নিচের গ্রামের দিকে নেমে যাওয়া একটি পাহাড়ি রাস্তা ধরে এগোল ক্রো। কয়েকদিন আগে ও ওই গ্রাম থেকে এখানে এসেছিল।
দেখ!
নিচে ধোয়ার একটি কলাম আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। মঠের ধোঁয়ার চেয়ে এই ধোয়া তুলনামূলক ছোট সাইজের।
গ্রামটা… হাতের মুঠো শক্ত করল পেইন্টার।
শুধু মঠই নয়, নিচের গ্রামে থাকা ছোট ছোট কুঁড়ে ঘরেও বোমা মারা হয়েছে। হামলাকারীরা কোনো সাক্ষী রাখছে না।
পাহাড়ি রাস্তা থেকে সরে গেল পেইন্টার। এই রাস্তা একদম উদোম, নগ্ন। রাস্তার ওপরে নিশ্চয়ই নজর রাখা হচ্ছে, হয়তো নিচে আছে হামলাকারীরা।
ক্রো ধূমায়িত মঠের দিকে পিছু হটতে শুরু করল।
আমরা কোথায় যাচ্ছি? জানতে চাইল লিসা।
আগুনের পেছনে থাকা জায়গা নির্দেশ করে পেইন্টার জবাব দিল, জনমানব শূন্য জায়গায়।
কিন্তু ওখানে তো…?
হ্যাঁ, ওখানে আলো দেখা যায়, বলল ক্রো। কিন্তু লুকোনোর জন্য ওই জায়গাটাই আমাদের ঠিক হবে। আশ্রয় খোঁজা যাবে ওখানে। ঝড় পার না হওয়া পর্যন্ত আমরা হয়তো ওখানে থাকতে পারব। এখানকার আগুন আর ধোঁয়ার ব্যাপারে কেউ তদন্ত করতে আসার আগপর্যন্ত অপেক্ষা করব আমরা।
পুরো মোটা ধোয়ার কলামের দিকে তাকাল পেইন্টার। যেন কালো রঙের ধোয়ার পিলার। কয়েক মাইল দূর থেকেও এটা চোখে পড়বে। ধোয়ার সংকেত, আমেরিকার পূর্বপুরুষেরা একসময় এরকম ধোয়া ব্যবহার করে সংকেত দিত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কী কারও চোখে পড়বে? আরও উপরে তাকাল ও, মেঘের দিকে দৃষ্টি দিল। মেঘ পেরিয়ে নিজের দৃষ্টিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল ও। এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবে এমন একজনের কাছে প্রার্থনা করল ক্রো।
ততক্ষণ পর্যন্ত,..
ওর হাতে একটি রাস্তা খোলা আছে।
চলে, যাওয়া যাক।
.
রাত ১টা ২৫ মিনিট।
ওয়াশিংটন, ডি.সি.।
ক্যাটকে সাথে নিয়ে অন্ধকার ক্যাপিটল প্লাজা পেরোল মনক। ওরা দুজন একটু লম্বা লম্বা পা ফেলে এগোচ্ছে। তবে এত রাতে ডাকা হয়েছে বলে মোটেও বিরক্ত নয়।
আমি মনে করি আমাদের অপেক্ষা করা উচিত, বলল ক্যাট। একটু তাড়াহুড়ো হয়ে যাচ্ছে। যে-কোনো কিছুই হতে পারে।
ক্যাটের শরীর থেকে ভেসে আসা জেসমিনের সৌরভ পেল মনক। লোগান গ্রেগরির কাছ থেকে ফোন পেয়ে দুজন একসাথে চট করে গোসল সেরে রওনা হয়েছে ওরা। গরম পানিতে গোসল করার সময় একে অন্যকে আদর-সোহাগ করে ছুঁয়েছে, চুমো খেয়েছে। কিন্তু তারপর বাথরুম থেকে তোয়ালে প্যাচিয়ে আলাদা আলাদাভাবে বেরিয়েছে ওরা। পোশাক পরে নিজেদের ভালবাসার জগৎ থেকে বাস্তব জগতে ফিরে এসেছে। রাতের হিম শীতল ঠাণ্ডা বাড়ার সাথে নিজেদের কামনার আগুনকে নিভিয়ে ঠাণ্ডা করে ফেলেছে ওরা।
ক্যাটের দিকে তাকাল মনক।
নেভি ব্লু রঙের ট্রাউজার, সাদা ব্লাউজ আর আমেরিকান নৌ-বাহিনীর প্রতীক খচিত একটি উইন্ডব্রেকার রয়েছে ওর পরনে। বরাবরের মতোই এবার ক্যাটের পোশাক পরিচ্ছদে পেশাদারিত্বের ছাপ স্পষ্ট। অন্যদিকে মনকের পরনে আছে রিবকের কালো জিন্স, যবের গুঁড়ো রঙের একটি উঁচু গলাঅলা সোয়েটার। মাথায় পরেছে শিকাগো কাবস বেসবল দলের ক্যাপ।
আমি যতক্ষণ না নিশ্চিত হচ্ছি, বলল ক্যাট, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের এই প্রেগনেন্সির ব্যাপারে চুপচাপ থাকাই ভাল।
আমি যতক্ষণ না নিশ্চিত হচ্ছি বলে তুমি কী বোঝাতে চাইছ? বাচ্চাটাকে রাখবে কি-না সেটার কথা বলছ? আমাদের ব্যাপারে তুমি নিশ্চিত কি-না সেটা?
ক্যাটের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে শুরু করে লোগানের অফিসের চত্বরে পৌঁছা পর্যন্ত তর্ক করল ওরা। রাতের বেলা হাঁটতে বেরিয়ে এই অল্প রাস্তাকে কেমন অন্তহীন বলে মনে হচ্ছে।
মনক…
মনক থামল। এক হাত বাড়িয়ে ক্যাটকে ধরল ও, তারপর ছেড়ে দিল। ক্যাটও দাঁড়িয়ে পড়ল।
ক্যাটের চোখে চোখ রেখে বলল, বলল, ক্যাট।
আমি এই প্রেগনেন্সির ব্যাপারটা নিশ্চিত হয়ে নিতে চাই… স্টিকগুলো… আমি জানি না। অন্য কাউকে জানানোর আগে আমি নিশ্চিত হতে চাচ্ছি। চাঁদের আলোতে ওর চোখ চিকচিক করে উঠল। কান্না করবে করবে ভাব।
বেবি, এজন্যই তো আমাদের উচিত সবাইকে বিষয়টা জানিয়ে দেয়া। ক্যাটের কাছে এসে এক হাত ওর পেটের ওপর রেখে বলল মনক। এখানে যেটা বড় হচ্ছে ওটার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সবাইকে ব্যাপারটা জানিয়ে দেয়া উচিত।
অন্যদিকে ঘুরল ক্যাট। মনকের হাত ক্যাটের পিঠের অল্প একটু অংশে ছুঁয়ে আছে।
হয়তো তুমিই ঠিক বলেছিলে। আমার ক্যারিয়ার… হয়তো এটা সঠিক সময় নয়।
মনক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সব বাচ্চা সঠিক সময়ে জন্ম নিলে পৃথিবীটাই অনেক ফাঁকা থেকে যেত।
মনক, তুমি অন্যায় করছ কিন্তু। এটা তোমার ক্যারিয়ার নয়।
কচু! আচ্ছা, তোমার কী মনে হয় না, একটা বাচ্চা আমার জীবন বদলে দিতে পারে। আমার সবকিছু বদলে যাবে তখন।
ঠিক। আর এই কারণেই আমি ভয় পাচ্ছি। মনকের দিকে পিঠ দিয়ে হেলান দিল ক্যাট। মনক ওকে দুহাতে জড়িয়ে নিল।
আমরা দুজনে মিলে বিষয়টা সামাল দেব, ফিসফিস করে বলল মনক। কথা দিলাম।
তারপরও আমার আরও কয়েকটা দিন চুপ থাকা উচিত। এখনও কোনো ডাক্তারের কাছে যাইনি। হয়তো প্রেগনেন্সি টেস্টে ভুল ছিল।
কয়বার টেস্ট করেছ?
মনকের মুখোমুখি হল ও।
বলো বলছি।
পাঁচবার। নিচুস্বরে বলল ক্যাট।
পাঁচবার! মনক ওর কণ্ঠ থেকে হাসির রেশটুকু লুকোতে ব্যর্থ হলো।
