তিন তিনটে দিন ওর জীবন থেকে গায়েব হয়ে গেছে।
সেই সাথে ওর শরীর থেকে খোয়া গেছে দশ কেজি ওজন।
একটু আগে গায়ে পনচো (আলখাল্লা) পরার সময় নিজের পাজরের অবনতি লক্ষ করেছে ও। এমনকী ওর কাধও চিকন হয়ে গেছে। এখানকার অসুখ থেকে ও রক্ষা পায়নি ঠিকই তবে ধীরে ধীরে শক্তি ফিরে পাচ্ছে, উন্নতির লক্ষণ।
এটার প্রয়োজন ছিল।
বিশেষ করে বাইরে যখন আততায়ী ঘুরে বেড়ায় তখন তো শক্তির প্রয়োজন পড়তেই পারে।
নিচে পালিয়ে আসার সময় থেমে থেমে বন্দুকের আওয়াজ হতে শুনেছে পেইন্টার। আগুন লাগা মঠ থেকে যে-ই বের হচ্ছিল না কেন তাকে মেরে ফেলেছে স্নাইপার। আক্রমণকারী সম্পর্কে বর্ণনা দিল ড. কামিংস। আক্রমণকারী একজনই। তবে তার সাথে নিশ্চয়ই আরও লোক আছে। ওরা কি মাওবাদী বিদ্রোহী? কিন্তু তাতে তো কিছুই মিলছে না। তারা এই হত্যাযজ্ঞ করে কী ফায়দা পাবে?
হাতে পেলাইট নিয়ে পথ দেখাল পেইন্টার।
ওর কাছাকাছি থেকে ড. কামিংসও পিছু পিছু এগোলো।
পেইন্টার জেনেছে লিসা আমেরিকান ডাক্তার এবং একটি পর্বতারোহণ দলের সদস্য। লিসার দিকে মাঝে মাঝে তাকিয়ে বুঝে নেয়ার চেষ্টা করছে ক্রো, মেপে নিচ্ছে। লম্বা লম্বা পা, অ্যাথলেটিক শরীর, পেছনে ঝুঁটি করে রাখা চুল, বাতাসের তোপে গোলাপি হয়ে যাওয়া গাল ইত্যাদি। তবে লিসা বেশ ভয় পেয়েছে। ক্রো’র কাছে কাছে থাকছে। উপর থেকে হঠাৎ হঠাৎ মটমট আওয়াজ আর আগুনের চিড়বিড় শব্দে লাফিয়ে উঠছে। তবে হ্যাঁ, যত যা-ই হোক এখনও একবারের জন্যও থামেনি বেচারি। কাঁদেনি, অভিযোগ করেনি। মনের জোর কাজে লাগিয়ে আতঙ্কের কাছে হার স্বীকার করছে না সে।
কিন্তু এভাবে কতক্ষণ?
মুখের ওপর থেকে ঘাস সরাতে গিয়ে দেখা গেল ওর আঙুলগুলো কাঁপছে। সামনে এগোচ্ছে ওরা দুজন। সেলারের গভীরে যেতেই ভেতরের বাতাস বিভিন্ন সুগন্ধী ভাল পালার গন্ধে ভারি হয়ে উঠল। রোজমেরি, আর্টেমিসিয়া, পাহাড়ি পুষ্প, খেনপা ইত্যাদি। এগুলোর সবকটা ধূপ কাঠি হিসেবে ব্যবহার করার জন্য একদম প্রস্তুত।
মঠের প্রধান, লামা খেসমার পেইন্টারকে ১০০ টি ঔষধি বিদ্যা শিখিয়েছিলেন। পরিশুদ্ধিকরণ থেকে শুরু করে স্বর্গীয় শক্তি লাভ, মনোযোগ ধরে রাখা, হাঁপানি ও সাধারণ সর্দি-ঠাণ্ডাজনিত সমস্যার সমাধান ছিল সেই বিদ্যায়। কিন্তু এখন ওই বিদ্যার কোনো দরকার নেই। পেইন্টার এই মুহূর্তে সেলারের পেছনের দরজায় যাওয়া সম্ভব সেটা মনে করার চেষ্টা করছে। সবকটা মঠের সাথে সংযোগ স্থাপন করেছে এই সেলার। শীতকালে যখন ভারি তুষারপাত হয় তখন সন্ন্যাসিগণ এই সেলার ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যাতায়াত করতেন।
এছাড়াও এই সেলার ব্যবহার করে গোলাবাড়ি ও মাঠের প্রান্তদেশে পৌঁছুনো যায়। আগুনের আক্রমণ কিংবা কারও সরাসরি দেখে ফেলার ভয় নেই এদিকে।
যদি ওরা পৌঁছে যেতে পারে… তারপর ওখান থেকে নিচের গ্রামে গেলেই…
ক্রো’র সিগমা কমান্ডে যোগাযোগ করা দরকার।
সম্ভাবনায় ওর মন দুলে উঠল। সেইসাথে সেলারের রাস্তাও দুলে উঠল।
সেলারের দেয়ালে এক হাত ঠেস দিয়ে দাঁড়াল পেইন্টার, নিজেকে সামলে নিচ্ছে।
মাথা ঘোরাচ্ছে ওর।
‘তুমি ঠিক আছে তো?’ পেইন্টারের কাঁধের কাছে এগিয়ে গিয়ে লিসা জানতে চাইল। মাথা নাড়ার আগে কয়েকবার শ্বাস নিল ক্রো। জেগে ওঠার পর থেকেই আশেপাশের পরিস্থিতি ওকে শান্তি দেয়নি। যদিও খারাপ ঘটনাগুলো একটু বিরতি দিয়ে দিয়ে ঘটেছে… নাকি ভুল হলো?
‘আচ্ছা, উপরে আসলে কী হয়েছে? জানতে চাইল লিসা। ক্রো’র কাছ থেকে ও পেনলাইট নিয়ে নিল। আসলে এই পেনলাইটটি লিসার। ওর মেডিক্যাল কিটে ছিল। লাইট নিয়ে ক্রো’র চোখে ধরল লিসা।
‘আমি জানি… নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারব না… তবে আমাদের এগোতে হবে। থামলে চলবে না।
দেয়ালে ভর দিয়ে সরে আসার চেষ্টা করল ক্রো কিন্তু লিসা ওর বুকে একটি হাত রেখে থামিয়ে দিল। ক্রো’র চোখ পরীক্ষা করছে। prominent nystasmus দেখা যাচ্ছে।
‘কী?’
ঠাণ্ডার পানির বোতল ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে ইশারায় নিচে থাকা খড়ের ওপর বসতে বলল লিসা। ক্রো কোনো আপত্তি করল না। খড় একদম সিমেন্টের মতো শক্ত হয়ে রয়েছে।
‘তোমার চোখে অনুভূমিক nystagmus এর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কেমন যেন টান পড়েছে চোখের মণিতে। মাথায় আঘাত পেয়েছিলে নাকি?”
“না মনে হয়। সিরিয়াস কিছু হয়েছে?
‘বলা কঠিন। তবে এটা তোমার চোখ কিংবা মস্তিষ্কের কোনো ক্ষতির ফলও হতে পারে। মাথায় একটা বাড়ি লাগা, কিংবা একাধিক শক্ত আঘাত থেকে এরকমটা হতে পারে। তোমাকে দেখে মনে হলো তোমার মাথা ঘোরাচ্ছিল, সে হিসেবে বলতে হয়, তোমার শরীরের ওপর দিয়ে বেশ ধকল গিয়েছে হয়তো। ক্ষতি হয়েছে কোথাও। হতে পারে কানের ভেতরের অংশে কিংবা নার্ভাস সিস্টেমে। তবে যা-ই হোক, খুব সম্ভবত সেটা স্থায়ী হবে না।’ শেষের শব্দগুলো কেমন যেন বিড়বিড় করে উচ্চারিত হলো।
‘খুব সম্ভব বলে তুমি কী বুঝাতে চাইছ, ডক্টর কামিংস?
‘আমাকে লিসা বলে ডাকো।’ বলল ও। ‘প্রসঙ্গ পরির্বতনের চেষ্টা।
‘ঠিক আছে। লিসা। তাহলে ওগুলো কী স্থায়ী হতে পারে?
অন্যদিকে তাকাল লিসা। ‘আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। আগের ইতিহাস জানতে হবে। বলল ও। তোমার এসব কী করে হলো, বলো। এগুলো দিয়েই শুরু করা যাক।
