‘পিয়ার্স বলছি,’ বলল ও।
‘গ্রে, যাক, তোমাকে পাওয়া গেল।
সকালের ঠাণ্ডার মধ্যেও পরিচিত মসৃণ কণ্ঠস্বর শুনে উষ্ণতাবোধ করল গ্রে। ওর কঠোর চেহারায় এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। র্যাচেল…? কথা বলতে গিয়ে একটু ধীরে পা ফেলল ও। কোনো সমস্যা হয়েছে?
গ্রেসন পিয়ার্সের আটলান্টিক পেরিয়ে এই ডেনমার্ক আসার পেছনে মূল কারণ হলো এই র্যাচেল ভেরোনা। এখানে বর্তমানে যে তদন্ত চলছে সেটা সিগমার কোনো লো-লেভেল রিসার্চ অ্যাসিসটেন্টকে দিয়ে করিয়ে নেয়া যেত। কিন্তু এই মিশন হাতে নিলে কালো চুলের অধিকারিণী সুন্দরী ইটালিয়ান লেফটেন্যান্টের সাথে দেখা করার মোক্ষম সুযোগও পাওয়া যায়। ওদের দুজনের প্রথম দেখা হয়েছিল রোমে, সর্বশেষ একটি কেস নিয়ে। তখন থেকে দুজন দেখা করার জন্য মুখিয়ে আছে, কিন্তু উপযুক্ত সুযোগ পাচ্ছে না। র্যাচেল ইউরোপে নিজের কাজ নিয়ে বন্দী থাকে অন্যদিকে ফোর্সের হয়ে কাজ করার সুবাদে ওয়াশিংটন থেকে সরার খুব একটা সময় পায় না গ্রে।
ওদের শেষ দেখা হওয়ার পর প্রায় আট সপ্তাহ কেটে গেছে। দুজন একসাথে ফিরল ওরা।
আট সপ্তাহ। অনেক দিন পার হয়ে গেছে।
ওদের সর্বশেষ দেখা হওয়ার ঘটনা মনে পড়ল গ্রেসন পিয়ার্সের। ভেনিসের এক ভিলায় ছিল ওরা। সূর্যের আলো পেছনে থাকায় বেলকুনির খোলা দরজার সামনে র্যাচেলের দেহ কাঠামো ফুটেছিল। পুরো সন্ধ্যায় বিছানায় কাটিয়েছিল দু’জন। স্মৃতির জোয়ারে ভাসতে শুরু করল গ্রে। র্যাচেলের ঠোঁটের সেই দারুচিনি ও চকোলেটের স্বাদ, ভেজা চুলের ঘ্রাণ, ঘাড়ে পড়া উষ্ণ নিঃশ্বাস, আলতো গোঙানি, দু’জনের জড়ানো শরীর, নরম আদর….
ব্ল্যাক টেডি বিয়ারটাকে প্যাক করার কথা যেন র্যাচেলের মনে থাকে, প্রার্থনা করল গ্রে।
‘আমার ফ্লাইট টাইম পিছিয়ে গেছে। লেট।’ বলল র্যাচেল। ওকে কল্পনা থেকে বাস্তবে নিয়ে এল।
‘কী?’ খালের পাশে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ও। গলার স্বরের হতাশা লুকোতে ব্যর্থ হয়েছে।
‘কেএলএম ফ্লাইটে চড়ে আসব আমি। রাত দশটায় ল্যান্ড করব।”
দশটায়। ভ্রু কুঁচকানো গ্রে। তার মানে মধ্যযুগীয় এক মঠ ভল্টের পাশে অবস্থিত সেন্ট জারট্রাডস ক্লোসটার-এর ডিনার বিজারভেশনটা বাতিল হয়ে যাচ্ছে। নির্দিষ্ট দিনের পাক্কা এক সপ্তাহ আগে বুকিং দিয়েছিল গ্রেসন।
‘আমি দুঃখিত, পিয়ার্সের নীরবতা বুঝে বলল র্যাচেল।
‘না… কোনো সমস্যা নেই। তুমি এসো। তোমার আসাটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার।’
‘আমি জানি। আমি তোমাকে অনেক মিস করি।’
‘আমিও।
র্যাচেলকে এত সাদামাটাভাবে জবাব দেয়ার কারণে গ্রেসন দুর্বলভাবে মাথা নাড়ল। কত কিছু ভেবে রেখেছিল ও কিন্তু কিছুই বলতে পারল না। কেন কেমন হয়? প্রত্যেক প্রেমিক-প্রেমিকার প্রথম মিলনের দিনে একটি কঠিন ধাপ উত্তীর্ণ হতে হয়। সেটা হলো : অস্বস্তিকর লজ্জা। দুজনে দুজনার প্রেমে ডুবে বাহুডোরে বাঁধা পড়ল…। এরকম কাব্যিক কথা বলা সহজ হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। অতীতের স্মৃতিকে পুঁজি করে প্রথম এক ঘন্টা ওরা প্রায় অপরিচিত মানুষের মতো আচরণ করেছিল। জড়িয়ে ধরে, চুমো খেয়ে, আসল কথা বলে ফেললেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। কিন্তু গভীর প্রণয় জমতে একটু সময়ের প্রয়োজন। আটলান্টিকের দুই তীরে বসবাসরত দুই মানব-মানবীর একে অপরকে বোঝার জন্য এক ঘন্টা লেগে গিয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, ছন্দ খুঁজে পেয়েছিল ওরা। কথা বলতে গিয়ে কণ্ঠস্বরের উঁচু-নিচু হয়ে যাওয়া ওদেরকে আরও আবেগপ্রবণ করে দিয়েছিল।
আর গ্রেসন প্রতিবারই ভয় পাচ্ছিল ওরা হয়তো শেষপর্যন্ত মূল লক্ষ্য খুঁজে পাবে না।
‘তোমার বাবা কেমন আছে?’ নাচতে শুরু করার প্রথম স্টেপ দেয়ার সময় জিজ্ঞেস করেছিল র্যাচেল।
প্রয়োজনীয় হোক বা না থোক ভিন্ন প্রসঙ্গে কথা শুরু হওয়ায় আপত্তি ছিল না গ্রেসনের। আর যেহেতু ওর কাছে ভাল খবর আছে, তাহলে আর সমস্যা কীসের। সে
কয়েকটি অনিশ্চয়তার ধাপ আছে এই আরকী। আমার মায়ের ধারণা বাবার এই উন্নতির পেছনে তরকারির প্রভাব আছে।
‘তারকারি? ঝাল দেয়া?
‘একদম। কোনো আর্টিকেলে সে পড়েছিল হলুদ তরকারি নাকি এরকম রোগে ভাল কাজে দেয়।’
“আচ্ছা। তারপর?
‘তারপর থেকে আমার মা সবকিছুতে তরকারি দেয়া শুরু করল। এমনকি আমার বাবার সকালের ডিমও রেহাই পেল না। ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের মতো ঘ্রাণ বের হয় পুরো বাড়ি থেকে।
র্যাচেলের নরম হাসি নিরানন্দ সকালকে মিষ্টি করে তুলল। ‘যাক। তিনি অন্তত রান্নাটা করছেন।’
চওড়া হাসি দিল গ্রে। ওর মা জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির বায়োলজির প্রফেসর। ঘরের কাজে তার কোনো দক্ষতা ছিল বলে ইতিপূর্বে জানা ছিল না। একটি ইন্ডাসট্রিয়াল দুর্ঘটনায় স্বামী অচল হয়ে যাওয়ার পর নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে বিগত বিশ বছর ধরে অনেক ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন তিনি। এখন তার পরিবারে নতুন এক সমস্যার উদয় হয়েছে। গ্রে’র বাবার অ্যালঝেইমার-এর প্রাথমিক অবস্থা চলছে। ইউনিভার্সিটি থেকে অল্প কিছুদিনের ছুটি নিয়ে স্বামীর সেবা করছিলেন তিনি। কিন্তু তার ক্লাসে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে, তাগাদা দেয়া হচ্ছে ভার্সিটি থেকে। ওয়াশিংটন থেকে গা বাঁচিয়ে এই ঝটিকা ভ্রমণে গ্রে’র সবকিছু বেশ ভালই কেটেছিল।
