মাত্র একটি উপায় আছে।
ছাদের পানি গড়ানোর পাইপ ধরে সিঁড়ির ল্যান্ডিঙে নামল গ্রে। লোহার ল্যান্ডিঙে নামমাত্র টং করে শব্দ হলো। নিচু হলো গ্রে।
ওর মাথার ওপরে থাকা একটি ইটের দফারফা হয়ে গেল।
রাইফেল থেকে গুলি করা হয়েছে।
পায়ের গোড়ালিতে হাত দিয়ে ছোরা বের করে নিল গ্রে।
ফিওনা দেখে বলল, “আমরা কী করতে…’
‘তুমি এখানেই থাকবে,’ গ্রে আদেশ করল।
রেলিঙের ওপর হাত রাখল গ্রে। প্রতিপক্ষকে চমকে দিতে চাচ্ছে। কোনো ঢাল বা আমার নেই, অস্ত্রও নেই। আছে শুধু একটি ছোরা।
‘আমি যখন বলব তখন দৌড় দেবে,’ বলল গ্রে। সোজা সিঁড়ি দিয়ে নেমে গিয়ে পাশের বাড়ির বেড়া ডিঙিয়ে পালাবে। তারপর পুলিশ কিংবা ফায়ার সার্ভিসের কাউকে খুঁজে বের করবে, পারবে তো?’
ফিওনা গ্রে’র চোখের দিকে তাকাল। দেখে মনে হলো ফিওনা আপত্তি করবে কিন্তু। চোখ-মুখ শক্ত করে হা-সূচক মাথা নাড়ল।
লক্ষ্মী মেয়ে।
হাতে ছোরা নিয়ে ভারসাম্য ঠিক করে নিল গ্রে। আবার মাত্র একটা সুযোগ পাওয়া যাবে। বড় করে শ্বাস নিল ও। রেলিঙে লাফিয়ে উঠে নিচে ঝাঁপ দিল। ফুটপাতে ল্যান্ডিং করার আগে শূন্যে থাকা অবস্থায় একই সময়ে দুটো কাজ করল গ্রে।
‘দৌড়াও!’ চিৎকার করে বলল সে। একই সাথে লুকিয়ে থাকা অস্ত্রধারীকে তাক করে ছোরা ছুঁড়ে মারল। খুন করে ফেলার ইচ্ছে নেই, স্রেফ মনোযোগ ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা। এরকম কঠিন পরিস্থিতে একজন লোক রাইফেল তাক করে থাকলে কেমন যেন লাগে।
ভূমিতে অতরণ করে দুটো জিনিস লক্ষ করল ও।
একটি ভাল, অন্যটি মন্দ।
গ্রে ধাতব সিঁড়ি দিয়ে ফিওনার দৌড়ে যাওয়ার আওয়াজ পেল।
মেয়ে পালাচ্ছে।
ভাল।
অন্যদিকে গ্রে’র ছুঁড়ে দেয়া ছোঁড়াটি ধোয়ার চাদরের ভেতর দিয়ে গিয়ে ডাস্টবিনের গায়ে আঘাত হেনে ছিটকে পড়েছে। কাজের কাজ তেমন কিছুই হয়নি।
খারাপ কথা।
ঘাপটি মেরে থাকা লোকটি নিজের রাইফেল তুলে নিয়ে সোজা গ্রে’র বুক বরাবর তাক করল।
‘না!’ সিঁড়ির নিচে পৌঁছে চিৎকার করল ফিওনা।‘
ট্রিগার টানার সময় অস্ত্রধারী লোকটা হাসল না পর্যন্ত।
.
সকাল ১১টা ৫ মিনিট।
হুলহুলুই-আমলোজি গেম প্রিজার্ভ।
জুলুল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা।
‘দৌড় দিন!’ খামিশি আবার তাড়া দিল।
ড. মারশিয়াকে আর তাড়া দেয়ার প্রয়োজন ছিল না। জিপের দিকে ছুটে চলেছে ওরা দুজন। জলাধারের কাছে পৌঁছে গেছে ওরা। ড. মারশিয়াকে আগে এগিয়ে যাওয়ার জন্য ইশারা করল খামিশি। নল-খাগড়ার ভেতরে ঢুকল মারশিয়া, তবে তার আগে খামিশির চোখে চোখ পড়ল ওর। দু’জনের চোখেই আতঙ্ক।
জঙ্গলের ভেতরে যে প্রাণী চিৎকার জুড়ে দিয়েছিলে ওটা বোধহয় বেশ বড়সড় হবে। শব্দে তো সেরকমই মনে হলো। আর সম্প্রতি খুন করে ওটা বোধহয় আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে রয়েছে। পেছন ফিরে গণ্ডারের দেহাবশেষের দিকে তাকাল খামিশি। দানব আসছে কি-না, এই তথ্য ছাড়া এই বনের আর কোনো তথ্য আপাতত তার কোনো প্রয়োজন নেই।
চারিদিক দেখে নিয়ে জীববিজ্ঞানীকে অনুসরণ করে এগোচ্ছে খামিশি।
একটু পর পর নিজের কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনে তাকাচ্ছে, কান খুলে রেখেছে, কেউ ধাওয়া করছে কি-না সেটা জানার জন্য। পাশের জলাশয়ে কিছু একটা ঝপাৎ করে পড়ল। খামিশি ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দিল না। পানিতে ঝপাৎ করে পড়ার শব্দটা বেশ কমই ছিল। ওটাকে আমলে না নিলেও চলে। পোকামাকড়ের ঝি ঝি শব্দ আর নল-খাগড়া ভাঙ্গা শব্দগুলোকে এড়িয়ে গেল ও। তবে প্রকৃত বিপদ সংকেত সম্পর্কে সজাগ রয়েছে। খামিশির বয়স যখন ৬ বছর তখন ওর বাবা ওকে শিকার করা শিখিয়েছে। গাছপালার ভেতর দিয়ে কীভাবে শিকারকে খুঁজে নিতে হয় সেসব শিখিয়েছে ছিল ওর বাবা।
কিন্তু এখন ও শিকারি নয়, শিকার।
আতঙ্কিত হয়ে ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ ওর চোখ ও কান দুটোরই মনোযোগ আকর্ষণ করল।
একটু নড়াচড়া।
আকাশে।
শ্ৰাইক নামের একটি পাখি ডানা মেলেছে।
কিছু একটা ভয় পাইয়ে দিয়েছে ওকে।
কিছু একটা নড়ছে, এগোচ্ছে।
নল-খাগড়া পেরিয়ে আসার পর ড. মারশিয়ার সাথে নিজের দূরত্ব কমিয়ে নিল খামিশি। ‘জলদি।’ ক্লান্তিতে ফিসফিস করে বলল ও।
রাইফেল লাফিয়ে উঠতেই নিজের ঘাড় টান দিল ড. মারশিয়া। ওর চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, শ্বাস নিচ্ছে কষ্ট করে। ড.-কে পেরিয়ে সামনে তাকাল খামিশি। ওদের জিপ ঢালু অংশের ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাওবাব গাছের ছায়ায় পার্ক করা হয়েছিল ওটাকে। নিচে নামার সময় ঢালটিকে এত বড় আর খাড়া মনে হয়নি এখন যতটা মনে হচ্ছে।
‘এগোতে থাকুন।’ খামিশি তাড়া দিল।
ও পেছনে তাকিয়ে দেখল তামাটে রঙের একটি হরিণ বড় বড় লাফ দিয়ে জঙ্গলের কিনারা দিয়ে ধূলো উড়িয়ে গায়েব হয়ে গেল।
হরিণকে দেখে ওদের দুজনের পালানো শেখা উচিত।
ঢাল বেয়ে উঠছে ড. মারশিয়া। তার পাশে পাশে এগোচ্ছে খামিশি। পেছনে থাকা জঙ্গলের দিকে দোনলা রাইফেল তাক করে রেখেছে।
‘খাওয়ার জন্য খুন করেনি ওরা,’ সামনে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল ড. মারশিয়া।
গভীর জঙ্গলের দিকে খামিশি আবার ফিরে তাকাল। ড, ঠিক বলছে কি-না সেটা ও কীভাবে বুঝবে?
‘ক্ষুধা ওদেরকে হিংস্র করেনি,’ জীববিজ্ঞানী বলে যাচ্ছে। কথা বলে নিজের আতঙ্ক একটু কমানোর চেষ্টা হয়তো। ‘গণ্ডারের তেমন কিছুই খায়নি। দেখে মনে হলো, ওরা আনন্দের জন্য খুন করেছে। বাড়ির বিড়াল যেভাবে ইঁদুর শিকার করে, অনেকটা সেরকম।
