মারশিয়া তার পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। ‘উঁহু, আমার তা মনে হয় না। গতরাত থেকে এই লাশ এখানে পড়ে আছে। কাছেই জলাধার। আর কিছু না হোক, গণ্ডারের ভেতরের সবকিছু তো শিয়ালেরই পরিষ্কার করে ফেলার কথা।’
দেহাবশেষের উপর আবার চোখ বুলাল খামিশি। পেছনে ছেঁড়া পা আর ফেড়ে যাওয়া গলা দেখল ও। বড় কোনো প্রাণী গণ্ডারটিকে কাবু করেছিল এবং সেটা করেছিল খুব দ্রুত।
ওর গলার পেছনে কেমন যেন এক খচখচানি শুরু হলো। ‘
মরা দেহ খাওয়ার প্রাণীগুলো ছিল কোথায়?
এই রহস্যের গভীরে চিন্তা করার আগেই ড. খামিশিকে বলল ‘বাচ্চা নেই। চলে গেছে।’
‘কী?’ এদিকে ঘুরে দাঁড়াল খামিশি। আপনি না বললেন গণ্ডার কোনো বাচ্চা জন্ম দেয়নি।
ড. মারশিয়া উঠে দাঁড়িয়ে হাত থেকে গ্লোভস খুলে রাইফেল তুলে নিল। ভূমিতে চোখ রেখে গণ্ডারের লাশের কাছ থেকে সরে যেতে লাগল ও।
খামিশি খেয়াল করল ড. রক্তের সেই দাগ অনুসরণ করছে। আয়েশ করে খাওয়া জন্য গণ্ডারের পেট থেকে কিছু একটাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ওদিক দিয়ে।
ওহ, ঈশ্বর…
মারশিয়ার পিছু নিল ও।
ঝোঁপ-ঝাড়ের কাছে গেল ড. ফেয়ারফিল্ড। ওর রাইফেলের ডগা দিয়ে কিছু খাটো ডালপালা সরিয়ে দেখতে পেল, পেট থেকে কী বের করে আনা হয়েছে।
একটি গণ্ডারের বাচ্চা।
হাড্ডিসার শরীরটিকে বিভিন্ন অংশে টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়েছে, দেখে মনে হয়েছে এর সাথে কেউ রীতিমতো কুস্তি লড়েছে।
‘আমার মনে হয়, মায়ের পেট থেকে যখন বাচ্চাটিকে বের করা হচ্ছিল ওখনও জীবিত ছিল বাচ্চাটি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রক্তের দাগের দিকে ইঙ্গিত করে বলল ড. ফেয়ারফিল্ড, বেচারা।’
পিছু হটল খামিশি। মারশিয়ার করা শেষ প্রশ্নটি ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। দেহাবশেষটুকু বিভিন্ন মাংসভোজী প্রাণীরা খেয়ে শেষ করল না কেন? শকুন, শিয়াল, হায়েনা, এমনকী সিংহ; এদের কেউ-ই কেন গণ্ডারের দেহাবশেষ খেয়ে শেষ করল না? ড. মারশিয়ার প্রশ্নটি একদম যৌক্তিক। এত মাংস তো মাছি আর লার্ভার জন্য পড়ে থাকার কথা নয়।
কেন এমন হলো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।
যদি না…
খামিশির বুকে ধুকপুকানি বেড়ে গেল।
যদি না সেই প্রাণীটি এখনও এখানে থাকে। প্রাণীটি যদি এখানে এখনও থেকে থাকে তাহলে অন্য কেউ এদিকে আসার সাহস না-ও পেতে পারে। নিজের রাইফেল উঁচু করে ধরল খামিশি। ও লক্ষ করল, ছায়া ভরা ঝোঁপ-ঝাড়ের ভেতরে এখনও সুনসান নীরবতা। গণ্ডারটিকে যে প্রাণী মেরে থাকুক, মনে হচ্ছে পুরো জঙ্গল সেটার ভয়ে সিটিয়ে রয়েছে।
বাতাসে ঘ্রাণ খুঁকে, কান পেতে আর তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করল খামিশি। ওর চারপাশের ছায়া যেন ধীরে ধীরে আর গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে।
সাউথ আফ্রিকায় নিজের ছোটবেলা কাটানোর ফলে খামিশি এক জঙ্গল থেকে আরেক জঙ্গলে দাপিয়ে বেড়ানো বিভিন্ন অলৌকিক ধারণা, দানবের ফিসফিসানি সম্পর্কে ওর জানাশোনা আছে। দ্য ndalaw০, উগান্ডার জঙ্গলের গর্জন করা এক নরখাদক; দ্য mbilinto, কঙ্গোর হাতির মতো বিরাটাকার জলহস্তী; দ্য mngwa, সমুদ্রতীরের নারিকেল বাগানে ওঁত পেতে থাকা লোমশ দানব ইত্যাদি।
কিন্তু আফ্রিকায় কখনও কখনও পৌরাণিক কাহিনিগুলো বাস্তবে হাজির হয়ে যায়। যেমন: nsui-fisi, রোডেশিয়ার নরখাদক, যার গায়ে ছোরা কাটা দাগ আছে। সাদা চামড়ার লোকদের মুখ থেকে ওটার নানান শোনা কাহিনি থেকে জানা যায়। তবে তার এক দশক পর আবিষ্কার হলো ওটা ছিল চিতার একটি নতুন জাত চিতার শ্রেণিবিভাগ অনুযায়ী ওটাকে Acinonyx rex গোত্রে ফেলা হয়েছে।
জঙ্গলে চোখ বুলাতে বুলাতে আরেকটি কিংবদন্তি দানবের কথা মনে পড়ল খামিশির। পুরো আফ্রিকা জুড়ে পরিচিতি ছিল তার। নানান রকম নাম ছিল : দ্য dubu, দ্য lumbwa, দ্য kerit, দ্য getet ইত্যাদি। স্থানীয় লোকজনদের মনে এই নামগুলো ত্রাসের সৃষ্টি করতো। গরিলার মতো বিরাটাকৃতির দানবটি ছিল দ্রুতগামী, ভীষণ চালাক এবং হিংস্র। সাক্ষাৎ যমদূত বলতে যা বোঝায় আরকী! প্রায় এক শতাব্দী জুড়ে বিভিন্ন সময় সাদা ও কালো চামড়ার নানান লোক দাবি করেছে, ওই দানবকে এক নজর হলেও দেখেছে তারা। এখানকার সব বাচ্চাদেরকে ওই দানবের বিশেষ গর্জন সম্পর্কে শিক্ষা দিয়ে বড় করা হয়ে থাকে। এই জুলু সম্প্রদায়ও সেটার ব্যতিক্রম নয়।
‘উকুফা…’ বিড়বিড় করল খামিশি।
‘কিছু বললেন?’ ড. মারশিয়া জিজ্ঞেস করল। গণ্ডারের মৃত বাচ্চার পাশে বসে রয়েছে সে।
জুলু সম্প্রদায় ওই দানবকে এই নামে ডেকে থাকে।
উকুফা।
মৃত্যু।
ওই দানবের কথা খামিশির এই মুহূর্তে মনে পড়ার একটি কারণ আছে। পাঁচ মাস আগে, উপজাতির এক বুড়ো বলেছিল সে নাকি এইখানে কোথাও একটি উকুফা দেখেছে। অর্ধেক পশু, অর্ধেক ভূত, চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছিল ওটার, কোনোমতে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেছিল সে।
কিন্তু আজ এখানে এই গভীর ছায়ার ভেতরে…
‘আমাদের চলে যাওয়া উচিত,’ বলল খামিশি।
“কিন্তু আমরা তো এখনও জানি না গণ্ডারটাকে কীসে মেরে ফেলেছিল?
‘কোনো শিকারির কাজ নয় এটা।’ এই মুহূর্তে খামিশির এরচেয়ে বেশি জানার কোনো প্রয়োজন নেই। জিপের দিকে রাইফেল তাক করল ও। প্রধান ওয়ার্ডেনকে রেডিওতে পুরো বিষয়টি জানিয়ে দিতে পারে খামিশি। বুনো জানোয়ারের আক্রমণে মৃত্যু, কোনো শিকারির কাজ নয়। আর এই দেহাবশেষকে বিভিন্ন প্রাণীর খাবার হিসেবে রেখে গেলেই ল্যাঠা চুকে যায়। তাতে খাদ্যশৃঙ্খল বজায় থাকে। বুনো জীবন তো এভাবেই চলে আসছে।
