নতুন করে কিছু বলার আগেই আরেকটি কলের ধাক্কায় কেঁপে উঠল ওর ফোন। কে ফোন করেছে, দেখল গ্রে। ধুর…
‘র্যাচেল, সেন্ট্রাল কমান্ড থেকে ফোন করেছে। ফোনটা ধরতে হচ্ছে। আমি দুঃখিত।
‘ওহ, আচ্ছা। ঠিক আছে, রাখো।’
দাঁড়াও, র্যাচেল। তোমার নতুন ফ্লাইট নাম্বার।
‘কেএলএম ফ্লাইট ফোর জিরো থ্রি।
“ঠিক আছে। আজ রাতে দেখা হচ্ছে।’
‘হুঁ, আজরাতে।’ পুনরাবৃত্তি করে লাইন কেটে দিল র্যাচেল। ফ্ল্যাশ বাটন চেপে অন্য কল ধরল গ্রে। পিয়ার্স বলছি।
‘কমান্ডার পিয়ার্স।’ নিউ ইংল্যান্ডীয় উচ্চারণেই বোঝা গেল বক্তার নাম লোগান গ্রেগরি, সিগমা ফোর্সের সেকেন্ড ইন কমান্ড। ডিরেক্টর পেইন্টার ক্রো’র সরাসরি তত্ত্বাবধানে কাজ করেন তিনি। বরাবরের মতো লোগান এবারও কোনো আলগা কথা বলে সময় নষ্ট করলেন না।
‘আমরা এমন একটা খবর পেয়েছি যেটার সাথে হয়তো তোমার কোপেনহ্যাগেন অনুসন্ধানের কোনো সম্পর্ক আছে। ইন্টারপোল থেকে বলা হয়েছে আজকের নিলাম অনুষ্ঠানের প্রতি হঠাৎ সবাই অনেক আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
আরেকটি ব্রিজ পেরিয়ে আবার থামল গ্রে। দশ দিন আগে, ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি কয়েকজন কালো বাজারিকে চিহ্নিত করেছে, যাদের সবাই ভিক্টোরিয়ান-যুগের বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিলাদি বেচা-কেনার সাথে জড়িত। কেউ পাণ্ডুলিপি, প্রতিলিপি, আর কেউ আবার দলিল, চিঠি আর ডায়েরি সংগ্রহ করে থাকে। সেই ভিক্টোরিয়ান-যুগের সময় থেকে বিভিন্ন লোকের হাত বদল হয়ে তাদের কাছে এসে পৌঁছে ওগুলো। এরকম বিষয়ে সিগমা ফোর্স একটু আগ্রহ দেখালে দেখাতে পারে যদি সেটা নিরাপত্তার জন্য কোনো প্রকার হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এনএসএ বলছে এগুলো থেকে প্রাপ্ত অর্থ সন্ত্রাস গোষ্ঠীদের কাছে যাচ্ছে। অথচ এরকম প্রতিষ্ঠানের অর্থ কোখী থেকে কোথায় যাচ্ছে সেটার ওপর সবসময় নজরদারি করা হয়ে থাকে।
কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তবে এরকম ঐতিহাসিক দলিলপত্র অর্থ বিনিয়োগের জন্য ভাল জিনিস, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এগুলোর সাথে তো সন্ত্রাস গোষ্ঠীদের সম্পর্ক থাকে না। কে জানে, দিনকাল বদলেছে। কত কিছুই তো হতে পারে।
এই ব্যাপারের সাথে সম্পর্কযুক্ত প্রধান বিষয়গুলো অনুসন্ধানে নেমেছে সিগমা ফোর্স। আজ সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিতব্য নিলাম অনুষ্ঠানের ব্যাপারে যত বেশি সম্ভব তথ্য সংগ্রহ করাই হচ্ছে গ্রে’র অ্যাসাইনমেন্ট। স্থানীয় সগ্রাহক ও দোকানগুলো কোন কোন জিনিস নিয়ে বেশি আগ্রহী সেটাও জানতে হবে ওকে। এজন্যই গত দুই দিন কোপেনহ্যাগেনের বিভিন্ন সরু গলি-ঘুপচিতে থাকা ধূলো ভর্তি বইয়ের দোকান ও অ্যান্টিকশপগুলোতে টু মেরেছে। তাদের মধ্যে হজব্রা প্ল্যাডস-এর একটি দোকান ওর সবচেয়ে বেশি কাজে এসেছে। জর্জিয়ার এক সাবেক আইনজীবীর দোকান ওটা। তার সাহায্য পেয়ে গ্রে ভেবেছিল, ও এখন কাজের জন্য প্রস্তুত। পিয়ার্সের আজকের প্ল্যান ছিল অনেকটা এরকম :
সকালে উঠে নিলামের এলাকাটা দেখে অনুষ্ঠানে ঢোকা আর বের হওয়ার রাস্তায় কয়েকটি বাটনহোল ক্যামেরা বসাবে, ব্যস। নিলামে গিয়ে ওর কাজ হবে নিলামে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের ভাল করে পর্যবেক্ষণ করা এবং সুযোগ পেলে ছবি তুলে নেয়া। ছোট অ্যাসাইনমেন্ট।
‘আকর্ষণীয় কী উঠছে আজ?’ জিজ্ঞেস করল গ্রে।
নতুন আইটেম। আমরা যাদের ব্যাপারে অনুসন্ধান করছি ওটা তাদের অনেকের আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। একটা পুরোনো বাইবেল। কোনো এক প্রাইভেট পার্টি নিলামে তুলেছে।
‘এতে এত উত্তেজনার কী আছে?
‘আইটেমের বিবরণে লেখা আছে, বাইবেলটা ডারউইনের।
‘চার্লস ডারউইন, বিবর্তনবাদের জনক?
“হ্যাঁ।
ব্রিজের রেলিঙে আঙুল ঠুকল গ্রে। চার্লস ডারউইন, ইনিও ভিক্টোরিয়ান-যুগের বিজ্ঞানী। বিষয়টা ভাবতে ভাবতে পাশের ব্রিজের ওপর চোখ বুলাল ও।
গ্রে দেখল হুড তোলা গাঢ় নীল সোয়েটার জ্যাকেট পরা এক অল্প বয়সী মেয়ে ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সতের… আঠারো বয়স। মসৃণ চেহারা, ত্বকের রং রোদে পোড়া। হুডের একপাশ দিয়ে বেরিয়ে আসা চুলের লম্বা বিণুনি দেখে ভাবল ও… ভারতীয়? নাকি পাকিস্তানি? মেয়েটির বাম কাঁধে একটি সবুজ রঙের ব্যাগ রয়েছে। কলেজ পড়ুয়া অনেক ছাত্র-ছাত্রীর কাছে এরকম ব্যাগ থাকে।
কিন্তু ঘটনা হলো, গ্রে এই মেয়েকে এর আগেও দেখেছে… প্রথম ব্রিজ পার হওয়ার সময়। প্রায় ১৫০ ফুট সামনে দাঁড়ানো মেয়েটির চোখে চোখ পড়েছিল ওর। চট করে অন্যদিকে ঘুরেছিল মেয়েটি অস্বাভাবিক ব্যাপার।
মেয়েটি ওকে ফলো করছিল।
লোগান বলে যাচ্ছে, ‘তোমার ফোনের ডাটাবেসে আমি বিক্রয়কারীর ঠিকানা আপলোড করে দিয়েছি। নিলাম শুরু হওয়ার আগে তার সাথে কথা বলার জন্য যথেষ্ট সময় পাবে তুমি।’
ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা ঠিকানায় চোখ বুলাল গ্রে। শহরের ম্যাপে নির্দিষ্ট স্থান নির্দেশ করা রয়েছে। এখান থেকে আট ব্লক দূরে, স্ট্রোগেটের পাশেই। বেশি দূরে নয়।
কিন্তু প্রথমে…
চোখের কোণা দিয়ে গ্রে এখনও ব্রিজের নিচে থাকা খালের পানির প্রতিবিম্বের দিকে নজর রেখেছে। ও দেখল মেয়েটি কাঁধ কুঁজো করে তার ব্যাকপ্যাক উঁচু করল, নিজের শরীর আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা।
মেয়েটি বুঝতে পেরেছে সে ধরা পড়ে গেছে?
