‘তুমি কী করতে যাচ্ছো…?
‘আমাদের জন্য একটা সিঁড়ি বানানোর পায়তারা করছি।
বুকশেলফের জন্য রাখা একটি মইয়ে উঠল গ্রে। ওর মুখের ওপর ধোয়া পাক খেল। বাতাস পুড়ে গেল যেন। ক্রোবার দিয়ে টিনের সিলিং টাইলসে গুতা দিল গ্রে। সহজেই নিজের স্থান থেকে সরে গেল ওটা। যে যেমনটা ধারণা করেছিল, দোকানের ছাদে নিচে একটি ড্রপ সিলিং আছে। এই সিলিং উপর তলার মেঝেতে থাকা কাঠ তার স্তর ঢেকে রেখেছিল।
মইয়ের একদম উঁচুতে উঠল গ্রে। ওখান থেকে বুককেসের শেষ কয়েক তাকে চড়ল ও। বুককেসের উপরে রীতিমতো চড়ে বসে ক্রোবার দিয়ে দুটো তক্তার ভেতরে ঢুকাল গ্রে। ক্রোবার বেশ গভীরে চলে গেল। এবার নিজের গায়ের জোর খাটাল ও। স্টিলের বার পুরোনো কাঠ চিরে দিল। কিন্তু ওটার আকার একটি ইঁদুরের গর্তের মতো।
চোখ জ্বালাপোড়া করে পানি পড়ছে। নিচ দিকে ঝুঁকল গ্রে। কাশল। অবস্থা ভাল নয়। ধোয়ার সাথে প্রতিযোগিতা করে ক্রোবার চালাতে হবে ওকে। পেছন ফিরে আগুনের দিকে তাকাল গ্রে। আগুনের হিংস্রতা বাড়ার সাথে সাথে ধোয়াও বেড়ে চলেছে।
এই গতিতে কাজ করতে থাকলে কিছুই হবে না।
কিছু একটা নড়ে ওঠায় গ্রে নিচ দিকে তাকাল। মই বেয়ে উঠছে ফিওনা। এক টুকরো কাপড় পেয়ে ওটাকে ভিজিয়ে নিজের নাক-মুখে বেঁধেছে ও। গ্রে’র উলের সোয়েরটা সে উপরে তুলে ধরল। এটাকেও ভিজিয়ে এনেছে, ভিজে সাইজে ছোট হয়ে গেছে সোয়েটার, দেখতে কুকুরের ছোট্ট বাচ্চার মতো লাগছে। গ্রে অনুধাবন করল মেয়েটির বয়স ১৭ নয় তারচেয়েও কম। ওর আগের ধারণা ভুল ছিল। এই মেয়ের বয়স ১৫’র বেশি হতে পারে না। আতঙ্কে ওর চোখ দুটো লাল হলেও ওখানে আশার আলো আছে, গ্রের ওপর অন্ধের মতো ভরসা করছে মেয়েটি।
কেউ যখন ওকে এভাবে অন্ধের মতো ভরসা করে, বিশ্বাস করে গ্রে’র তখন রাগ হয়। কারণ, ও তাদের ভরসা না রেখে পারে না।
সোয়েটারের দুই হাতা নিজের গলায় বেঁধে বাকি অংশ পিঠের ওপর ফেলে রাখল গ্রে। ছাইযুক্ত বাতাসের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য হাতার এক অংশ তুলে নিয়ে নিজের নাক-মুখ ঢাকল।
গ্রে’র শার্টের পেছনের অংশ ভিজে যাচ্ছে ভেজা সোয়েটারের কারণে। এতে বরং ভালই হচ্ছে। ঘাড়ত্যাড়া কাঠের তক্তাগুলোকে শায়েস্তা করার জন্য আবার যুদ্ধে নামল ও। ওর নিচে ফিওনা দাঁড়িয়ে আছে, গ্রে নিজের দায়িত্ব আঁচ করতে পারল।
ড্রপ সিলিং আর কাঠের তক্তার স্তরের মধ্যকার ফাঁকা জায়গাটুকুতে চোখ বুলাল গ্রে। যদি পালানোর জন্য বিকল্প কোনো রাস্তা পাওয়া যায়। চারিদিকে পাইপিং আর ওয়্যারিঙের ছড়াছড়ি। নিচের অংশ দোকান আর ওপরের অংশ রুম হিসেবে আলাদা হওয়ার পর বাড়তি অনেক কিছু যোগ হয়েছে এখানে। নতুন যুক্ত হওয়া পাইপিংগুলো দেখতে বিশ্রী লাগছে। পুরোনো ওয়্যারিং ও পাইপিংগুলো সুন্দর গোছানোভাবে করা হলেও নতুনগুলো করা হয়েছে একদম যা-তা ভাবে।
গ্রে খুঁজতে খুঁজতে সারি সারি কাঠের তক্তার মাঝে একটি জায়গায় বক্স আকৃতির ভিন্নতা লক্ষ করল। জায়গাটির আকার তিন বর্গ ফুট, পুরু করে চিহ্ন দেয়া। সাথে সাথে চিনতে পারল ও। ওর ধারণাই সঠিক। উপরতলার সাথে নিচ তলার যোগাযোগের জন্য আগে এখানে একটি সিঁড়ির ব্যবস্থা ছিল।
কিন্তু এটাকে এরকম সুন্দর করে বন্ধ করা হয়েছে কীভাবে?
সেটা জানার মাত্র একটাই রাস্তা আছে।
বুককেসের একদম ওপরে উঠে দাঁড়াল ও। বক্স আকৃতির জায়গাটির কাছে যাওয়ার জন্য বুককেসের ওপর দিয়ে এগোল, ওটাকে খুলবে। খুব বেশি দূরে নয়, মাত্র কয়েক ফুট কিন্তু সমস্যা হলো যেদিকে আগুন জ্বলছে ওকে সেই দিকে যেতে হবে।
‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’ মইয়ের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা ফিওনা প্রশ্ন করল।
জবাব দেবার মতো অবস্থায় নেই গ্রে। ওর প্রতি পদক্ষেপে ধোয়া আরও ভারি হয়ে উঠছে। তাপমাত্রাও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। অবশেষে ও বন্ধ করে দেয়া সিঁড়ির ওখানটায় গিয়ে পৌঁছল।
নিচ দিকে তাকাল ও। বুককেসের নিচের তাকে ইতোমধ্যে আগুন ধরে গেছে। আগুনে চুড়োর কাছাকাছি চলে এসেছে গ্রে।
কোনভাবেই সময় নষ্ট করা চলবে না।
নিজেকে তৈরি করে ক্রোবারকে কাজে লাগাল ও।
পাতলা কাঠের তক্তার ভেতর দিয়ে সহজেই ক্রোবার ঢুকে পড়ল। ঠিক তক্তা নয়, পাতলা ফাইবারবোর্ড আর ভিনাইল টাইলস। বর্তমান যুগের জিনিসগুলো যেমন হালকা পাতলা হয়, সেরকম। গ্রে’র ধারণা এবারও সঠিক প্রমাণিত হলো। আধুনিক যুগের এরকম হালকা-পাতলা জিনিস দিয়ে কাজ সারার নীতির জন্য মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিল গ্রে।
বাতাসে তাপ বাড়ছে। হাতে ধরা ক্রোবারকে যন্ত্রের মতো ব্যবহার করে উপরে ওঠার মতো যথেষ্ট জায়গা তৈরি করল ও।
সদ্য খোলা জায়গা দিয়ে ক্রোবারটিকে উপরে ছুঁড়ে দিল গ্রে। উপরে আছড়ে পড়ে ঠনঠন আওয়াজ করল ওটা।
ফিওনার দিকে তাকিয়ে ওর কাছে আসার ইশারা করল।
‘পারবে বুকশেলফের উপরে উঠে তারপর…?
‘আমি দেখেছি, তুমি কীভাবে ওখানে উঠেছ। বুককেসে চড়তে শুরু করল ফিওনা।
নিচ দিক থেকে ভেসে আসা একটি শব্দ গ্রে’র দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ওর নিচে থাকা বুককেস কেঁপে উঠল থরথর করে।
এই সেরেছে…।
গ্রে’র ওজন আর বুককেসের নিচে আগুন ধরে যাওয়ার কারণে বুককেসের নিচের অংশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। তৈরি করা গর্তে নিজের অর্ধেক তুলে দিয়ে শেলফের ওপর থেকে ওজন কমাল ও।
