ক্যাফের টেবিলে বিল রেখে বেরিয়ে পড়ল গ্রে। কল্পনার সাগরে হাবুডুবু খাওয়া বন্ধ করে কাজে নামতে পেরে ও বরং খুশিই হয়েছে।
বড় বড় পা ফেলে সরু রাস্তা পার হলো ও। মেয়েটি তখন মাত্র গেট খোলা শেষ করেছে। গ্রে’র দিকে তাকাল মেয়েটি। মোটেও অবাক হয়নি।
“আচ্ছা বন্ধু, দাঁড়াও আন্দাজ করি…’ ব্রিটিশ উচ্চারণে কেতাদুরস্ত ইংরেজিতে বলল মেয়েটি। গ্রে’র পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলিলে বলল, ‘আমেরিকান।
ওর এরকম অপ্রত্যাশিত আচরণ দেখে ভ্রু কুঁচকাল গ্রে। ওকে এখনও একটি শব্দও বলতে দেয়া হয়নি। তবে যতটুকু সম্ভব চেহারায় আগ্রহ ফুটিয়ে রাখল ও একটু আগে যে মেয়েটি ওকে ফলো করছিল আর ও-ও সেটা ধরে ফেলেছে ব্যাপারটা বুঝতে দিতে চাচ্ছে না। তুমি কীভাবে জানলে?’
‘তুমি যেভাবে হাঁটো, পাছা উঁচু করো, ওতেই বুঝেছি।
‘তাই?
গেট আটকিয়ে দিল ও। গ্রে খেয়াল করল মেয়েটির জ্যাকেটে কয়েকটা পিন আছে। রংধনুঅলা সবুজ পতাকা, রুপোর কেল্ট চিহ্ন, একটি সোনার ইজিপশিয়ান ক্রস ও বাহারি রঙিন বোতামগুলোতে ডেনিশ এবং ইংরেজিতে স্লোগান লেখা রয়েছে। ওর হাতে সাদা রঙের একটি রাবারের ব্রেসলেট আছে, “আশা” শব্দটি লেখা রয়েছে ওতে।
সামনে সরে যাওয়ার জন্য গ্রে’কে ইশারা করল ও। কিন্তু গ্রে চট করে সরে না যাওয়ায় দুজনের একটু ধাক্কা লাগল। রাস্তার ওপাশে চলে গেল মেয়েটি। আরও এক ঘণ্টা পর দোকান খুলবে দুঃখিত, বন্ধু।
দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে একবার দরজা আরেকবার মেয়েটির দিকে তাকাল গ্রে। মেয়েটি ক্যাফের দিকে এগোচ্ছে। গ্রে একটু আগে যে টেবিল ছেড়ে উঠে গিয়েছে সেই টেবিলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গ্রে’র রেখে যাওয়া নোটগুলো থেকে একটি নোট তুলে নিল মেয়েটি। অপেক্ষা করল গ্রে। জানালা দিয়ে দেখল মেয়েটি দুটো কফির অর্ডার করে চুরি করা টাকা দিয়ে বিল পরিশোধ করে দিল।
দুই হাতে দুটো লম্বা সাইজের স্টাইরোফোম কাপ নিয়ে ফিরল ও।
‘এখনও দাঁড়িয়ে আছো?’ গ্রে’কে প্রশ্ন করল।
‘এই মুহূর্তে অন্য কোথাও যাওয়ার মতো জায়গা নেই আমার।
“আহারে!’ দু’হাত উঁচু করে বন্ধ দরজা খুলে দেয়ার ইশারা করল মেয়েটি।
‘খুশি?
‘ওহ!’ দরজা খুলে দিল গ্রে।
ভেতরে ঢুকল মেয়েটি। ‘বারটেল!’ হাঁক ছাড়ল ও। পেছন দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভেতরে ঢুকবেন নাকি দরজা আটকাবো?
‘আমি ভেবেছিলাম…’।
‘আজব!’ চোখ পাকিয়ে বলল ও। “অনেক ঢং করেছ। এমন একটা ভাব করছ যেন আমাকে আগে দেখইনি।’
ভাবল গ্রে। আচ্ছা, তাহলে ওটা কাকতালীয় ছিল না। মেয়েটা ওকে ফলো করছিল।
দোকানের আরও ভেতরে গিয়ে আবার হাঁক ছাড়ল ও। বারটেল! কোথায় তুমি? দ্বিধা ও দুশ্চিন্তা নিয়ে মেয়েটির পেছন পেছন দোকানে ঢুকল গ্রে। অবশ্য বেশি ভেতরে ঢুকল না, দরজার কাছেই থাকল। প্রয়োজন বুঝে কেটে পড়বে।
দোকানটা সরু গলির মতো চাপা সাইজের। দোকানের দু’পাশে মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট বুকশেলফ আছে। বিভিন্ন ধরনের বই আছে ওতে। ভ্যলিউম, ধর্মগ্রন্থ, পুস্তিকা সবই আছে। কয়েক পা সামনে এগিয়ে চোখে পড়ল দুটো গ্লাস কেবিনেট রয়েছে দোকানের মাঝখানে। চামড়ায় বাধানো বই আছে ওগুলোর ভেতর।
গ্রে আরও ভেতরে চোখ বুলাল।
সকালের সূর্যের আলোতে দেখা গেল পাতলা ধূলো উড়ছে। বাতাসে পুরোনো বোটকা গন্ধ। বইয়ের পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে গন্ধটাও বাড়ছে। এখানটা একদম ইউরোপের মতো। বয়সের ভার আর প্রাচীন ঐতিহ্য এখানকার প্রতিদিনের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
অবশ্য ভবনের জীর্ণদশা ছাড়া দোকানের ভেতরটা বেশ ভাল অবস্থাতেই আছে। গ্লাস ওয়ালের সাথে পর্যাপ্ত মই ঠেক দিয়ে রাখা আছে। ওগুলো দিয়ে বুকশেলফে উঠে প্রয়োজনীয় বই নামিয়ে নেয়া যাবে। দোকানের ভেতরে বেশি লোক হয়ে গেলে যাতে বাইরে লোজন বসতে পারে তার জন্য সামনের জানালার আছে অতিরিক্ত দুটো চেয়ারও আছে।
আর সবচেয়ে ভাল দিক হচ্ছে…
গভীরভাবে শ্বাস নিল গ্রে।
কোনো বিড়াল নেই।
আর কেন নেই সেটারও জবাব হাজির হয়ে গেল।
একটি শেলফের পাশে এক উস্কখুস্ক আকৃতি চোখে পড়ল। আকৃতির মালিকটির চোখ দুটো থলথলে, বাদামি রঙের। হঠাৎ করে কুকুরটি ওদের দিকে পা টেনে টেনে এগোতে শুরু করল। বাম পায়ের সামনের অংশ লেংচিয়ে এগোচ্ছে। বাম পায়ের থাবার ওই অংশটুকু নেই।
‘এই যে, বারটেল।’ সামনে ঝুঁকে কফি কাপ থেকে তরলটুকু মেঝেতে রাখা একটি সিরামিকের বাটিতে ঢালতে শুরু করল মেয়েটি। কুকুরটি এগিয়ে এসে খুব আগ্রহ নিয়ে বাটিতে জিহ্বা ডুবাতে শুরু করল।
‘কুকুরের জন্য কফি বোধহয় খুব একটা ভাল জিনিস নয়,’ সতর্ক করল গ্রে।
উঠে দাঁড়াল মেয়েটি। কাঁধের পাশ দিয়ে বিনুনি করা চুল সরিয়ে দিল। “চিন্তার কিছু নেই। এই কফিতে ক্যাফেইন নেই।’ দোকানের আরও ভেতরে এগোল ও।
‘আচ্ছা, ওর পায়ে কী হয়েছিল?’ পরিস্থিতির সাথে ধাতস্থ হওয়ার ফাঁকে একটু আলাপ করে নিতে চাইছে গ্রে। পাশ দিয়ে আসার পর গ্রে গায়ে একটু আদর করার বিনিময়ে লেজ নাড়ানো উপহার পেল কুকুরের কাছ থেকে।
‘বরফে পচন ধরে ছিল। ফ্রস্টবাইট। মাট্টি ওকে অনেক দিন আগে নিয়ে গিয়েছিল।’
‘মাট্টি?
‘আমার নানু। তোমার জন্য অপেক্ষা করছে সে।’
দোকানের শেষ প্রান্ত থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল। Er det han der vil kobe bogene, ফিওনা?’
