অন্যদিকে গ্রে’র বাবা থাকতেন টেক্সাসে। পেশায় তেলকর্মী, স্বভাবে ঘাড় ত্যাড়া। মাঝ বয়সে এসে অচল হয়ে পড়েন তিনি। যার ফলে গৃহিণীর মতো ঘরে থাকতে হলো তাকে। আর এরকম একজন পুরুষ হয়ে ঘরে থাকতে গিয়ে তার মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেল।
যেমন বাবা, তেমন ছেলে।
তবে ছেলে বদলে যায় আং গেলুর সংস্পর্শে আসার পর।
দুই বিপরীতের মধ্যে থাকা একটি পথ বাতলে দিয়েছিলেন তিনি। এ পথ ঘোট নয়। অতীত ও ভবিষ্যৎ দুদিকের মতো এই পথও বিশাল। গ্রে এখনও এই পথ বুঝে ওঠার জন্য সংগ্রাম করছে।
তবে আং গেলু গ্রে’কে এই পথে চলার জন্য প্রথম কয়েকটি পদক্ষেপ রাখতে সাহায্য করেছিলেন। এজন্য বুদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছেও ঋণী। তাই এক সপ্তাহ আগে যখন ওর কাছে সাহায্য চেয়ে একটি ফোন এলো তখন সেটাকে অবজ্ঞা করতে পারল না গ্রে। আং গেলু জানিয়ে ছিলেন, চীন সীমান্তের কাছে অদ্ভুতভাবে মানুষ গায়েব হচ্ছে, অচেনা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
এই ব্যাপারগুলো কাকে জানালে ভাল হবে সেটা বুঝে উঠতে পারছিলেন না আং গেলু। তাঁর দেশের সরকার মাওবাদী বিদ্রোহীদের নিয়ে বেশি ব্যস্ত। আং গেলু জানতেন গ্রে একটি গোপন সংস্থার অপারেশন ডিপার্টমেন্টে কাজ করে। তাই ওর কাছেই সাহায্য চেয়ে ছিলেন। কিন্তু গ্রে বর্তমান মিশনে আগে থেকেই ব্যস্ত থাকায় আং গেলুর ডাকে সাড়া দিয়ে নেপালে আসা সম্ভব ছিল না। তাই ব্যাপারটা তখন পেইন্টার ক্রো’কে জানিয়েছিল ও।
ফাইল চালাচালির মতো হয়ে গিয়েছিল ব্যাপারটা…।
‘পেইন্টার ক্রো’কে জানিয়েছিলাম যাতে উনি একজন জুনিয়র এজেন্টকে পাঠিয়ে দেন,’ আমতা আমতা করল গ্রে। ‘নেপালে আসলে কী হচ্ছে সেটা…’
লোগান বাধা দিলেন। এখানে স্লো ছিল।
একটু গুঙিয়ে উঠল গ্রে। লোগানের সাংকেতিক ভাষা ও বুঝতে পেরেছে। গ্রে যেরকম বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে এরকম কিছুর পেছনে লেগে ডেনমার্কে চলে এসেছে তেমনি অন্য এজেন্টরাও বিভিন্ন জায়গায় ব্যস্ত আছে।
‘তাই বলে ক্রো নিজেই চলে গেলেন।
‘তুমি তো ডিরেক্টরকে চেনোই। হাতেনাতে কাজ করার জন্য মুখিয়ে থাকেন তিনি’। রেগে দীর্ঘশ্বাস ফেলল লোগান। ‘এখন সমস্যা হয়ে গেছে। ঝড়ের কারণে গত কয়েকদিন যাবত তার সাথে আমাদের যোগাযোগ বন্ধ। তখন থেকে এখন পর্যন্ত ডিরেক্টরের কাছ থেকে একটি আপডেটও পাইনি আমরা। তবে আমরা বিভিন্ন উৎস থেকে গুজব শুনতে পেরেছি। তোমার সন্ন্যাসী বন্ধুটির বলা কাহিনির সাথে মিল আছে ওগুলোর। অসুস্থতা, প্লেগ, মৃত্যু, বিদ্রোহীদের সম্ভাব্য হামলা ইত্যাদি। গুজব বেড়েই যাচ্ছে।’
লোগানের কণ্ঠের থমথমে ভাবটা কেন ছিল সেটা এবার বুঝতে পারল গ্রে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, শুধু গ্রে’র মিশনই ভজকট হয়নি, অন্য মিশনও বেগতিক অবস্থায় পড়েছে।
বিপদ যখন আসে, সবদিক থেকেই আসে।
আমি তোমার কাছে মনককে পাঠাতে পারি,’ বললেন লোগান। সে আর ক্যাপ্টেন ব্রায়ান্ট রওনা হয়ে গেছে। আগামী ১০ ঘণ্টার মধ্যে মনক মাঠে নামবে। ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি শান্ত থাকো।
‘কিন্তু নিলাম তো শেষ হয়ে যাবে…’।
‘কমান্ডার পিয়ার্স, তোমাকে যা অর্ডার দেয়ার দেয়া হয়ে গেছে।
দ্রুত বলতে শুরু করল গ্রে, ওর কণ্ঠস্বর কঠিন, রূঢ়। “স্যার, আমি ইতোমধ্যে প্রবেশ-বাইর হওয়ার পথে ঘোট বোতাম ক্যামেরা বসিয়ে দিয়ে এসেছি। এখন যদি সরে যাই তাহলে ওগুলোকে অপচয় করা হবে।’
‘ঠিক আছে। নিরাপদ স্থান থেকে ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ করো। রেকর্ড করো সবকিছু। কিন্তু এর বেশি কিছু নয়। বোঝা গেছে, কমান্ডার?
রাগ হচ্ছে গ্রে’র, কিন্তু লোগানের আর কিছু করার নেই। ভেরি গুড, স্যার। সৌজন্যবশত বলল ও।
‘নিলামের শেষে রিপোর্ট করবে।’ লোগান বললেন।
“জ্বী, স্যার।
সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
কোপেনহ্যাগেনের রাস্তা ধরে আবার এগোতে শুরু করল গ্রে। চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে। কিন্তু ওর মনে দুশ্চিন্তা খচ খচ করছে।
পেইন্টারের জন্য, আং গেলুর জন্য…
নেপালে হচ্ছেটা কী?
০৪. গোস্ট লাইটস্
০৪. গোস্ট লাইটস্
সকাল ১১টা ১৮ মিনিট।
হিমালয়।
‘তুমি নিশ্চিত আং গেলুকে খুন করা হয়েছে? উনি মারা গেছেন?’ পেছনে তাকিয়ে প্রশ্ন করল পেইন্টার।
ইতিবাচক মাথা নেড়ে জবাব দিল একজন।
লিসা কামিংস পুরো ঘটনা বলে শেষ করেছে। এভারেস্টে চড়ার একটি দল থেকে কী করে এই মঠের অসুস্থতা তদন্ত করতে এলো সব জানিয়েছে ও। কয়েকটি ভয়ঙ্কর বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে পেল লিসা। পাগলামো, বিস্ফোরণ, স্নাইপার।
মঠের ভূগর্ভস্থ সেলারে গোটা দুই গুতো খাওয়া মাথায় লিসার পুরো গল্প চিন্তা করে দেখল পেইন্টার। তবে এখানকার এই পাথুরে সরু গোলকধাঁধার মতো জায়গাটুকু ওর মতো উচ্চতাসম্পন্ন ব্যক্তির জন্য নয়। ওকে মাথা নিচু করে থাকতে হচ্ছে। তারপরও ওর মাথা ছুঁয়ে দিচ্ছে জুনিপারের ডালপালা। এই সুগন্ধময় ডালগুলোকে উপরের মন্দিরে বিভিন্ন বিশেষ দিনে পোড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তবে সেই মন্দির নিজেই এখন পুড়ছে, জ্বলে-পুড়ে আকাশের বুকে ধোয়া পাঠাচ্ছে।
নিরস্ত্র অবস্থায় আগুনের হাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে এসে এই সেলারে আশ্রয় নিয়েছে ওরা। মাঝে একবার প্রথমে পোশাকের রুম থেকে গায়ে পরার জন্য একটি পনচো আর পায়ের জন্য একজোড়া লোমশ বুট নিয়েছে পেইন্টার। ওই পোশাকে ওকে পেকুয়োট ইন্ডিয়ানদের মতো দেখাচ্ছে। যদিও ওর শরীরে ভিন্ন দুটি জাতির রক্ত বইছে। যা-ই হোক, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো–ওর নিজের কাপড়-চোপড় কিংবা ব্যাকপ্যাক কোথায় আছে সেটা মনে করতে পারছে না।
