‘তাড়াতাড়ি,’ মেয়েটিকে তাড়া দিল।
ভারসাম্য রক্ষার জন্য হাত ছড়িয়ে রেখে ফিওনা বুককেসের ওপরে চড়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রে’র কাছ থেকে প্রায় তিন ফুট দূরে আছে ও।
‘তাড়াতাড়ি করো, গ্রে আবার তাড়া দিল।
‘প্রথম যখন বলেছ তখনই শুনেছি তো…?
গ্রের নিচে থাকা বুককেস সশব্দে ধসে পড়ল। বুককে ধসে পড়তে দেখে গর্তের কিনারা আরও শক্ত করলে ধরল গ্রে। এক পশলা টাটকা ছাই, আগুন আর তাপমাত্রা উপরে উঠে এল।
ফিওনার পায়ের নিচে থাকা বুককেসের অংশ কেঁপে উঠতেই চিৎকার করে উঠেছিল তবে সামলে নিয়েছে।
হাতে ঝুলে থাকা অবস্থায় মেয়েটিকে ডাকল ও। ‘লাফ দাও। আমার কাঁধ ধরবে।
আর কিছু বলে সাহস যোগাতে হয়নি গ্রে’র, বুককেস আবার কেঁপে উঠতেই লাফ দিল ফিওনা। গ্রে’কে জাপটে ধরল। গ্রে’র গলায় হাত আর কোমরে পা প্যাচিয়ে ধরেছে। ফিওনার লাফের দমকে আর একটু হলেই গ্রে’র হাত ফসকে গিয়েছিল।
‘আমার শরীরকে ব্যবহার করে গর্তের ভেতরে উঠে যেতে পারবে?’ টান টান অবস্থায় বলল গ্রে।
‘ম…মনে হয় পারব।’
চুপচাপ গ্রে’কে ধরে ঝুলে থাকল ও। নড়ল না।
গর্তের এবড়োখেবড়ো কিনারা গ্রে’র আঙুলে আঘাত করছে। ‘ফিওনা…’
একটু কেঁপে উঠে গ্রে’র পিঠের ওপর কাজ শুরু করল ও। নড়তে শুরু করেই এক পা গ্রে’র বেল্টে বাধিয়ে কাঁধে ভর দিয়ে মাকড়সা ও বানরসুলভ যৌথ দক্ষতার সমন্বয়ে চটপট উপরে উঠে গেল মেয়েটি।
নিচে বইয়ে লাগা আগুন দাবানলে রূপ নিয়েছে।
ফিওনার পর গ্রে নিজেও গর্তের ভেতর দিয়ে উপরে উঠে এল। একটি হলওয়ের মাঝখানে এসে উঠেছে ওরা। ওর দু’পাশে রুম ছড়ানো আছে।
‘আগুন এখানেও চলে এসেছে,’ ফিসফিস করে বলল ফিওনা, যেন ওর কথা শুনতে পেলে আগুন এদিকে আরও বেশি করে ধেয়ে আসবে। গর্তের ভেতর থেকে পা উঠিয়ে গ্রে খেয়াল করল অ্যাপার্টমেন্টের পেছনের দিক থেকে উজ্জ্বল শিখার আভাস দেখা যাচ্ছে। এখানে থোয়াও আছে, তবে নিচের চেয়ে কম।
‘চলো,’ বলল গ্রে। দৌড় এখনও শেষ হয়নি।
আগুনের উল্টো দিকে দ্রুত এগোল ও। উপরের দিকে বসানো একটি জানালার কাছে এসে থামল। দুই পাতের ভেতর দিয়ে উঁকি দিল গ্রে। দূর থেকে সাইরেনের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। লোকজন জড়ো হয়েছে নিচের রাস্তায়। লাজুক দর্শক এরা। তবে এদের মধ্যে নিশ্চিতভাবে দু-একজন আততায়ীও ঘাপটি মেরে আছে।
জানালা দিয়ে বেয়ে ওঠার চেষ্টা করলে ওরা দুজনই সবার চোখে পড়ে যাবে।
ফিওনা-ও লোজনের দিকে তাকাল। ‘ওরা আমাদেরকে বেরোতে দেবে না, তাই না?
‘আমরা আমাদের নিজেদের পথ বের করে নেব।’
পেছনে হটে খুঁজতে শুরু করল গ্রে। রাস্তা থেকে বিল্ডিঙের যা যা দেখেছিল মনে করার চেষ্টা করল। ছাদে যেতে হবে ওদের।
গ্রে’র মতলব বুঝল ফিওনা। ‘পাশের রুমে একটা মই আছে।’ পথ দেখিয়ে এগোল ও। ‘আমি এখানে এসে মাঝে মাঝে পড়তাম যখন মাট্টি…’ ওর কণ্ঠ ভেঙে গেল। শব্দগুলো আর বেরোল না।
গ্রে জানে, মেয়েটিকে ওর নানুর মৃত্যু অনেকদিন তাড়া করে বেড়াবে। মেয়েটির কাঁধে এক হাত রাখল ও কিন্তু রেগে কাঁধ ঝাঁকিয়ে গ্রে’কে সরিয়ে দিল ফিওনা।
‘এককালে’ বসার ঘর হিসেবে ব্যবহৃত রুমে ঢুকে বলল ও। এখন এই রুমে কয়েকটি বাক্স আর ফাটা-ছেঁড়া সোফা ছাড়া কিছুই নেই।
সিলিং থেকে ঝুলে থাকা একটি ক্ষয়প্রাপ্ত রশি দেখাল ফিওনা, ছাদের একটি ট্রাপড়োরের সাথে ওটা লাগানো রয়েছে।
গ্রে রশি ধরে টান দিতেই একটি কাঠের মই ওপর থেকে মেঝেতে নেমে এল। মই বেয়ে প্রথম উঠল গ্রে, ওর পেছন পেছন উঠল ফিওনা।
চিলেকোঠাটির নির্মাণ কাজ শেষ না করে অসমাপ্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল। এখানে থাকা দুটো জানালা দিয়ে ভেতরে আলো আসছে। একটি জানালার মুখ রয়েছে সামনের রাস্তার দিকে আর অন্যটি পেছন দিকে। ধোয়া এখানেও হাজির হয়েছে তবে কোনো আগুন নেই।
গ্রে প্রথমে পেছনের জানালা দিয়ে চেষ্টা করবে বলে সিদ্ধান্ত নিল। পশ্চিম দিকে মুখ করে রয়েছে ওটা, দিনের এসময়টায় ওখানে ছাদের ছায়া পাওয়া যাবে। এছাড়াও বিল্ডিঙের ওদিকেই আগুন লেগেছে। তাই হামলাকারীরা হয়তো ওদিকে কম নজর দেবে। কাঠের তক্তার ওপর দিয়ে লাফিয়ে এগোল গ্রে। নিচ থেকে উঠে আসা তাপের আঁচ ও এখানেও অনুভব করতে পারছে।
জানালার কাছে পৌঁছে নিচ দিকে তাকাল গ্রে। নিচ তলার ছাদের বাড়তি অংশ এমনভাবে রয়েছে যে ও দোকানের পেছন দিকটা দেখতে পারছে না। যদি গ্রে হামলাকারীদের দেখতে না পারে তাহলে হামলাকারীরাও গ্রে’কে দেখতে পাবে না। তার ওপর নিচের ভাঙ্গা জানালাগুলো থেকে গলগল করে ধোয়া বেরিয়ে এসে এদিকটাকে আড়াল করে দিয়েছে।
একবারের জন্য হলেও আগুন ওদের উপকারে এলো!
জানালার পাল্লা খুলে দেয়ার পরও গ্রে ওখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। অপেক্ষা করছে। না, কোনো গুলি হলো না। তবে রাস্তার ওপাশে জড়ো হওয়া সাইরেনগুলোর আওয়াজ শোনা গেল।
‘আমি আগে যাচ্ছি, ফিওনাকে ফিসফিস করে বলল গ্রে। যদি সব ঠিক থাকে তাহলে…’।
ওদের পেছনে ছোট গর্জনের মতো শব্দ হলো।
দু’জনই ঘুরল ওরা। আগুনের একটি জিহ্বা এসে কাঠের তক্তায় আঘাত হেনে ওটার সর্বনাশ করে দিয়েছে। সশব্দে ভেঙে, ধোয়া তৈরি করল ওটা। ওদের হাতে সময় খুব কম।
‘আমাকে দেখো,’ বলল গ্রে।
জানালার বাইরে গেল ও, নিচু হয়ে আছে। একটানা শ্বাসরুদ্ধকর তাপমাত্রায় থাকার পর ছাদের এ-অংশের বাতাসকে সুন্দর ঠাণ্ডা মনে হলো ওর।
