গর্জে উঠে লোকটির পায়ের স্পর্শকাতর জায়গায় নিজের বুড়ো আঙুল চালাল ও। চিৎকার করে উঠল আক্রমণকারী। ও জানে লোকটি কতখানি ব্যথা অনুভব করছে। লোকটির মনে হচ্ছে, ওর গোড়ালি ভেঙে গেছে। পায়ের উপর উঠে দাঁড়িয়ে লোকটির মুখোমুখো হওয়ার চেষ্টা করল ও।
যেই উঠতে যাবে তখুনি ওর মাথা ঘুরে গেল। পুরো পৃথিবী যেন ঘুরছে। ওর সব শক্তি যেন ফাটা বেলুনের মতো বেরিয়ে গেছে। জ্বালা করছে উরুর উপরের অংশ। কী যেন ঢুকেছে ওখানে। নিচ দিকে তাকাল। না, ঢোকেনি। ফুটেছে। একটি সিরিঞ্জ এখনও ওর উরুর মাংস থেকে ঝুলে আছে। ওটার উঁচ ফুটেছে ওর উরুতে।
ড্রাগ দেয়া হয়েছে ওকে।
আক্রমণকারী ওর দুর্বল বন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে পালাতে শুরু করল।
লোকটিকে পালাতে দেয়া যাবে না।
পিস্তল উঁচু করল ও… পাথরের মতো ভারী লাগছে ওটাকে। গুলি ছুড়ল। গুলি গিয়ে মেঝেতে বিধল। খুব দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ছে ও। আবার গুলি ছুড়ল… কিন্তু লোকটি ওর চোখের আড়ালে চলে গেছে।
ও শুনতে পেল আক্রমণকারী পালিয়ে যাচ্ছে।
শরীর ভারি হয়ে আসছে ওর। হৃদপিণ্ড লাফাচ্ছে বুকের ভেতর। ওর হৃদপিণ্ড স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে আকারে প্রায় দ্বিগুণ তবে Sonnekonig হিসেবে ঠিকই আছে।
নিজেকে সামলে নিতে কয়েকবার বড় করে দম নিল ও।
Sonnekonig রা অন্য আট-দশটা সাধারণ মানুষের মতো নয়।
নিজের পা টান করল আস্তে করে।
ওর একটি কাজ শেষ করা বাকি আছে।
ওর জন্মই হয়েছে এর জন্য।
সেবা করার জন্য। কাজ করার জন্য।
দড়াম করে ট্রাপোর বন্ধ করল পেইন্টার।
আমাকে একটু সাহায্য করো তো, এক পা টেনে টেনে বলল ও। ওর পায়ে ব্যথা হচ্ছে। কয়েকটা বাক্স দেখিয়ে বলল, এগুলোকে ট্রাপড়োরের ওপর রাখতে হবে।
সবার ওপরে থাকা বাক্সটি টেনে নিল ক্রো। উঁচু করে নিতে গিয়ে দেখে বাক্স খুবই ভারি। তাই মেঝের সাথে ঘষটে ঘষটে দরজার কাছে টেনে নিল ও। ক্রো জানে না এই বাক্সগুলোর ভেতরে কী আছে, শুধু জানে এগুলো ভারী, অনেক ভারী।
ট্রাপড়োরের ওপরে নিয়ে বসালো বাক্সটি।
দ্বিতীয় বাক্স নিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল লিসা। তৃতীয় বাক্স টানতে টানতে ক্রো ওকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেল। দুজনে মিলে ভারী বাক্সগুলো দরজার ওপর রাখল।
আর একটা, বলল পেইন্টার।
দরজার ওপরে রাখা বাক্সগুলোর দিকে তাকাল লিসা। এগুলো ঠেলে কেউ বেরোতে পারবে না তো।
বললাম তো, আর একটা। জোর দিয়ে বলল ক্রো, হাঁপাচ্ছে। আমার ওপর আস্থা রাখো।
দুজন মিলে শেষ বাক্সটিকে জায়গামতো বসালো ওরা। এই বাক্সটিকে ওরা দুজনে মিলে উঁচু করে নিয়েছে। কারণ, তিনটি বাক্স রাখাতে ভরে গিয়েছে ট্রাপড়োরের নিচের অংশ।
যে ওষুধ দিয়েছি, ওতে সে এক ঘন্টার জন্য চুপ মেরে পড়ে থাকবে। বলল লিসা।
লিসার কথাকে ভুল প্রমাণিত করল একটি গুলির আওয়াজ। একটি রাইফেলের গুলি বোঝা চাপিয়ে দেয়া ট্রাপচোরকে ছিদ্র করে গোলাঘরের ছাদে থাকা কাঠের তক্তায় গিয়ে বিধল।
তোমার কথা মানতে পারলাম না, বলল ক্রো। লিসাকে দূরে টেনে নিয়ে গেল।
সিডেটিভে থাকা পদার্থের পুরোটা পুশ করেছিলে তো?
হ্যাঁ, করেছিলাম।
তাহলে কীভাবে…
আমি জানি, আর এখন ওটা জেনে কোনো লাভও হবে না।
গোলাঘরের খোলা দরজার দিয়ে ওকে নিয়ে এগোল ক্রো। বাইরে অস্ত্রধারী আর কেউ আছে কি-না সেটা দেখে নিয়ে ওখান থেকে বাইরে বেরোল ওরা। বাম দিকে আগুন আর ধোয়ার খেলা চলছে। আগুনের শিখা থেকে উৎপন্ন হওয়া ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠে যাচ্ছে আকাশে।
ধূসর মেঘরাজি পাহাড়ের ওপরের অংশকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে রেখেছে।
তাসকি ঠিক বলেছিলেন, পারকার হুড তুলতে তুলতে বিড়বিড় করল লিসা।
কে?
শেরপা গাইড। তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন আজকে আরেকটা ঝড় আঘাত হানতে পারে।
ধোয়ার গমন পথের দিকে তাকিয়ে দেখল ওরা প্যাচিয়ে প্যাচিয়ে মেঘের দিকে এগোচ্ছে। ভারি তুষার কণা নামছে আকাশ থেকে। ছাইয়ের কালো বৃষ্টির সাথে মিশে যাচ্ছে ওগুলো। আগুন ও বরফ। এই মঠে ডজনখানেক সন্ন্যাসী বাস করতেন যারা এখন শুধুই অতীত। এখানে তাদের জন্য স্মৃতিসৌধ হয়ে গেল।
এখানে যারা নিজেদের বাসস্থান গড়ে তুলেছিল তাদের ভুদ্র মুখগুলো মনে পড়ল পেইন্টারের। ওর বুকের ভেতর ক্রোধ টগবগ করে উঠল। কে বা কারা এই সন্ন্যাসীদেরকে নৃশংস, নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করল?
কে করেছে সেটার উত্তর ক্রোর জানা নেই, তবে ও জানে কেন করেছে।
এখানকার অসুখ।
কিছু একটা গণ্ডগোল হয়ে গেছে… আর এখন সেটাকে ধামাচাপা দিতে চাচ্ছে কেউ।
একটি বিস্ফোরণ ওর চিন্তার জাল ছিঁড়ে দিল। আগুন আর ধোঁয়া বেরিয়ে এল গোলাঘরের দরজা দিয়ে। উঠোনে একটি বাক্সের ঢাকনা ছিটকে এসে পড়ল।
লিসার হাত ধরল পেইন্টার।
নিজেকে উড়িয়ে দিল নাকি? লিসা প্রশ্ন করল, বিস্ময়ে গোলাঘরের দিকে তাকিয়ে আছে।
ওকে নিয়ে বরফ ঢাকা মাঠ দিয়ে এগোল ক্রো। ছাগল-ভেড়ার জমে যাওয়া লাশগুলোকে এড়িয়ে গেল ইচ্ছে করেই। বাইরের দরজার দিকে এগোচ্ছে ওরা।
তুষারপাত বাড়ছে। এর ফল ভাল এবং মন্দ, দুটোই। পেইন্টারের পরনে আছে একটি মোটা পশমি আলখাল্লা, পায়ে মোটা লোমঅলা বুট। মন্দ দিক, ভয়ঙ্কর তুষারঝড়কে মোকাবেলা করার মতো এগুলো তেমন কিছুই নয়। ভাল দিক, তুষারপাতের কারণে ওদের পদচিহ্ন ঢাকা পড়ে যাবে এবং দূর থেকে ওদেরকে কেউ দেখতেও পাবে না।
