্তৃত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রশি ছাড়া ওখানে পা দেয়া খুব কঠিন হবে, খুব ঢালু ওগুলো। এক সারি ঝরনা দেখা গেল–তবে ওগুলো বরফে জমে স্থবির হয়ে আছে।
তুষার আর বরফের ধোঁয়াশা যুক্ত একটি গভীর গিরিসঙ্কট চোখে পড়ল। মনে হচ্ছে ওটার কোনো তল নেই। ওটা দিয়ে পৃথিবীর শেষ মাথা পর্যন্ত যাওয়া যাবে।
আমরা নিচে গিয়ে কোনো একটা রাস্তা খুঁজে বের করব। বলল ক্রো। তুষার পাতের ভেতরে পা বাড়ল ও। তুষার জমতে জমতে এখন পায়ের গোড়ালি ছাড়িয়ে আরও উপরে উঠে এসেছে। লিসার জন্য পথ দেখাল ক্রো।
দাঁড়াও, বলল লিসা। ও জানে এখানে ক্রো আর বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারবে না। ওকে নিয়ে এতদূর এসেছে ঠিকই কিন্তু সামনে যাওয়ার মতো ওদের অবস্থা নেই, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেই।
এখানে…।
ক্রোকে একটি উপত্যকার দেয়ালের দিকে নিয়ে চলল ও। বাতাসের প্রকোপ থেকে জায়গাটি মুক্ত।
কোথায়…? ক্রো প্রশ্ন করতে চাইল কিন্তু ঠাণ্ডায় দাতে দাঁত বাড়ি লাগায় করতে পারল না।
উপর থেকে নেমে জমাট বাঁধা ঝরনাধারা দেখাল লিসা। তাসকি শেরপা ওদেরকে বেঁচে থাকার জন্য কিন্তু টেকনিক শিখিয়েছিলেন। আশ্রয় খোঁজার এই টেকনিকগুলো শেখা ছিল কঠোরভাবে বাধ্যতামূলক।
লিসা খুব ভাল করেই জানে কীভাবে সেরা জায়গাটিকে খুঁজে বের করতে হবে।
জমাট বাঁধা ঝরনাধারা ওদের যেখানে এসে পৌঁছেছে সেটা পেরিয়ে গেল লিসা। তাসকির শিখিয়ে দেয়া জ্ঞান অনুযায়ী, কালো পাথর কোথায় গিয়ে নীল-সাদা বরফের সাথে মিশেছে সেটা খুঁজতে লাগল ও। টেকনিক বলে, গ্রীষ্মকালে হিমালয়ে থাকা বরফ গলার ফলে এই ঝরনায় পানির প্রবাহ শুরু হয়। পাহাড়ের বিভিন্ন গভীর অংশের বরফও গলে পানিতে পরিণত হয় তখন। অন্যদিকে যখন ঠাণ্ডা পড়তে শুরু করে তখন চলমান ঝরনাধারা আস্তে আস্তে বরফ হয়ে জমাট বেধে যায়। আর মজার ব্যাপার হলো এই জমাট বাধা জলধারার পেছনে সবসময় ফাঁকা জায়গা থাকে।
লিসা স্বস্তির সাথে খেয়াল করল, এই ঝরনাও সেটার ব্যতিক্রম নয়। তাসকি আর তাঁর পূর্বপুরুষদেরকে মনে মনে ধন্যবাদ দিল ও। কনুই ব্যবহার করে বরফ আর পেছনের দেয়ালের মধ্যকার কালো ফাঁকা অংশ চওড়া করল ও। পেছনে একটি ছোট গুহার দেখা মিলল।
লিসার সাথে যোগ দিল ক্রো। দাঁড়াও দেখে আসি ভেতরটা নিরাপদ কি-না।
ফাঁকা জায়গা দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পর ছোট্ট একটি আলো জ্বলে উঠল, আলোকিত হলো জমাট বাঁধা ঝরনাধারা।
লিসা ফাঁকা অংশ দিয়ে উঁকি দিল।
কয়েক পা দূরে পেইন্টার দাঁড়িয়ে আছে, হাতে পেলাইট। আলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছোট কোটর পরীক্ষা করছে ও। দেখে নিরাপদ মনে হচ্ছে। ঝড়ো আবহাওয়ার সময়টুকু আমরা এখানে কাটিয়ে দিতে পারব।
গুহায় ঢুকল লিসা। বাইরের বাতাস আর তুষারপাত এখানে নেই। এখনই বেশ উষ্ণবোধ হচ্ছে।
ক্রো পেনলাইট বন্ধ করে দিল। এখানে আলো জ্বালানোর কোনো প্রয়োজন নেই। বাইরে যে দিনের আলো আছে সেটাকে পুরোপুরি চুষে নিয়ে বর্ধিত করে জমাটবাধা ঝরনাধারা ভেতরের গুহাকে আলোকিত করে রেখেছে। আলোর বিকিরণ হচ্ছে বরফ থেকে।
লিসার দিকে তাকাল পেইন্টার। ওর চোখগুলো একদম নীল রঙের, জ্বলজ্বলে বরফের সাথে মিলে গেছে। ওর চেহারায় ফ্রস্টবাইট (বরফপচন)-এর লক্ষণ আছে কি না দেখল লিসা। বাতাসের তোপে ওর চামড়া একদম নীল হয়ে গেছে। ক্রোর চেহারার হাল দেখে বুঝল এই ব্যক্তি সত্যিই আমেরিকার আদিবাসী। খাঁটি আমেরিকান।
