অর্ধেক জানোয়ার, অর্ধেক ভূত…
না দেখেও, সত্য জানতে ও।
উকুফা।
মৃত্যু।
আজ যেন ওটা না হয়… প্রার্থনা করল খামিশি… আজ যেন না হয়।
নল-খাগড়ার ভেতরে সেঁধে গেল ও…
… মাথা সামনে দিয়ে জলাধারে ঝাঁপ দিল।
.
সকাল ৯টা ৩২ মিনিট।
কোপেনহ্যাগেন, ডেনমার্ক।
ফিওনার চিৎকার অস্ত্রধারীর রাইফেল থেকে গুলি ছোঁড়ার কাজে একটু বাধা সৃষ্টি করল।
নিজেকে বাঁকিয়ে ফেলল গ্রে, মরণঘাতী আঘাত থেকে বাঁচার চেষ্টা আরকি। ও ঘুরতেই দোকানের ধোয়াময় জানালা ভেঙ্গে বড় একটা কিছু নামল বাইরে।
অস্ত্রধারীর চোখেও ব্যাপারটি ধরা পড়েছে তবে সেটা গ্রে দেখার আগেই। আর সেজন্য একটু হলেও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে সে।
বাঁ হাতের নিচ দিয়ে গরম বুলেট যাওয়ার তাপ অনুভব করল গ্রে।
ও একদম পয়েন্ট-ব্ল্যাংক রেঞ্জে ছিল, এরকম বিপজ্জনক অবস্থান থেকে নিজেকে বাঁচাতে আরও পাক খেল ও।
জানালা থেকে লাফ দেয়া অবয়বটি অবতরণ করল ডাস্টবিনের ওপর। সেখান থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল অস্ত্রধারীর দিকে।
‘বারটেল!’ চিৎকার করল ফিওনা।
বুড়ো কুকুরটির চামড়া ভিজে গেছে। দাঁত দিয়ে অস্ত্রধারীর হাতের নিচের অংশ কামড়ে ধরেছে ও। এরকম আচমকা আক্রমণে লোকটি হকচকিয়ে গেল। ডাস্টবিনের পাশে তৈরি হওয়া ছায়ায় আছড়ে পড়ল সে। পাথুরে ফুটপাতে ঠকাস শব্দে তার রাইফেল পড়ে গেল।
অস্ত্রটি বাগানোর জন্য সামনে ঝুঁকল গ্রে।
একদম কাছেই কুকুর গোঙানির আওয়াজ হলো। গ্রে কিছু বুঝে ওঠার আগেই অনেক উঁচুতে লাফিয়ে উঠল আক্রমণকারী। গ্রে’র কাঁধে বুটের তলা দিয়ে লাথি মেরে একেবারে রাস্তায় ফেলে দিল। পালাল সে।
হাতে রাইফেল তুলে নিয়ে পলায়নরত লোকটির দিকে লক্ষ্য স্থির করল গ্রে। কিন্তু আক্রমণকারী হরিণের মতো দ্রুত গতিতে দৌড়ে একটি বাগানের বেড়া ডিঙিয়ে পগার পার হয়ে গেল। তার পরনে ছিল একটি কালো ট্রেঞ্চ কোট, দৌড়ানোর সময় উড়ছিল ওটা। গলি ধরে পালিয়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেল গ্রে।
‘হারামজাদা…’
গ্রে’র দিকে ফিওনা দৌড়ে এলো। ওর হাতে একটি পিস্তল। অন্য লোকটি…’ নিজের পেছন দিক নির্দেশ করল ও। আমার মনে হয় সে মরে গেছে।
রাইফেল কাঁধে ঝুলিয়ে ফিওনার হাত থেকে পিস্তল নিল গ্রে। মেয়েটি কোনো আপত্তি করল না। ওর মনোযোগ অন্যদিকে।
‘বারটেল…’।
বেরিয়ে এলো কুকুরটি, খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটছে, বেশ দুর্বল, একপাশ আগুনের তাপে ঝলসে গেছে ওর।
পুড়তে থাকা দোকানের দিকে তাকাল গ্রে। এই কুকুর ওখান থেকে বেঁচে বেরোল কীভাবে? সর্বশেষ কুকুরটিকে কী অবস্থায় দেখেছিল গ্রে সেটা মনে করার চেষ্টা করল : বিস্ফোরণের ধাক্কায় পেছনের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল বারটেল।
ফিওনা আহত ভেজা কুকুরটিকে জড়িয়ে ধরল।
কুকুরটি নিশ্চয়ই কোনো অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রের নিচে পড়েছিল। তাই ভিজে গেছে।
কুকুরটির মুখ ধরে মুখোমুখি হলো ফিওনা। ‘লক্ষ্মী।
গ্রে-ও একমত হলো। ও বারটেলের কাছে ঋণী। যা খেতে চাও পাবে, বন্ধু, খুশি হয়ে বলল ও।
বারটেলের শরীর কাঁপতে লাগল। টলে পড়ল পাথুরে ফুটপাতের ওপর। শক্তি যা একটু বাকি ছিল সেটাও ফুরিয়ে গেছে বেচারার।
ওদের বাঁ দিক থেকে ড্যানিশ ভাষায় গলা ফাটানো আওয়াজ এলো। দ্রুতগতির পানির ফোয়ারা ছুটল ওপর দিকে। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন দোকানের অন্যপাশের আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে দিয়েছে।
গ্রে আর এখানে থাকতে পারবে না।
‘আমাকে যেতে হবে।’
ফিওনা উঠে দাঁড়াল। একবার গ্রে আরেকবার কুকুরের দিকে তাকাল ও।
‘তুমি বারটেলের সাথে থাকো,’ এক কদম পিছিয়ে গিয়ে গ্রে বলল।‘ ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও।
চোখ-মুখ শক্ত করে তাকাল ফিওনা। ‘তুমি চলে যাচ্ছ…’
‘আমি দুঃখিত।’ একটু আগে যেসব ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটে গেছে সেগুলোর পর এরকম “দুঃখিত” বলা কেমন যেন খেলো শোনায়। ফিওনার নানুর খুন হয়ে যাওয়া, দোকান পুড়ে যাওয়া, কোনমতে জীবন বাঁচানো। কিন্তু “দুঃখিত” ছাড়া আর কী বলবে গ্রে সেটা খুঁজে পেল না। এছাড়া বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার মতো সময়ও নেই ওর।
পেছনে থাকা বাগানের বেড়ার দিকে এগোল গ্রে।
‘হ্যাঁ, যাও, যাও, ভাগো!’ ফিওনা চিৎকার করল।
বেড়া ডিঙালো গ্রে। ওর মুখমণ্ডল জ্বালা করছে।
‘দাঁড়াও!’
গ্ৰে দাঁড়াল না। দ্রুত সরু গলিতে নেমে গেল। ফিওনাকে ওভাবে রেখে আসতে ওর ভাল লাগছিল না… কিন্তু আর কোনো উপায় নেই। ওকে একা রেখে আসাই ভাল হয়েছে। ওখানে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের লোকদের সাথে ও নিরাপদে থাকবে, আশ্রয় পাবে। গ্রে এখন যে জায়গায় যাচ্ছে ওখানে ১৫ বছর বয়সি মেয়ের কোনো স্থান নেই। এখনও গ্রের মুখ জ্বালাপোড়া করছে। যতই অজুহাত দিক না কেন, মনের গভীরে স্বার্থপরতার আঁচ পাচ্ছে ও। মেয়েটিকে একা রেখে আসতে পেরে ভার মুক্ত হয়েছে। বেঁচে গেছে দায়িত্ব নেয়া থেকে।
যা-ই হোক… যা হওয়ার হয়েছে।
সরু গলি দিয়ে দ্রুত এগোল ও। কোমরে পিস্তল গুঁজে রাইফেল থেকে সব গুলি বের করে ফেলল। তারপর রাইফেলটিকে একটা করাতকলের পেছনে ফেলে দিল গ্রে। এই অস্ত্র সাথে রাখা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এগোতে এগোতে সোয়েটার খুলে নিল ও। হোটেল ছেড়ে দিয়ে নিজের পরিচয় বদলে ফেলতে হবে। এখানে ঘটে যাওয়া খুনোখুনির তদন্ত হবে সেটা বলাই বাহুল্য। “ড. সয়্যার”-এর জীবনের এখানে সমাপ্তি।
