গেম ওয়ার্ডেন হিসেবে মারসিয়ার কথার মর্মার্থ বুঝতে পারল খামিশি। ১৯৭০ সাল থেকে কালো রাইনো (গণ্ডার) এর সংখ্যা আফ্রিকা থেকে ৯৬% কমে গেছে। কালো রাইনোর এই বিলুপ্তি রোধ করার চেষ্টা করছে হুলুহুলুই-আমলোজি। এখানে সাদা রাইনো আছে। এই পার্কের অন্যতম প্রধান চেষ্টা হলো কালো রাইনোর বিলুপ্তি বন্ধ করা।
প্রত্যেকটি কালো রাইনো গুরুত্বপূর্ণ।
‘ট্রাকিং ইমপ্ল্যান্ট (কারও অবস্থান জানার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্র) ব্যবহারের কারণে আমরা ওর অবস্থান জানতে পেরেছি, নইলে এটা সম্ভব হতো না। বলল ড. ফেয়ারফিল্ড। হেলিকপ্টার দিয়ে ওকে দেখলাম ঠিকই কিন্তু যদি বাচ্চার জন্ম দিয়ে দেয় তাহলে তো সেই বাচ্চার আর হদিস জানার উপায় থাকবে না।’
‘কেন, মায়ের সাথেই তো বাচ্চার থাকার কথা, তাই না? খামিশি জানতে চাইল। এর আগে এরকম ঘটনা সে নিজে দেখেছে। দুই বছর আগের কথা, এক জোড়া সিংহের বাচ্চা ওদের মায়ের ঠাণ্ডা পেটের কাছে গাদাগাদি করে বসেছিল। ওদের মা মারা গিয়েছিল শৌখিন শিকারির গুলিতে।
‘এতিমদের কপালে কী জোটে তা তো জানেন। শিকারি প্রাণীগুলো হামলে পড়বে। যদি বাচ্চাটি ইতোমধ্যে ভূমিষ্ঠ হয়ে রক্তমাখা শরীর নিয়ে…
খামিশি মাথা নাড়ল। গ্যাস পেডালে চাপ দিয়ে জিপকে খাড়া পাথুরে ঢালে লাফিয়ে নিয়ে গেল ও। এলোমলো অবস্থায় কিছু নুড়ি-পাথর পড়ে রয়েছে, ও সেগুলোর তোয়াক্কা করল না।
পাহাড় পেরিয়ে সামনে এগিয়ে দেখা গেল ওদের সামনের মি গভীর উপত্যকায় দুই ভাগ হয়ে গেছে। এই দুই ভাগ করার কাজটি করে দিয়েছে নদীর ক্ষীণকায় জলধারা। এখানে গাছপালার পরিমাণ বেশি ডুমুর, মেহগনি ও নায়লা গাছ রয়েছে। এই পার্কের অন্যতম “ভেজা” অঞ্চল এটি। সাধারণত পর্যটকরা যেদিক দিয়ে চলাচল করে সেখান থেকে এই জায়গাটির অবস্থান বেশ দূরে, একটু তফাতে। এখানে অনুমতিপ্রাপ্ত স্বল্প সংখ্যক কিছু লোক প্রবেশ করতে পারে এবং সেই প্রবেশেরও সময়সীমা বেঁধে দেয়া আছে। যেমন : দিনের আলোতে আসা যাবে, কোনোভাবেই রাত কাটানো যাবে না ইত্যাদি। পার্কের পশ্চিম সীমান্ত ঘেঁষে এই অঞ্চলের অবস্থান।
খাড়া ঢাল থেকে জিপ নামানোর সময় দিগন্তে চোখ বুলাল খামিশি। মাইল খানিক দূরে, গেম ফেন্সিং (বেড়া) ভেঙ্গে গেছে। দশ ফুট উঁচু এই বেড়াটি পার্শ্ববর্তী সংরক্ষিত ব্যক্তিগত এলাকা থেকে আলাদা করেছে পার্ককে। এরকম সংরক্ষিত এলাকায় সব সময় পার্কের সীমানা থাকে যাতে পর্যটকরা পার্কের বন্য পরিবেশকে একদম কাছ থেকে উপভোগ করতে পারে।
কিন্তু এটা কোনো সাধারণ সংরক্ষিত এলাকা নয়।
১৮৯৫ সালে হুলুহুলুই-আমলোজি পার্ক স্থাপন করা হয়। পুরো আফ্রিকার সবচেয়ে পুরোনো অভয়ারণ্য এটা। এর পাশে থাকা সংরক্ষিত এলাকাটি এর চেয়েও পুরোনো। জমির মালিক ওয়ালেনবার্গ, এরা একদম খাঁটি বোয়্যার পরিবার। সাউথ আফ্রিকার রাজবংশের লোক বলা যায় এদের, সেই সতেরশ শতাব্দী থেকে এদের প্রজন্ম চলে আসছে। পার্ক স্থাপনের আগে থেকেই এই জমির মালিক তাঁরা। পার্কের আকারের চার ভাগের তিন ভাগ হলো এই সংরক্ষিত এলাকা। এখানে প্রচুর পরিমাণে বন্য প্রাণী আছে। হাতি, গণ্ডার, চিতা, সিংহ ও কেইপ মহিষই নয় বিভিন্ন প্রজাতির শিকারি প্রাণীও আছে এখানে : নাইল কুমির, জলহস্তি, চিতা, হায়েনা, হরিণ, শিয়াল, জিরাফ, জেব্রা, কুতু, ওয়াটারবাক, রিডবাক, শুয়োর, বেবুন ইত্যাদি। বলা হয়ে থাকে এখানে নাকি মালিকদের অজান্তে বেশকিছু দুর্লভ ওকাপি (আফ্রিকার রোমন্থক প্রাণী) বাস করছে। ১৯০১ সালে জিরাফের আত্মীয়র কাতারে পড়া এই প্রাণী আবিষ্কৃত হয়।
ওয়ালেনবার্গের এই সংরক্ষিত এলাকা নিয়ে বরাবরই বিভিন্ন গুজব চালু রয়েছে। পার্কে ছোট প্লেন কিংবা হেলিকপ্টার নিয়ে প্রবেশ করা যায়। বনে যাওয়ার আগ পর্যন্ত অবশ্য রাস্তা ধরেই এগোনো সম্ভব। আর এখানকার দর্শনার্থীরা মামুলি কেউ নন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা আসেন এখানে। কথিত আছে, টেডি রুজভেল্ট এখানে এসে শিকার করে যাওয়ার পর আমেরিকার ন্যাশনাল পার্কের সিস্টেম গড়ে ছিলেন।
এই পার্কে একটি দিন কাটানোর জন্য খামিশি ওর সামনের দুটো দাঁত দিতেও রাজি!
কিন্তু হুলুহুলুই-এর প্রধান ওয়ার্ডেন-ই শুধু সেটা করার অধিকার রাখেন। ওয়ালেনবার্গ স্টেটে একবার ঘুরে এসে এই পার্কের বিভিন্ন গোপনীয়তা জানার ভীষণ কৌতূহল জেগেছে খামিশির। ও আশা করে, একদিন নিজের কৌতূহল মেটাতে পারবে।
কিন্তু আশা করলেই তো সব আশা পূরণ হয় না।
ওর এই কালো চামড়ায় তো নয়-ই।
জুলু বংশের লোক আর শিক্ষাগত যোগ্যতা ওকে হয়তো এই চাকরি পাওয়া পর্যন্ত সাহায্য করতে পেরেছে কিন্তু ওর সীমানা এপর্যন্তই। যদিও এখানে আর আগের মতো বর্ণবৈষম্য নেই। তবে ঐতিহ্য মেনে এগোতে গেলে চামড়া কালো হোক বা সাদা কঠিন পথ পাড়ি দিতেই হবে। তার ওপর খামিশির বর্তমান পদটি খুব একটা শক্ত-পোক্ত নয়। এখানকার বিভিন্ন স্থানীয় গোত্রের বাচ্চাদেরকে সাধারণত অল্প শিক্ষা কিংবা অশিক্ষিত করে গড়ে তোলা হয়। শিক্ষার এরকম দশা হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ আছে। যেমন : উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, অর্থ সঙ্কট, পৃথককরণ ও অস্থিরতা ইত্যাদি। সংক্ষেপে বললে, এই প্রজন্মের তেমন কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তাই খামিশি ওর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। নিজে শিক্ষিত হয়েছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের সুবিধার জন্য যতদূর সম্ভব সুযোগ-সুবিধা করে দিয়ে যেতে চায় সে।
