অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়াল ড. ফেয়ারফিল্ড।
ছায়ায় ঢাকা জঙ্গলের বুক চিরে ঠিক ওদের ডান দিক থেকে উঁচু লয়ের বুনো চিৎকার —হুঁউউ ইইইই ওওওও–ভেসে এলো।
নিজের জায়গায় দাঁড়ানো অবস্থায় টলে উঠল খামিশি। এই চিৎকার ওর চেনা। শুধু স্মৃতিশক্তি কিংবা মগজ দিয়ে নয় মেরুদণ্ডের শিরশিরে অনুভূতি দিয়েও চেনে এই চিৎকার। গভীর রাতে করা ক্যাম্পফায়ার, রক্ত আর ভয়ের গল্প কিংবা আদিকালের কাহিনিতেও এই চিৎকার শোনা যায়।
উকুফা।
মৃত্যু।
চিৎকার ধীরে ধীরে বাতাসে মিলিয়ে যেতেই আবার নীরবতা নেমে এলো।
মনে মনে ওদের দুজনের কাছ থেকে জিপের দূরত্ব আন্দাজ করল খামিশি। ওদের এখান থেকে কেটে পড়তে হবে তবে সেটা তাড়াহুড়ো করে নয়। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পালাতে গেলে দানবের রক্ততৃষ্ণা বাড়বে, কাজের কাজ কিছুই হবে না।
জঙ্গলের বাইরে আরেকটি চিৎকার শোনা গেল।
তারপর আরও একটি।
আরেকটি।
সব ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে আসছে।
পরমুহূর্তেই খামিশি বুঝতে পারল মাত্র একটি সুযোগ আছে ওদের হাতে। ‘দৌড় দিন।’
.
সকাল ৯ টা ৩১ মিনিট।
কোপেনহ্যাগেন, ডেনমার্ক।
ছাদের টাইলসের ওপর পেটে ভর দিয়ে উপুড় হয়ে পড়ে আছে গ্রে। মাথা নিচু করে ফিওনাকে ধরতে ব্যর্থ হওয়ার স্থানে হাত পা ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে ও। মেয়েটির হাদের কিনারা দিয়ে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য বারবার ওর মানসপটে ভেসে উঠছে। বুকের ভেতর লাফাচ্ছে হৃদপিণ্ডটা।
ওহ, খোদা… এ কী করলাম আমি…?
ওর কাঁধের ওপরে চিলেকোঠা দিয়ে আগুনের নতুন লেলিহান শিখার বিস্ফোরণ হলো। উপরি হিসেবে ধেয়ে এলো ধোঁয়া আর তপ্ত হাওয়া। হতাশা সরিয়ে রেখে নড়তে হলো ওর।
কনুইতে ভর দিয়ে উঠতে শুরু করল গ্রে। একটু পর পর আগুন যেখান দিয়ে উঁকি দিচ্ছে ওদিকে ঝুঁকল ও। পিছু হটল একটু পরেই। নিচ থেকে কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। লুকোচুরি করে তাগাদা দিচ্ছে কণ্ঠগুলো। গ্রে’র একদম কাছে… একটু গোঙানি শোনা গেল। ছাদের ঠিক নিচেই।
ফিওনা…?
গ্রে আবার নিজের পেটের ওপর ভর দিল। ছাদের কিনারা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত গতিতে পিছলে নামল ও। নিচের জানালাগুলো থেকে ভকভক করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। গ্রে এই ধোয়ার চাদরকে নিজের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করল। ছাদ থেকে পানি গড়ানোর পাইপের কাছে পৌঁছে নিচে তাকাল ও।
ঠিক ওর নিচেই একটি লোহার বারান্দা… না ঠিক বারান্দা নয়। এটা সিঁড়িতে নামার একটি জায়গা। ফিওনা বলেছিল বিল্ডিঙের বাইরে একটি সিঁড়ি আছে, এই হলো সেই সিঁড়ি।
সিঁড়ির ল্যান্ডিঙের ওপর একটি মেয়ে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে।
দ্বিতীয়বারের মতো গুঙিয়ে রেলিং ধরে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল ফিওনা।
অন্যরা ওর নড়াচড়া লক্ষ করছে।
নিচের উঠোনে গ্রে দুজনকে দেখতে পেল। তাদের একজন ফুটপাতের মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছে, কাঁধে রাইফেল। আয়েশ করে গুলি করার সুযোগ খুঁজছে সে। অ্যাপার্টমেন্টের ভাঙ্গা জানালা থেকে বেরুনো কালো ধোয়া ফিওনাকে আড়াল করে রেখেছে। রেলিঙের ওপরে ফিওনার মাথা ওঠার জন্য অপেক্ষা করছে অস্ত্রধারী।
নিচু হয়ে থাকো, ফিসফিস করে ফিওনাকে বলল গ্রে।
ওপর দিকে তাকাল ফিওনা। ওর কপালের ওপর দিয়ে তাজা রক্ত গড়াচ্ছে।
দ্বিতীয় অস্ত্রধারী ঘুরে দাঁড়াল। কালো পিস্তল লোড করে সিঁড়ির দিকে তাক করল সে। ওর মতলব হলো এই বিল্ডিং থেকে পালানোর সব রাস্তা বন্ধ করা।
গ্রে ফিওনাকে ইশারা করে বলল, ও যেন নিচু হয়ে থাকে। তারপর গ্রে ছাদের কিনারা ঘেঁষে নিজের শরীর গড়িয়ে দিল। পৌঁছে গেল দ্বিতীয় অস্ত্রধারীর ওপরে। ধোয়ার চাদর এখনও ওকে আড়াল দিয়ে যাচ্ছে। সিঁড়ির দিকেই অস্ত্রধারীর মনোযোগ বেশি। নিজের পজিশনে থেকে অপেক্ষা করল গ্রে। ওপর থেকে গড়িয়ে নামার সময় ফিওনার ধাক্কায় আলগা হয়ে যাওয়া ছাদের একটি টাইল ডান হাতে তুলে নিল ও।
আঘাত করার জন্য হয়তো মাত্র একবারই সুযোগ পাবে।
নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি হাতের পিস্তল দিয়ে সিঁড়িতে আগত যেকোনো লোককে পরপারে পাঠানোর জন্য একদম তৈরি হয়ে আছে।
ছাদের কিনারায় গিয়ে কুঁকল গ্রে, হাত উঁচু করে রেখেছে।
শিস বাজাল তীক্ষ্ণ শব্দে।
ওপরে তাকাল অস্ত্রধারী, হাতের অস্ত্র ঘুরিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল সে; চোখ ধাঁধানো দ্রুতগতিতে…
কিন্তু মাধ্যাকর্ষণের গতি তার চেয়ে বেশি।
হাতে থাকা টাইল ছুঁড়ে মারল গ্রে। কুড়ালের মতো বাতাস কেটে একদম অস্ত্রধারীর চেহারায় গিয়ে আঘাত হানল ওটা। ছিটকে রক্ত বেরুল লোকটির নাক দিয়ে। ঠাস করে ফুটপাতে আছড়ে পড়ল সে। রাস্তার ওপর ওর মাখা ড্রপ খেল। শেষ, আর কোনো নড়াচড়া নেই।
ফিওনার কাছে ফিরল গ্রে।
চিৎকার করে উঠল আরেক অস্ত্রধারী।
গ্রে তার ওপর দৃষ্টি রাখল। গ্রে ভেবেছিল সহযোগীকে লুটিয়ে পড়তে দেখে এই ব্যাটা বোধহয় সাহায্য করতে এগিয়ে যাবে কিন্তু কপাল খারাপ। অস্ত্রধারী বিপরীত দিকে দৌড় দিল। ডাস্টবিনের আড়ালে নিজেকে লুকোনোর চেষ্টা করলেও গ্রে’র আক্রমণ করার রাস্তা এখনও খোলা আছে। ওর পজিশন হলো পুড়ে দোকানের পেছনের অংশে। এবার পাশের জানালা থেকে বেরিয়ে আসা ধোয়ার সুবিধে পাচ্ছে ও।
ফিওনার দিকে ফিরে নিচু হয়ে থাকার জন্য আবারও ইশারা করল গ্রে। ফিওনাকে ওপরে উঠিয়ে আনতে গেলে মৃত্যু ঝুঁকি নিতে হবে ওদের। বেশ কিছুক্ষণ ওদেরকে উক্ত অবস্থায় থাকতে হবে।
