‘কমান্ডার পিয়ার্স?’ বললেন লোগান।
ব্রিজের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে মেয়েটি। লম্বা লম্বা পা ফেলে পাশের রাস্তায় অদৃশ্য হয়ে গেল। একটু অপেক্ষা করল গ্রে। মেয়েটি যদি আবার উল্টো দিকে ফিরে আসে।
‘কমান্ডার পিয়ার্স, ঠিকানা পেয়েছ?
‘হ্যাঁ। আমি ওখানে এখুনি যাচ্ছি।’
‘ভেরি গুড।’ লোগান সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলেন।
ওই মেয়ে কিংবা সন্দেহজনক অন্য কাউকে দেখার আশায় রেলিঙের কাছে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের চারদিকে চোখ বুলাল গ্রে। হোটেলের সেফে নিজের নাইম এমএম গ্রুক রেখে আসার জন্য আক্ষেপ করল। কিন্তু অকশন হাউজ থেকে প্রদত্ত নির্দেশনাবলিতে বলা ছিল ওখানে ঢোকার সময় সবাইকে মেটাল ডিটেকটর দিয়ে সার্চ করা হবে। তাই বাধ্য হয়ে অস্ত্র রেখে এসেছে গ্রেসন। বুটের ভেতর লুকোনো একটি কার্বনাইজড চাকু-ই এখানে ওর একমাত্র অস্ত্র।
অপেক্ষা করল গ্রে।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে ওর আশেপাশে মানুষের আনাগোনাও বেড়ে গেল। ওর পেছনে একটি মাছ-মাংসের দোকানদার রাস্তার পাশে বরফের টুকরো নামিয়ে ঝুড়ি থেকে টাটকা মাছ বের করে আনছে। সৌল, কড, স্যাভ ইল এবং আরও নানা রকম সামুদ্রিক মাছ।
ওগুলোর গন্ধে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হলো গ্রেসন। নিজের পেছনে সতর্ক দৃষ্টি রেখে এগিয়ে গেল ও।
হয়তো গ্রে একটু বেশিই খুঁতখুঁতে কিন্তু ও যে পেশায় আছে এখানে এরকম স্বভাবকে গুণ হিসেবে ধরা হয়। গলায় ঝুলোনো ড্রাগন ছুঁয়ে দেখল পিয়ার্স। এগিয়ে চলল শহরের ভেতরে।
কয়েক ব্লক পার হওয়ার পর নিরাপদ বুঝে একটি নোটপ্যাড বের করল ও। আজকে হতে যাওয়া নিলাম অনুষ্ঠানে কোন কোন জিনিসের প্রতি সংগ্রাহকদের বেশি আগ্রহ আছে সেগুলোর নাম লিস্ট করতে শুরু করল।
১. ১৮৬৫ সালে জেনেটিক্সের ওপর লেখা গ্রেগর মেন্ডেল-এর একটি পেপার।
২. ফিজিক্সের ওপর লেখা ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কস-এর দুটো বই। নাম : Thermodynamik (১৮৯৭) এবং Theorie der Warmestrahlung (১৯০৬)। দুটো বই-ই লেখক কর্তৃক স্বাক্ষরিত।
৩. উদ্ভিদবিজ্ঞানী হিউগো ডি ভ্রিসেস-এর উদ্ভিদ রূপান্তরের ওপর লেখা ডায়েরি। গতকাল এই জিনিসগুলো সম্পর্কে যত তথ্য জেনেছে সবটা টীকা আকারে লিখে রাখল গ্রে। তারপর এই তালিকায় আরও একটি নতুন নাম যোগ করল।
৪. চার্লস ডারউইন-এর পারিবারিক বাইবেল। নোটপ্যাড বন্ধ করল গ্রেসন। এখানে আসার পর থেকে যে ব্যাপারটা নিয়ে এপর্যন্ত প্রায় ১০০ বার চিন্তাটা করেছে সেটা নিয়ে আবার ভাবল ও সম্পর্কটা কোথায়?
হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর সিগমার অন্য কেউ দিতে পারবে। গ্ৰে ভাবছে লোগনিকে এই তথ্যগুলো ওর সহকর্মী মনক ক্যালিস ও ক্যাথরিন ব্রায়ান্টকে দিতে বলবে কি-না। আগেই প্রমাণিত হয়ে গেছে, এই যুগল বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তকে সাজিয়ে গুছিয়ে দিতে ওস্তাদ। এমনকি আদৌ যদি কোনো কিছু নাও থাকে তবুও ওরা ঠিকই একটা প্যাটার্ন দাঁড় করিয়ে দিতে সক্ষম! যা-ই হোক, হয়তো এই কেসে সত্যিই কোনো প্যাটার্ন নেই। এত তাড়াতাড়ি ওদের জানানো ঠিক হবে না। গ্রে’কে মাথা খাঁটিয়ে আরও কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। বিশেষ করে ৪ নম্বর জিনিসটির ব্যাপারে।
ততক্ষণ পর্যন্ত ওই দুই টোনা-টুনি’কে নিজেদের মতো থাকতে দেয়া যায়।
.
রাত ৯ টা ৩২ মিনিট।
ওয়াশিংটন, ডি.সি.।
‘সত্যি?’
প্রেয়সীর উন্মুক্ত পেটে হাতের তালু রেখেছে মনক। কমলা-কালো রঙের নাইক সোয়েটপ্যান্ট পরে বিছানার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে আছে ও। সন্ধ্যাবেলার জগিং শেষ করে এসে ভেজা শার্ট কাঠের মেঝেতে ফেলে রেখেছে। চোখের ভ্রু ছাড়া ওর মাথায় আর কোনো চুল নেই। পুরো মাথা পরিষ্কার করে কামানো। ইতিবাচক উত্তরের আশায় আছে মনক।
‘হ্যাঁ,’ ক্যাট নিশ্চিত করল। আস্তে করে মনকের হাত সরিয়ে বিছানার অপর পাশে চলে গেল ও।
চওড়া হাসি ফুটল মনকের ঠোঁটে। “তুমি শিওর?
বড় বড় পা ফেলে বাথরুমের দিকে এগোল ক্যাট। সাদা পেন্টি আর ঢোলা জর্জিয়া টেক টি-শার্ট ওর পরনে। কাঁধের ওপর দিয়ে ফেলে রেখেছে ওর লালচে বাদামি সোজা চুলগুলো। ‘আমার পাঁচ দিন দেরি হয়েছিল,’ গোমড়ামুখে বলল ও। “গতকাল ইপিটি টেস্ট করিয়েছি।
উঠে দাঁড়াল মনক। ‘গতকাল? আমাকে বলোনি কেন?
বাথরুমের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল ক্যাট, দরজাটা আধখোলা।
‘ক্যাট?
শাওয়ার ছাড়ার শব্দ শুনল মনক। ঘুরে বিছানা পেরিয়ে বাথরুমের দিকে এগোল ও। আরও জানতে চায় মনক। জগিং থেকে ফিরে আসতে না আসতেই ওর কানে বোমা ফাটিয়েছিল ক্যাট। ফোলা ফোলা চোখ আর মলিন মুখ করে বিছানায় শুয়েছিল ও কাঁদছিল। সারাদিন কোন বিষয়টি ওকে কষ্ট দিচ্ছিল সেটা বের করতে মনকের অনেক তেল খরচ করতে হয়েছে।
দরজায় থাবা মারল ও। যতটা শব্দ করতে চেয়েছিল তারচেয়েও জোরে শব্দ হলো দরজায়। বেহায়া হাতের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল মনক। ডারপা (ডিএআরপিএ)-এর আধুনিক গেজেট হলো ওর এই কৃত্রিম হাত। একটি মিশনে নিজের হাত হারানোর পর এই হাত-ই ওকে সঙ্গ দিয়ে আসছে। কিন্তু প্লাস্টিক ও ধাতু তো আর মাংস নয়। দরজায় টোকা মারতে গিয়ে এমন আওয়াজ হলো যেন ও দরজা ভেঙে ফেলতে চাইছে।
‘ক্যাট, কথা বলো,’ নরম সুরে বলল ও।
‘আমি চট করে গোসল সেরে আসছি।
শব্দের পেছনে লুকিয়ে থাকা টানটান ভাবটা বুঝতে পারল মনক। বাথরুমের ভেতর উঁকি দিল ও। বিগত এক বছর ধরে একে অন্যকে দেখছে ওরা। আর এখন তো ক্যাটের অ্যাপার্টমেন্টে নিজের জায়গা করে নিয়েছে মনক। তবে ওরা একটি নির্দিষ্ট মাত্রার শালীনতা বজায় রাখে।
