বোতল থেকে পানি খেল ক্রো। সবকিছু মনে করতে গিয়ে ওর চোখের পেছনে কেমন একটা ব্যথা অনুভূত হলো। শেষ দিনগুলো ঝাপসা লাগছে।
‘এক প্রত্যন্ত গ্রামে ছিলাম আমি। মাঝ রাতে পাহাড়ের উপরে অদ্ভুত আলোর উদয় হয়েছিল। তবে আমি ওগুলো দেখিনি। ঘুম থেকে জেগে দেখি ওগুলো নেই। কিন্তু সকালে উঠে গ্রামের সবাই বলল, ওদের নাকি মাথাব্যথা হচ্ছে, বিতৃষ্ণা লাগছে। আমারও একই রকম লাগছিল। একজন বয়স্ক মানুষকে সেই আলোর কথা জিজ্ঞেস করলাম। সে বলল, এই আলো নাকি মাঝে মধ্যেই দেখা যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ওরা এটা দেখে আসছে। গোস্ট লাইট, ভূতুড়ে আলো। ওই আলো নাকি পাহাড়ের গভীরে থাকা খারাপ আত্মাদের প্রতীক।
খারাপ আত্মা?”
‘আলোগুলো যেখানে দেখা যায় ওদিকে নির্দেশ করে দেখিয়েছিল সে। পাহাড়ের এক দূবর্তী অঞ্চল ছিল ওটা। গভীর গিরি সঙ্কট, বরফ ঝরণা বিস্তৃত হয়ে চলে গেছে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত। দুর্গম পথ। এই মঠের অবস্থান সেই জনমানব শূন্য অঞ্চলের কাছেই।
‘তার মানে এই মঠ সেই আলোগুলোর বেশ কাছে ছিল?
মাথা নাড়ল পেইন্টার। ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব ভেড়া মারা গেছে। কতগুলো যেখানে দাঁড়িয়েছিল ঠিক ওখানেই দুম করে মরে গেছে। আর বাকিরা ওদের মাথা ইকেছে পাথরের সাথে। নিজের ইচ্ছায় বারবার মাথা ঠুকেছে। পরদিন আমি এখানে আসি। লামা খেমসার আমাকে চা খেতে দিয়েছিলেন। আমার এই পর্যন্তই মনে আছে। আর কিছু মনে নেই।’
‘তোমার কপাল ভাল, বোতল ফিরিয়ে নিতে নিতে বলল লিসা।
‘কীভাবে?
দুহাত শক্ত করে আড়াআড়িভাবে রাখল লিসা। মঠ থেকে দূরে ছিলে সেজন্য। আলোর কাছে থাকার ফলে বিভিন্ন প্রাণীদের এখানে এরকম হাল হয়েছিল। উপরের দিকে চোখ মেলল ও, যেন দেয়াল ভেদ করে উপরের দৃশ্য দেখতে চাইছে। এটা হয়তো কোনো ধরনের রেডিয়েশন। তুমি বলেছিলে না, চীনের সীমান্ত বেশ কাছেই? হয়তো এটা কোনো নিউক্লিয়ার পরীক্ষণ।
পেইন্টারও ক’দিন ঠিক একই জিনিস ভেবেছিল।
তুমি মাথা ঝাঁকাচ্ছ কেন? প্রশ্ন করল লিসা।
পেইন্টার নিজেও জানে ওর মাথা ঝাঁকাচ্ছে। নিজের কপালে হাত রাখল ও।
লিসা ক্রু কুঁচকিয়ে বলল, মিস্টার ক্রো, তুমি এখানে ঠিক কী করছিলে সেটা কিন্তু এখনও বলেনি।
পেইন্টার বলে ডাকলেই হবে। লিসাকে বাকা হাসি উপহার দিয়ে বলল ও।
অবশ্য লিসা ওতে মুগ্ধ হয়নি কিংবা পটেও যায়নি।
কতখানি বলবে, কী বলবে সেটা নিয়ে দ্বিধায় ভুগল পেইন্টার। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সতোর পথ অবলম্বন করাই ভাল। অন্তত যতটুকু সৎ ও হতে পারে আরকি।
সরকারি চাকরি করি। DARPA নামের বিভাগে…।
আঙুল নাড়িয়ে ওকে থামিয়ে দিল লিসা। DARPA সম্পর্কে আমার ধারণা আছে। আমেরিকার মিলিটারি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট ডিভিশন। একবার তাদের সাথে রিসার্চে অংশ নিয়েছিলাম। তো এখানে তাদের কী কাজ?
বেশ। আং গেলু শুধু তোমাকেই ডেকে আনেননি, এক সপ্তাহ আগে তিনি আমাদের প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করেছিলেন। এখানকার অদ্ভুত অসুখের ব্যাপারে তদন্ত করার জন্য। আমি মাত্রই পরিকল্পনা করছিলাম, এখানে কোন কোন বিশেষজ্ঞদের লাগতে পারে… ডাক্তার, ভূতাত্ত্বিক, মিলিটারি… কিন্তু ঝড় চলে এলো। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে এতদিন থাকতে হবে, এটা আমার ধারণা ছিল না।
কিছু বুঝে উঠতে পেরেছ?
প্রাথমিকভাবে যা বুঝলাম, মাওবাদী বিদ্রোহীরা হয়তো কোনো নিউক্লিয়ার বর্জ্যের নাগাল পেয়েছে। হয়তো কোনো বোমা বানানোর চেষ্টা করছে ওরা। চীনের সীমান্ত কাছে থাকলে এরকম ধারণা তো করাই যায়। তাই ঝড়ের সময়টুকুতে আমি বিভিন্ন রেডিয়েশন পরীক্ষা করে দেখেছি। অস্বাভাবিক কিছু পাইনি।
পেইন্টারের দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাল লিসা। যেন ও একটা গুবরে পোকা।
তোমাকে যদি ল্যাবে নিয়ে যাওয়া যায়, স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল ও, তাহলে হয়তো কিছু উত্তর পাওয়া যাবে।
গুবরে পোকা নয়, লিসা ওকে গিনি পিগ হিসেবে দেখছিল!
যাক, বিবর্তন প্রক্রিয়ার একটু উপরের স্তরের প্রাণী হিসেবে ভাবছে।
আগে আমাদেরকে বাঁচতে হবে। লিসাকে বাস্তবতা মনে করিয়ে দিয়ে বলল ক্রো।
লিসা সেলারের সিলিঙের দিকে তাকাল। সর্বশেষ গুলির আওয়াজ হয়েছে অনেকক্ষণ হয়ে গেল। হয়তো ওরা ভাবছে, সবাই মরে গেছে। যদি আমরা এখানে থাকি…
পেইন্টার উঠে দাঁড়াল। তোমার কথা শুনে যা বুঝেছি, হামলা করা হয়েছে বেশ হিসেব করে। সবকিছু পূর্বপরিকল্পিত। ওরা এই টানেলের কথাও জানে হয়তো। একসময় এখানে সার্চও করতে আসবে। তবে আগুন নেভা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে, এতটুকু আশা আমরা রাখতে পারি।
সিসা মাথা নাড়ল। তাহলে আমরা এগোই।
হ্যাঁ। আমরা এই জায়গা থেকে বেরিয়ে যাব। পারব আমরা। লিসাকে আশ্বস্ত করল ক্রো। দেয়ালে এক হাত রেখে নিজেকে সামলে নিল ও। আমরা পারব। লিসাকে নয় যেন নিজেকে শুনিয়ে বলল এবার।
রওনা হলো ওরা। কয়েক পা এগোতেই পেইন্টার কিছুটা শক্তি ফিরে পেল।
ভাল খবর।
এখান থেকে বেরোবার রাস্তা খুব একটা দূরে নয়।
করিডর দিয়ে হাওয়া বয়ে এসে ভেতরের শুকনো তৃণলতাকে দুলিয়ে দিয়ে সেটারই প্রমাণ দিল। মুখে ঠাণ্ডা লাগল ক্রোর। হঠাৎ করে জমে গেল ও। শিকারির সহজাত প্রবৃত্তি ওকে থামিয়ে দিয়েছে… এছাড়াও ওর ভেতরে স্পেশাল অপারেশন ট্রেইনিং তো আছেই। পেছনে লিসার কনুইতে হাত দিল ক্রো। চুপ করিয়ে দিল।
