পালানোর স্বার্থে ছাদের টাইলসগুলো পরীক্ষা করল গ্রে। জায়গাটি বেশ খাড়া ও ঢালু তবে ওর জুতোয় বেশ ভাল গ্রিপ আছে। সাবধানে হাঁটলে, সম্ভব। জানালার কাছ থেকে সরে উত্তরদিকের ছাদের কিনারার দিকে এগোল ও। সামনে দুটো বিল্ডিঙের মাঝে প্রায় ফুট তিনেক ফাঁকা জায়গা আছে। সমস্যা নেই, এটুকু ওরা লাফিয়ে পার হয়ে যেতে পারবে।
সন্তষ্ট হয়ে জানালার দিকে ফিরল ও। “ঠিক আছে, ফিওনা… সাবধানে।
ফিওনা জানালা দিয়ে আগে মাথা বের করে চারিদিক দেখে নিল, তারপর নামল ছাদে। নিচু হয়ে প্রায় বসে বসে এগোচ্ছে ও।
মেয়েটির জন্য গ্রে অপেক্ষা করছে। ‘বেশ দারুণ করছ তুমি।
কথা শুনে গ্রে’র দিকে তাকাল মেয়েটি। মনোযোগ সরে যাওয়া একটি ভাঙ্গা টাইলের ওপর পা পড়ল ওর। টাইল ভেঙ্গে যাওয়ায় ফিওনার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেল। পেটের ওপর ভর দিয়ে আছড়ে পড়ল বেচারি। ঢালু ছাদ দিয়ে পিছলে নামতে শুরু করল।
হাত-পা দিয়ে নিজেকে থামাতে চেষ্টা করলেও ফিওনা আকড়ে ধরার মতো কিছু পেল না।
গ্রে ওকে বাঁচানোর জন্য সামনে ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে দিল, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না।
টাইলসগুলোর ওপর দিয়ে পিছলে যেতে যেতে ওর গতি বাড়তে লাগল। আরও টাইলস ভাঙ্গল হাত-পা ছোঁড়ার কারণে। ওর সামনে থাকা টাইলস ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে “টাইলসধস”-এর মতো অবস্থা হলো।
উপুড় হয়ে পড়ে রইল গ্রে। কিছুই নেই ওর।
‘গাটার! (ছাদ থেকে পানি গড়ানোর জন্য পাইপ বা নালী)’ মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বলল গ্রে। “গাটার ধরো!’
ফিওনা দেখে মনে হলো ও কিছুই শুনতে পায়নি। টাইলস ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে নিচে চলে যাচ্ছে সে। হঠাৎ লাফিয়ে উঠে এবার গড়াতে শুরু করল ও। একটি আর্তচিৎকার বেরিয়ে এলো ওর গলা দিয়ে।
প্রথমে ভেঙ্গে যাওয়া কয়েকটি টাইলস কিনারা থেকে ছিটকে পড়ল। আগুনের চিরবির শব্দের সাথে পাথুরে উঠোনে ওগুলো আছড়ে পড়ার শব্দও শুনতে পেল গ্রে।
ফিওনাও ওগুলোর অনুসরণ করল, হাত ছড়িয়ে ছাদের কিনারা থেকে খসে পড়ল বেচারি।
চলে গেল ফিওনা।
০৩. উকুফা
০৩. উকুফা
সকাল ১০টা ২০ মিনিট।
হুলুহুলুই-আমফলোজি গেম প্রিজার্ভ
জুলুল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা।
কোপেনহ্যাগেন থেকে ছয় হাজার মাইল দূরে, একটি ভোলা জিপ আফ্রিকার বুনো পথ মাড়িয়ে এগোচ্ছে।
গরমে গলদঘর্ম অবস্থা, আফ্রিকার উষ্ণ উদোম প্রান্তরে মরীচিকা ঝিকমিক করছে। রিয়্যার ভিউ আয়নায় দেখা যাচ্ছে, সূর্যের তাপে দারুণভাবে সেদ্ধ হচ্ছে সমতল ভূমি। তবে সূর্যের এই মহৎ কাজে মাঝে মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাটাঅলা ঝোঁপ-ঝাড় আর হালকা লাল কাঠের গাছপালা। জিপের সামনে দুম করে একটি ছোট ঢিবির উদয় হলো। বাবলাজাতীয় গাছের কাণ্ড, গুলা পাতার পুরু স্তরে ঢাকা ওটা।
‘ভক্টর, এটাই কী সেই জায়গা?’ শুকনো নদীর ওপর দিয়ে ঝাঁকি খেয়ে স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে খামিশি টেইলর জানতে চাইল। জিপের পেছনে মোরগের লেজের মতো ধূলো উড়ছে। পাশে থাকা নারীর দিকে তাকাল সে।
যাত্রী সিটে ড. মারসিয়া ফেয়ারফিল্ড প্রায় দাঁড়িয়ে আছে। ঝাঁকি সামাল দিতে এক হাত দিয়ে উইন্ডশিল্ডের কিনারা ধরে আছে ও। আরেক হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল, ‘পশ্চিম দিকে। ওখানে একটা গভীর গহ্বর আছে।’
খামিশি গিয়ার নামিয়ে ডান দিকে গাড়ি চালাল। হুলুহুলুই-আমলোজি গেম প্রিজার্ভের বর্তমান গেম ওয়ার্ডেন (প্ররক্ষক) হিসেবে তাকে কিছু নিয়ম-নীতি মেনে চলতেই হয়। বেআইনিভাবে পশু-পাখি শিকার করা দণ্ডনীয় অপরাধ, তবুও শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে পার্কের নির্জন অংশে।
এমনকি ওর নিজের লোকজন, কিছু জুলু উপজাতির বাসিন্দারাও মাঝে মাঝে তাদের ঐতিহ্য চর্চা করতে গিয়ে পশু-পাখি মেরে ফেলে। এই কাজ করার জন্য ওকে ওর দাদার বয়স্ক বন্ধুদেরকেও জরিমানা করতে হয়েছে। ওরা খামিশির নাম পড়িয়ে “ফ্যাট বয়”। উপহাসের সুরেই এই নামে ডাকেন তারা। খামিশি বুঝতে পারে ওনারা ওকে এখনও পছন্দ করে উঠতে পারেননি। ওকে এখনও একজন সাদা চামড়াধারী লোকের চাকরি করার যোগ্য বলে মানেন না তারা। খামিশি এখনও এখানে বেশ পরিচিত। ওর যখন ১২ বছর বয়স তখন বাবা ওকে অস্ট্রেলিয়া নিয়ে গিয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার উত্তর উপকূলে ডারউইন শহরের বাইরে জীবনের একটি অংশ দারুণভাবে কাটিয়ে এসেছে ও। ওখান থেকে ফিরে এসে গেম ওয়ার্ডেন পদে চাকরি নিশ্চিত করে এখানে থিতু হয়েছে।
“ফ্যাট বয়” উপাধি বাগিয়ে নিয়েছে শিকারিদের শান্তি নষ্ট করে।
‘আরেকটু জোরে যাওয়া যাবে? ওর যাত্রী তাড়া দিল।
ড. মারসিয়া ফেয়ারফিল্ড ক্যামব্রিজ থেকে পাস করা জীববিজ্ঞানী। গণ্ডার সম্পর্কিত অপারেশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানিত অংশ হিসেবে সে কাজ করছে। মারসিয়ার সাথে কাজ করতে খামিশির বেশ ভালই লাগে। ড. মারসিয়া খুব সাদামাটাভাবে চলা ফেরা করে, পরনে খাকি সাফারি জ্যাকেট, মাথার রুপোলি ধূসর চুলগুলো মাথার পেছনে গোছা করে বেঁধে রেখে দিব্যি ঘুরছে ও। কোনো ছলনা নেই, ভনিতা নেই। হয়তো এই কারণেই খামিশি তাকে পছন্দ করে।
কিংবা হয়তো মারসিয়ার পছন্দের বিষয়ের জন্য।
‘বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে যদি মা গণ্ডার মারা যায় তাহলে বাচ্চাটি হয়তো বাঁচবে কিন্তু সেটা কতক্ষণ?’ উইন্ডশিন্ডের কিনারায় থাবা মারল ড.। ‘ওদের দুজনকে হারানো চলবে না।
