অনেক জানোয়ারের সাথে পরিচয় আছে খামিশির। জানোয়াররা তো এরকম আচরণ করে না। সিংহরা খাওয়ার পর কালেভদ্রে ভয় দেখায়। সাধারণত খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে ওরা আরাম করে। তখন ওদের বেশ কাছেও যাওয়া যায়। তবে সেটা একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত। একটি পরিতৃপ্ত প্রাণী কখনই স্রেফ আনন্দের জন্য এরকম একটা গণ্ডারকে ফেড়ে ফেলে না, পেট থেকে ওটার বাচ্চাকে টেনে বের করে নেয় না।
ড. ফেয়ারফিল্ড তার ভাষণ দিয়েই যাচ্ছে। বর্তমান বিপদটি যেন একটি ধাঁধা, ভেবে চিন্তে এটার সমাধান করতে হবে। বাড়িতে থাকা বিড়ালকে বেশ ভাল খাবার দাবার দেয়া হয়ে থাকে। তারপরও ওরা কিন্তু ইঁদুর ধরে। ইঁদুর ধরার খেলা খেলার জন্য যথেষ্ট শক্তি ও সময়ও থাকে বিড়ালগুলোর।
খেলা?
খামিশির ঠিক বিশ্বাস হলো না।
‘সামনে এগোন তো,’ বলল ও। মারশিয়ার ভাষণ আর শুনতে চায় না।
ড, মাথা নাড়ল কিন্তু শব্দগুলো ঘুরঘুর করতে লাগল খামিশির মাথায়। কোন ধরনের প্রাণী এভাবে খুন করে থাকে স্রেফ আনন্দের জন্য? উত্তর একটাই।
মানুষ।
কিন্তু গণ্ডারের যা হাল, ওটা তো কোনো মানুষের কাজ হতে পারে না।
কিছু একটা নড়াচড়া আবার খামিশির দৃষ্টি আকর্ষণ করল। এক মুহূর্তের মধ্যে একটি ধূসর অবয়ব জঙ্গলের কিনারার পেছনে গেল। চোখের কোণা দিয়ে বিষয়টা খেয়াল করল ও। সেদিকে ভাল করে তাকাতেই দেখা গেল সাদা ধোয়ার মতো বাতাসে মিলিয়ে গেছে ওটা।
সেই জুলু বৃদ্ধের কথাগুলো মনে পড়ল ওর।
অর্ধেক পশু, অর্ধেক ভূত…
এত গরমের ভেতরেও খামিশির শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। গতি বাড়িয়ে দিল সে। সামনে থাকা জীববিজ্ঞানীর প্রায় বরাবর চলে এল খামিশি। আলগা ধূলো-বালু উড়ল ওর দৌড়ের চোটে। প্রায় উপরে উঠে এসেছে ওরা। জিপ আর মাত্র ত্রিশ মিটার দূরে।
হঠাৎ ভারসাম্য হারাল ড. মারশিয়া।
হাঁটুর ওপর আছড়ে পেছনে খামিশির সাথে ধাক্কা লাগল তার।
হকচকিয়ে যাওয়ায় খামিশিও নিজের ভারসাম্য হারিয়ে পেছনে আছড়ে পড়ল। ঢালের খাড়া ঢালু অংশ নিচের দিকে গড়িয়ে নিয়ে চলল ওকে। প্রায় অর্ধেক পথ এভাবে গড়িয়ে যাওয়ার পর রাইফেল বাট ও পায়ের সাহায্যে খামিশি নিজের পতনরোধ করল।
অবশ্য ড. মারশিয়া গড়াগড়ি খায়নি। সে যেখানে পড়েছিল ওখানেই আছে। উঠে বসেছে। বড় বড় চোখ করে নিচ দিকে তাকিয়ে আছে ও।
উঁহু, খামিশি নয়।
ওর দৃষ্টি জঙ্গলের দিকে।
খামিশি হাঁটুর ওপর ভর করে উঠতে যেতেই ওর গোড়ালিতে ব্যথা অনুভব করল। মচকে গেছে কিংবা ভেঙ্গে গেছে। সে-ও তাকাল কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। তবে রাইফেল উঁচিয়ে ধরেছে।
‘যান!’ চিৎকার করল খামিশি। জিপে চাবি রেখেই এসেছে ও। ‘যান আপনি!
নরম মাটির দলা মাড়িয়ে ড. মারশিয়া উঠে দাঁড়াল।
আবার সেই চিৎকার শোনা গেল জঙ্গলের কিনারা থেকে।
কিছু না দেখেই ট্রিগার টেনে দিল খামিশি রাইফেলের শব্দে যেন এলাকা কেঁপে উঠল। চমকে উঠে ড. মারশিয়া চিৎকার করে উঠল। খামিশি আশা করল, রাইফেলের আওয়াজ ওই জানোয়ারকেও চমকে দেবে।
‘জিপে উঠে পড়ুন!’ নিচ থেকে চিৎকার করল খামিশি। ‘চলে যান! সময় নষ্ট করবেন না!’ উঠে দাঁড়াল ও। আহত গোড়ালির ওপরে ভর কম দিল। রাইফেল দিয়ে নিজের ভারসাম্য রক্ষা করছে। পুরো বন আবার সুনসান হয়ে গেছে।
ঢালের ওপরে পৌঁছে ড. মারশিয়া ডাকল, ‘খামিশি…’
‘জিপে উঠুন!
কাঁধের ওপর দিয়ে নিজের পেছনে ঝুঁকি নিয়ে তাকাল ও।
ঢাল ওঠা শেষ করে ড. ফেয়ারফিল্ড জিপের দিকে এগোচ্ছে। তার ওপরে থাকা বাওবাব গাছের ডাল খামিশির দৃষ্টি আকর্ষণ করল। গাছের কয়েকটি সাদা ফুল আস্তে করে দুলে উঠল।
অথচ এখানে কোনো বাতাস নেই।
‘মারশিয়া!’ গলা ফাটাল খামিশি। ‘না…!
খামিশির পেছনে হঠাৎ করে বুনো চিৎকার হলো। মারশিয়ার উদ্দেশে করা সতর্কবার্তা ঢাকা পড়ে গেল সেই চিৎকারের আড়ালে। তবে ড. ফেয়ারফিল্ড ঠিকই ওর দিকে এক পা বাড়িয়ে ছিল।
না…
বিশাল গাছের গভীর ছায়া থেকে ওটা লাফিয়ে নামল, অস্পষ্ট ফ্যাকাসে একটি অবয়ব। জীববিজ্ঞানীকে ধরে নিয়ে ওটা খামিশির চোখের আড়ালে চলে গেল। রক্ত হিম করা আর্তনাদ করে উঠল মারশিয়া, কিন্তু দুম করেই যেন সেটাকে থামিয়ে দেয়া হলো।
চারিদিকে আবার সুনসান নীরবতা।
জঙ্গলের দিকে তাকাল খামিশি।
ওপরেও মরণ, নিচেও মরণ।
খামিশির হাতে রাস্তা একটাই।
গোড়ালির ব্যথা উপেক্ষা করে দৌড় দিল ও।
খামিশি ঢালের নিচু অংশের দিকে নেমে যাচ্ছে।
মাধ্যাকর্ষণের ওপর নিজের শরীরের ভার তুলে নিয়ে গড়গড় করে নেমে গেল ও। তবে ব্যাপারটি এত সহজ নয়। ওকে সোজা করে রাখতে পা দুটো রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছে। নিচে পৌঁছুতে পৌঁছুতে জঙ্গলের দিকে তাক করে দ্বিতীয় বারের মতো ওর ডাবল ব্যারেল থেকে গুলি ছুড়ল খামিশি।
বুম।
শিকার করা ওর লক্ষ্য নয়। ও স্রেফ নিজের জীবনের জন্য বাড়তি কিছু সময় জোগাড় করার চেষ্টা করছে। গুলির ফলে রাইফেলের পেছন দিকে ধাক্কা দেয়, সেই ধাক্কায় ওর বরং উপকারই হলো। না হলে হয়তো মুখ থুবড়ে পড়ত খামিশি! ওর গোড়ালিতে যেন আগুন ধরে গেছে, হৃদপিণ্ডটা লাফাচ্ছে তবুও দৌড় বন্ধ করল না।
জঙ্গলের প্রান্তে বেশ বড় কিছুর নড়াচড়া দেখল কিংবা অনুভব করল খামিশি। ফ্যাকাসে ধাচের ছায়া।
