ফ্যাট বয় হিসেবে থাকতে ওর কোনো আপত্তি নেই, যদি এভাবে থেকে ওর উদ্দেশ্য হাসিল হয়…
‘ওই যে!’ ৬, ফেয়ারফিল্ড চিৎকার করে উঠল। খামিশির পেছনে থাকা প্যাচানো রাস্তার দিকে নির্দেশ করে বলল, বাওবাব গাছের বাঁ দিক দিয়ে পাহাড়টির নিচে চলুন
প্রাগৈতিহাসিক বিরাটাকার গাছটি চোখে পড়ল খামিশির। গাছটির প্রত্যেকটি শাখা-প্রশাখা থেকে বড় বড় সাদা ফুল ফুটে রয়েছে। গোলাকার বাটি আকৃতির রাস্তা নেমে গেছে গাছের বাম দিক দিয়ে। পানিতে যেন চিকচিক করে উঠল, খেয়াল করল খামিশি।
ডোবা।
পুরো পার্কে এরকম ডোবা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কোনোটা প্রাকৃতিক আবার কোনোটা কৃত্রিম। বুনো জীবজন্তু দেখার সেরা জায়গা হলো ওই জলাধারগুলো তবে পায়ে হেঁটে গেলে ব্যাপারটা অনেক বিপজ্জনক।
‘আমাদেরকে তো এখান থেকে হেঁটে যেতে হবে। গাছের কাছে গিয়ে একটু গলা চড়িয়েই বলল খামিশি।
ড, মাথা নাড়ল। রাইফেল তুলে নিল দু’জন। ওরা দুজনই বন্য প্রাণী রক্ষা ও সংরক্ষণের জন্য কাজ করলেও দক্ষিণ আফ্রিকার বুনো পরিবেশে কীরকম বিপদ ওঁত পেতে থাকে সে সম্পর্কে জানে।
জিপ থেকে নেমে একটি বড়-বোর ডাবল রাইফেল .৪৬৫ নিট্রো হল্যান্ড অ্যান্ড হল্যান্ড রয়্যাল নিজের কাঁধে ঝোলাল খামিশি। তেড়ে আসা পাগলা হাতিকে থামানোর ক্ষমতা রাখে এই অস্ত্র। বুনো পরিবেশে এরকম করিৎকর্মা রাইফেল খামিশির বেশি পছন্দ।
ঝোঁপ-ঝাড় ও ঘাস মাড়িয়ে ঢাল বেয়ে ওরা নামতে শুরু করল। ওদের মাথার ওপরে একটি গাছের ডাল-পালা সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা করলেও গভীর ছায়া তৈরি করল নিচে। সামনে এগোতে এগোতে খামিশি খেয়াল করল চারিদিক বেশ নিশ্চুপ। কোনো পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে না। বানরের চেঁচামেচি নেই। কিছু পোকামাকড়ের ঝিঁঝি আওয়াজ ছাড়া কোনো শব্দ নেই এখানে। এরকম নীরবতা দেখে দাঁতে দাঁত পিষল খামিশি।
ওর পাশে, ড. মারশিয়া তার জিপিএস ট্রাকার চেক করছে।
এক হাত উঁচিয়ে নির্দেশ করল ড.। একটি কর্দমাক্ত ডোবার পাশ নির্দেশ করা হয়েছে। খামিশি নল-খাগড়ার ভেতর গিয়ে এগোতেই পচা মাংসের দুর্গন্ধ এসে ধাক্কা মারল। এরকম উৎকট দুর্গন্ধের উৎস খুঁজে বের করতে খুব একটা সময় লাগল না।
কালো গণ্ডারটির ওজন হবে প্রায় তিন হাজার পাউন্ড। রীতিমত দানবাকৃতির।
‘ওহ ঈশ্বর, নাকে-মুখে রুমাল চেপে বিস্ময় প্রকাশ করল ড. মারশিয়া। ‘হেলিকপ্টার থেকে যখন রবার্টো দেহের অবশিষ্টাংশ দেখিয়েছিল…’।
‘সবসময় মাঠে নামলে দেখা যায় অবস্থা আরও জঘন্য,’ বলল খামিশি।
ফুলে ওঠা দেহাবশেষের দিকে এগোল ও। বাঁ কাত হয়ে পড়ে রয়েছে ওটা। ওরা এগোতেই মাছি কালো মেঘ তৈরি করে উড়াল দিল। গণ্ডারটির পেট চিড়ে দেয়া হয়েছে। পাকস্থলী থেকে মলদ্বার পর্যন্ত খাদ্যনালীর নিচের অংশ বেরিয়ে এসেছে, গ্যাসে ফুলে উঠেছে। ফুলে যাওয়ায় এইসব কিছু গারটির পেটে কীভাবে ছিল, কীভাবে জায়গা করে নিয়েছিল ভাবতে অসম্ভব মনে হচ্ছে। দেহের অন্যান্য অঙ্গ গড়াগড়ি খাচ্ছে ধূলোয়। রক্তের দাগ দেখে মনে হচ্ছে পাশে থাকা জঙ্গলের ভেতরে এখান থেকে কিছু একটা টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
মাছিগুলো উড়াউড়ি বন্ধ করে আবার যে যার জায়গায় বসে পড়ল।
কামড়ে খাওয়া লাল কলিজার কাছে এগোল খামিশি। গণ্ডারটির পেছনের অংশ দেখে মনে হচ্ছে উরুর অংশ থেকে রীতিমতো ফেড়ে ফেলা হয়েছে। চোয়ালে কতটা শক্তি থাকলে এরকম কাজ করা সম্ভব…।
এমনকী একটি প্রাপ্তবয়স্ক সিংহের পক্ষেও এরকম অবস্থা করা কঠিন।
গণ্ডারের মাথার কাছে যাওয়ার আগ পর্যন্ত খামিশি ঘুরে ঘুরে দেখল খামিশি।
গণ্ডারের খাটো-মোটা গোছের একটি কান কামড়ে ছিঁড়ে নেয়া হয়েছে। গলা চিরে দেয়া হয়েছে নৃশংসভাবে। প্রাণহীন কালো চোখ দুটো নিথর তাকিয়ে রয়েছে খামিশির দিকে। আতঙ্কে চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেছে। ভয়ে কিংবা যন্ত্রণায় ঠোঁট দুটো উঠে গেছে পেছন দিকে। মুখ থেকে চওড়া জিহ্বা বেরিয়ে এসেছে, শরীরের নিচে যেন রক্তের পুকুর। কিন্তু এগুলোর কিছুই তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়।
খামিশি জানে, ওকে কী পরীক্ষা করতে হবে।
ফেনা ও ছোট ঘোট ফুটকিঅলা নাকের ওপরে থাকা গণ্ডারের শিংটি একদম অক্ষত অবস্থায় আছে।
‘একাজ কোনো শিকারি করেনি, নিশ্চিত।’ বলল খামিশি।
শিকারির কাজ হলে এই শিং আর থাকতো না। এই শিং-এর কারণেই গণ্ডারের সংখ্যা এখনও আশংকাজনক হারে কমছে। এশিয়ার বাজারে এই শিঙের গুড়োকে পুরুষাঙ্গের বলবর্ধক হিসেবে বিক্রি করা হয়ে থাকে। গণ্ডারের একটি শিঙের দাম নেহাত কম নয়।
খামিশি সোজা হয়ে দাঁড়াল।
গণ্ডার দেহের অন্য পাশে গিয়ে বসল ড. মারশিয়া। শরীরের সাথে ঠেস দিয়ে রাইফেলটিকে দাঁড় করিয়ে রেখে হাতে প্লাস্টিকের গ্লোবস পরে নিয়েছে ও। গণ্ডারটা কোনো বাচ্চা প্রসব করেছে বলে তো মনে হচ্ছে না।
‘তাহলে কোনো বাচ্চাও এতিম হচ্ছে না।
জীববিজ্ঞানী মারশিয়া দেহাবশেষের গর্ভের কাছে আবার এগিয়ে গেল। সামনে ঝুঁকে কোনো সংকোচ না করে ফেড়ে দেয়া গর্ভের এক অংশ খুলে ভেতরে হাত দিল।
অন্যদিকে ঘুরল খামিশি।
“শকুন কিংবা অন্য কোনো প্রাণী এখনও এই দেহাবশেষ চেটে-পুটে খায়নি কেন? কাজ করতে করতে প্রশ্ন করল মারশিয়া।
‘গণ্ডারের মাংস তো আর কম নয়, খামিশি বিড়বিড় করল। পেছনে গোল হয়ে হাঁটছে ও। এখানকার এরকম সুনসান নীরবতা ওর অস্বস্তি হচ্ছে। ওপর থেকে সূর্যের তাপ যেন ঠেসে ধরেছে ওদের।
